kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৯  মে ২০২০। ৫ শাওয়াল ১৪৪১

কুড়িগ্রামে সাংবাদিক আরিফুলকে সাজা

প্রতিটি ধাপে অনিয়ম নথিতেই প্রমাণ

এম বদি-উজ-জামান ও বাহরাম খান   

২৮ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রতিটি ধাপে অনিয়ম নথিতেই প্রমাণ

অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগ্যানকে সাজা দেওয়ার বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে হাইকোর্টে যে নথি দাখিল করা হয়েছে, তাতেই ফেঁসে যাচ্ছেন রিগ্যানের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারীরা। যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত আরিফুলকে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছিলেন, সেই স্বীকারোক্তিপত্রে আরিফুল আসামিই নন।

গত ২৩ মার্চ রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টে নথি দাখিল করে। ওই স্বীকারোক্তিপত্রে লেখা রয়েছে, আসামির নাম মো. রফিকুল ইসলাম, পিতা মৃত রফিকুল ইসলাম। আসামির স্বাক্ষরের জায়গায় লেখা হয়েছে আরিফুল।

এই একটি অনিয়মই নয়, রংপুর বিভাগীয় কমিশনার অফিস সূত্রে জানা গেছে, আরিফুলকে নির্যাতনের ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার প্রতিটি ধাপেই নিয়ম লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছে বিভাগীয় তদন্ত কমিটি। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই এরই মধ্যে জেলা প্রশাসকসহ (ডিসি) সংশ্লিষ্ট চার কর্মকর্তাকে কুড়িগ্রাম থেকে প্রত্যাহার ও তাঁদের বেতন-ভাতা প্রদান সাময়িক বন্ধ রেখেছে সরকার।

জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইউসুফ হারুন কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কারণেই প্রত্যাহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘পরবর্তী তদন্তে সংশ্লিষ্টরা দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তি পেতে হবে। দোষীদের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।’

এ বিষয়ে আরিফুলের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাংবাদিক আরিফুলকে সাজা দেওয়ার বিষয়ে সকল ডকুমেন্ট রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টে দাখিল করেছে। এর কপি আমাদের কাছে এসেছে। এর মধ্যে যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দাখিল করা হয়েছে, তাতে তো আরিফুল আসামি নয়। অথচ তাকে এই ডকুমেন্টের ভিত্তিতেই কারাগারে পাঠানো হলো।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই ডকুমেন্ট এখন হাইকোর্টে রক্ষিত আছে। সুতরাং কেউ চাইলেই আর এই ডকুমেন্ট পাল্টে ফেলতে পারবে না।’

অ্যাডভোকেট ইশরাত বলেন, ‘একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত এভাবে অনিয়ম করে একজন নিরীহ মানুষকে ফাঁসাতে পারে, যা ভাবতেও অবাক লাগে।’    

তবে দীর্ঘদিন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী ও বর্তমানে জনপ্রশাসনের যুগ্ম সচিব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ঘটনায় প্রশাসনের মর্যাদা শুধু ক্ষুণ্ন হয়নি, মোবাইল কোর্ট নিয়ে থাকা বিতর্ককেও উসকে দেওয়া হয়েছে। এরা চরমভাবে নিয়ম লঙ্ঘন করেছে, এদের সর্বোচ্চতম শাস্তি দেওয়া উচিত।’

মধ্যরাতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাংবাদিক আরিফুলকে গ্রেপ্তার ও কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় কুড়িগ্রামের ডিসি সুলতানা পারভীন, আরডিসি মো. নাজিম উদ্দিন, সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা ও এস এম রাহাতুল ইসলামকে এরই মধ্যে কুড়িগ্রাম থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাঁদের বেতন-ভাতাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নির্যাতিত সাংবাদিক আরিফুলও ডিসি-আরডিসিসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছেন। আরিফুলের করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজা ও সব কার্যক্রম স্থগিত করেছেন।

এর আগে গত ১৬ মার্চ এক আদেশে আরিফুলকে সাজা দেওয়ার বিষয়ে যাবতীয় নথি তলব করেন বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের হাইকোর্ট বেঞ্চ। ২৩ মার্চের মধ্যে তা দাখিল করতে রাষ্ট্রপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ নির্দেশে রাষ্ট্রপক্ষ সব নথি দাখিল করে। ১১ পৃষ্ঠার ওই নথির মধ্যে আরিফুলের স্বীকারোক্তিপত্রও রয়েছে। ওই স্বীকারোক্তিপত্রে অপরাধের বিষয়ে তাঁর জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, ‘আমি অপরাধ স্বীকার করছি ও ক্ষমা চাই।’

এ বিষয়ে আইনজীবী ইশরাত হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসামি কী অপরাধ করেছে তার কোনো বর্ণনা নেই। অথচ তাকে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হলো।’ তিনি বলেন, হাইকোর্টে যেসব ডকুমেন্ট দাখিল করা হয়েছে, তার একটি জায়গায় আধাবোতল মদ ও ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ১৩ মার্চ রাত ১২টার দিকে কুড়িগ্রাম শহরের চড়ুয়াপাড়ায় আরিফুলের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই রাতেই আধাবোতল মদ ও ১০০ গ্রাম গাঁজা রাখার অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাঁকে এক বছর কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো ১৫ দিনের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। পরদিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় মাদকবিরোধী টাস্কফোর্স এ অভিযান চালিয়েছে। বাসার দরজা ভেঙে আরিফুলকে আটক করা হয় এবং এ সময় নির্যাতনের খবর সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক সমালোচনা হয়। এ অবস্থায় ১৪ মার্চ তাঁকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। আরিফুল তাঁর ওপর নির্যাতনের বর্ণনা দেন এবং অভিযোগ করেন, এ ঘটনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন আরডিসি নিজে। এমনকি তাঁকে এনকাউন্টারে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন আরিফুল। এরপর গত ২৩ মার্চ হাইকোর্টে হাজির হয়ে তিনি সাজার বিরুদ্ধে রিট আবেদন করেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা