kalerkantho

বুধবার । ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩ জুন ২০২০। ১০ শাওয়াল ১৪৪১

আশার বাণীর অপেক্ষায় ফেরিওয়ালারা

নগরের রাজপথ গলি-উপগলি জনশূন্য। উধাও ফেরিওয়ালারাও। এখন কোনো হাঁকডাকও নেই

আশরাফ-উল-আলম   

২৮ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



আশার বাণীর অপেক্ষায় ফেরিওয়ালারা

‘এই মাছ লাগবে, মা-আ-ছ। বড় মু-র-গি। বড় হাঁ-আ-স (হাঁস)’—এই ডাক শোনা রাজধানীবাসীর নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। অনেকের তো ঘুমই ভাঙে এমন হাঁকডাকে। কারণ সাতসকালেই ফেরিওয়ালারা বেরিয়ে পড়ে পাড়া-মহল্লায়। শুধু মাছ, হাঁস আর মুরগি নয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ নানা জিনিস নিয়ে তারা ঘুরে বেড়ায় পুরো এলাকায়।

কিন্তু নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ফেরিওয়ালাদের যেন নগরছাড়া করে ছেড়েছে। অঘোষিত লকডাউন চলছে দেশজুড়ে। ঢাকা মহানগরে বিরাজ করছে এক ধরনের সুনসান নীরবতা। নগরের রাজপথ থেকে গলি-উপগলিও অনেকটাই জনশূন্য। উধাও ফেরিওয়ালারাও। এখন কোনো হাঁকডাকও নেই।

শুধু ফেরিওয়ালা নয়, নগরের অলিগলিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসত এক শ্রেণির খুদে ব্যবসায়ীরা। সাধারণ পোশাক, বিভিন্ন ধরনের মসলা, পেঁয়াজ-রসুন, সবজি মিলত চলতি পথেই। কখনো মাটিতে মাদুর বিছিয়ে, কখনো ভ্যানে করে তারা বিক্রি করত পণ্য। গত দুই দিনে তাদেরও কাউকে চোখে পড়েনি।

৩০ বছরের যুবক সোহেলের বাড়ি বরগুনায়। ঢাকায় এসেছিলেন বছর দশেক আগে। ঢাকার কচুক্ষেতে এক মুরগির দোকানে কাজ করতেন। এরপর নিজেই উদ্যোগ নেন। কচুক্ষেত থেকে পাইকারি দামে মুরগি কিনে ইব্রাহিমপুর থেকে শেওড়াপাড়া পর্যন্ত ফেরি করে বিক্রি করেন। ফোনে কথা হলো তাঁর সঙ্গে। করোনার কারণে অফিস-আদালত ছুটি হওয়ায় তিনি বাড়ি চলে গেছেন। বললেন, ‘ঢাকায় থেকে কী লাভ। বাইরে বের হওয়া যাবে না। ফেরি করা যাবে না। সে কারণে বাড়ি চলে এসেছি।’

ফেরিওয়ালা ইব্রাহিম আগে মিরপুর এলাকায় ফেরি করে মাছ বিক্রি করতেন। এখন তিনি গ্রিন রোডে ফেরি করে মাছ বিক্রি করেন। সারা দিন রাস্তায় ঘুরে পণ্য বেচে সামান্য যা লাভ হয় তা দিয়েই চলে তাঁর সংসার।

বাড়িতে মা-বাবাকেও কিছু পাঠানোর চেষ্টা থাকে। তিনি জানালেন, দুই দিন ধরে ফেরি করে মাছ বিক্রি বন্ধ। এখন সংসার চালানোই দায়।

যাত্রাবাড়ীর বিবির বাগিচার বাসিন্দা ফাতেমাতুজ্জোহরা নীল বললেন, ‘নিত্যদিন হাতের নাগালেই পাওয়া যায় বলে আমরা বিভিন্ন জিনিসের জন্য ফেরিওয়ালাদের ওপর কিছুটা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। ওদের হাঁকডাক শুনতেও আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কিন্তু গত দুই দিন ওদের কোনো হাকডাক নেই। এ যেন অচেনা এক নগরীতে বাস করছি।’

পশ্চিম শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বাসা থেকে বের হয়েই রাস্তায় সারি সারি দোকান দেখাটা আমাদের বরাবরের অভিজ্ঞতা। সেখানে মাছ, ডিম, শাক-সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য পাওয়া যেত। করোনার প্রাদুর্ভাবে এখন আর সেসব দোকানি নেই। সব খালি। রাস্তায় কেউই থাকে না। এ এক অন্যরকম নাগরিক জীবন শুরু হয়েছে।’

মিরপুর ১০ নম্বর থেকে শুরু করে আগারগাঁও রাস্তায় হকারদের ভ্রাম্যমাণ দোকান নেই। গুলিস্তানে হকার নেই। ফার্মগেটে হকার নেই। মহাখালী বা বনানীর চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকারও একই চিত্র।

সারা দিন ফেরি করে উপার্জিত সামান্য আয়ে অতিকষ্টে চলে এই মানুষগুলোর জীবন-সংসার। করোনার ছোবলে মুহূর্তে বেকার হয়ে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর সামনে সামান্যতম আশার বাণীও নেই। ওদিকে দেশ কবে করোনামুক্ত হবে তাও বলা যাচ্ছে না।

‘ঢাকা শহরের অলিগলিতে হাঁটি ঠেলায় নিয়ে খাঁচি, জীবন কাটেই বড্ড কষ্টে তবুও আশায় বাঁচি।’—আশু বড়ুয়ার ‘ফেরিওয়ালা’ কবিতার এই পঙিক্তর মতোই, তার পরও ওদের প্রত্যাশা—বিপদ কেটে যাবে। করোনামুক্ত হবে দেশ। ফিরবে ঢাকার সুদিন। মিলবে উপার্জনের পথ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা