kalerkantho

সোমবার  । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৭। ৩ আগস্ট  ২০২০। ১২ জিলহজ ১৪৪১

আংকটাডের প্রতিবেদন

করোনায় বিশ্বে ৪০% বিনিয়োগ কমবে, ক্ষতির মুখে বাংলাদেশও

সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে জ্বালানি খাত, এয়ারলাইনস ও মোটরগাড়ি শিল্প

মাসুদ রুমী   

২৭ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনায় বিশ্বে ৪০% বিনিয়োগ কমবে, ক্ষতির মুখে বাংলাদেশও

নভেল করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) মহামারি আকার ধারণ করায় বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহ নাটকীয়ভাবে কমে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আংকটাড। সংস্থাটি বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে যেতে পারে। করোনাভাইরাসে বহুজাতিক কম্পানিগুলোর উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ছাড়া বিশ্বজুড়ে পণ্যের চাহিদা কমবে। এতে ক্ষতির মুখে পড়বে বাংলাদেশও।

জাতিসংঘের এই সংস্থার ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অ্যান্ড কমোডিটিস ডিভিশনের করা ‘গ্লোবাল ট্রেড ইম্প্যাক্ট অব দ্য করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) ইপিডেমিক’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা হয়েছে।

আংকটাডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের প্রভাবে শীর্ষ পাঁচ হাজার বহুজাতিক কম্পানির আয় ৩০ শতাংশ কমবে।

এসব বহুজাতিক কম্পানির উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ৫৭ শতাংশই চীনের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সংশ্লিষ্ট। 

সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে এমন তিনটি খাতের কথাও উল্লেখ করেছে আংকটাড। সংস্থাটি বলছে, করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাবে সবচেয়ে বিপদে পড়বে জ্বালানি খাত (-২০৮%, তেলের দাম হ্রাসের ফলে অতিরিক্ত ধাক্কা), এয়ারলাইনস (-১১৬%) এবং মোটরগাড়ি শিল্প (-৪৭%)।

আংকটাডের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সামগ্রিকভাবে বিশ্বে এফডিআইপ্রবাহ ব্যাপকভাবে কমে যাবে। চীনের সঙ্গে শক্তিশালী সাপ্লাই চেইন লিংকযুক্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে উৎপাদন ও সরবরাহ চেইনের বিঘ্ন ঘটায় বিশ্বব্যাপী চাহিদা যেমন কমে যাবে, উৎপাদনও কমবে।

আংকটাডের সাম্প্রতিক আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন থেকে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ২০টি দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ।

এতে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের কারণে চীনের মধ্যবর্তী পণ্য রপ্তানি ২ শতাংশ কমলে যে ২০টি দেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তার মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে। বাংলাদেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক শিল্প খাত, কাঠ ও ফার্নিচার শিল্প এবং চামড়াশিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে আংকটাডের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

আংকটাডের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারি মাসে চীনের ম্যানুফ্যাকচারিং পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্সে (পিএমআই) ২২ পয়েন্ট পতন হয়েছে। সূচকটি চীনের রপ্তানির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। ২২ পয়েন্ট পতনের অর্থ হলো, চীনের রপ্তানি ২ শতাংশ কমে যাচ্ছে। আর চীনের মধ্যবর্তী পণ্য রপ্তানি ২ শতাংশ কমলে সবচেয়ে ক্ষতি হবে এমন ২০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে।

জানতে চাইলে প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপারসের (পিডাব্লিউসি) বাংলাদেশের ম্যানেজিং পার্টনার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুনুর রশীদ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, “আমরা এরই মধ্যে বাংলাদেশে করোনা আঘাতের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রাথমিক মূল্যায়নে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার কোটি টাকা, বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের মূল্যায়নে শুধু উৎপাদন ও সেবা খাতে পাঁচ হাজার কোটি টাকার কথা শুনেছিলাম। কেউ কেউ আবার বাণিজ্যিক ব্যাংক বা সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাধ্যমে সমাজের নিম্ন পর্যায়ের লোকদের ‘ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফারের’ কথাও বলেছেন। তবে রপ্তানি বাজার সংকুচিত হলে তা অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়িয়ে ক্ষতি পোষানোর চেষ্টা করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোকে সহায়তা করে তাদের ঘুরে দাঁড়াতে সরকারকে সহায়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার করে আমাদের ব্যয় কমিয়ে আনতে হবে।”

আংকটাড বলেছে, চীন থেকে যদি সারা বিশ্বে কাঁচামাল রপ্তানি ২ শতাংশও কমে যায়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষতি হবে ৫০ বিলিয়ন ডলার। এর আগে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনও একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে রপ্তানির ১৩টি খাতকে চিহ্নিত করেছে, যেগুলো করোনাভাইরাসের কারণে ক্ষতির মধ্যে পড়তে পারে। বলা হয়েছে, এসব খাতে ক্ষতির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। খাতগুলোর মধ্যে আছে প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য। এ ছাড়া রয়েছে ওষুধশিল্প, পাট সুতা, ইলেকট্রনিকস, সামুদ্রিক মাছ, প্রসাধনী ইত্যাদি।

এরই মধ্যে করোনা সংকট মোকাবেলায় গার্মেন্টসহ রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত বুধবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করোনার কারণে অনেক মানুষ কাজ হারিয়েছে। তাদের পাশে আমাদের দাঁড়াতে হবে। আমাদের শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি বাণিজ্যে আঘাত আসতে পারে। এই আঘাত মোকাবেলায় কিছু আপত্কালীন ব্যবস্থা নিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য আমি পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করছি। এই তহবিলের অর্থ দিয়ে শুধু শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা যাবে।’

 

মন্তব্য