kalerkantho

সোমবার । ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৫  মে ২০২০। ১ শাওয়াল ১৪৪১

করোনা : ভয় কাটছে না চিকিৎসকদের

নতুন পরীক্ষাকেন্দ্র ও হাসপাতাল নিয়ে জটিলতা

তৌফিক মারুফ   

২৬ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নতুন পরীক্ষাকেন্দ্র ও হাসপাতাল নিয়ে জটিলতা

প্রথমে বিদেশফেরত ব্যক্তিদের মাধ্যমে তাঁদের স্বজনদের মধ্যে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়লেও এখন কমিউনিটিতেও ছড়িয়েছে। ফলে পরীক্ষার পরিধি যেমন বাড়াতে হচ্ছে সরকারকে, তেমনি চিকিৎসকদেরও দায়িত্ব পালন আরো জরুরি হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠিন (আইইডিসিআর) পাশাপাশি ঢাকায় আরো তিনটি এবং ঢাকার বাইরে সাতটি স্থানে পরীক্ষার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে আজ-কালের মধ্যেই পরীক্ষা শুরুর কথা রয়েছে। হাসপাতালের সংখ্যাও আরো বাড়ছে। তবে এ দুই ক্ষেত্রেই দেখা দিয়েছে জটিলতা। এমনকি আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা নিয়েও নতুন করে কিছু কারিগরি জটিলতার মুখে পড়েছে সরকার, যা দ্রুত সময়ের মধ্যে সমাধানের চেষ্টা চলছে বলে জানানো হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে। আবার অনেক স্থানে চিকিৎসকরা প্রাইভেট চেম্বারও বন্ধ করে দিয়েছেন।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, সরকার যে নতুন কয়েকটি পরীক্ষাকেন্দ্র চালুর প্রক্রিয়া শুরুর চেষ্টা করছে, এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিজের প্রতিষ্ঠানের রোগীদের পারিপার্শ্বিক সুরক্ষার অজুহাতে ওই পরীক্ষা কার্যক্রম চালাতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছে। এমনকি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য যে আটটি প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করেছিল, সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষও তাদের হাসপাতালকে করোনা চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করতে দিতে রাজি হচ্ছে না।

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়কারী ডা. সামন্ত লাল সেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের এই হাসপাতালে প্রায় ৩০০ রোগী রয়েছে। এ ছাড়া আইসিইউতেও রোগী আছে। আমরা তাদের কোথায় সরাব, সেটা ঠিক করতে হবে। পুরনো হাসপাতালেও জায়গা নেই। ফলে কিভাবে আমরা এখন এই হাসপাতাল খালি করে দিই, সেটা সবার বুঝতে পারা উচিত। এ ছাড়া যেকোনো সময় যদি কোনো বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটে যায়, সেটাও তো সামাল দেওয়া জরুরি।’

আবার বর্ধিত যে কয়টি পরীক্ষাকেন্দ্রের কথা বলা হয়েছে, এর মধ্যে সব কটিতেই যেকোনো মানুষ সরাসরি গিয়ে পরীক্ষা করাতে পারবে না। কেবল নমুনা পাঠালে পরীক্ষা করে দিতে পারবে। এ বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণাগত কিছু ভ্রান্তি তৈরি হয়েছে বলেও জানা গেছে।

ঢাকা শিশু হাসপাতালকেও অন্যতম পরীক্ষাকেন্দ্র হিসেবে বলেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে এই হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ সফি আহম্মদ মুয়াজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এখানে সরাসরি কোনো সন্দেহজনক রোগীকে আসতে দেব না, এখানে থাকা শিশুদের সুরক্ষার কারণেই। তবে যেহেতু আমাদের প্রযুক্তি আছে, তাই এটা কেবল কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে যদি নমুনা সংগ্রহ করে এখানে পাঠানো হয়, সেই নমুনার পরীক্ষা করে ফলাফল জানিয়ে দিতে পারব।’

এদিকে ঢাকার বাইরেও অনেক এলাকায় চিকিৎসকদের দায়িত্ব পালন না করার খবর পাওয়া যাচ্ছে। আবার এরই মধ্যে ঢাকায় কয়েকজন রোগীকে কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরতে হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চিকিৎসকদের আতঙ্ক ও নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের প্রচারণা চলছে। সেই সঙ্গে কয়েকজন চিকিৎসকের করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে এবং কেউ কেউ কোয়ারেন্টিনেও আছেন। ফলে চিকিৎসকদের ভয় আরো বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক নেতারা।

প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে তাঁরা নিরাপদে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভয় পেতে পারেন। যে কারণে রোগীদের বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে একই সঙ্গে চিকিৎসকদের এটিও মাথায় রাখতে হবে যে ঝুঁকি নিয়েই তাঁদের পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে. রোগীদের জীবন বাঁচাতে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

ডা. আব্দুল্লাহ বলেন, ‘কোনো সংকট থাকলেও সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েই কাজ করতে হয় চিকিৎসকদের; যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যা করে থাকেন চিকিৎসকরা, এখন সেটাই করতে হবে। এ ছাড়া সবার এটাও জানা দরকার যে সব ডাক্তারেরই সব রকম পিপিইর দরকার নেই। সরকার এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলোতে পিপিই সরবরাহ করে যাচ্ছে। এটি চলমান প্রক্রিয়া, সরকার প্রতিদিনই এগুলো সংগ্রহ ও বিতরণ করছে। এ ছাড়া কেবল বাংলাদেশই নয়, বিশ্বজুড়েই চিকিৎসাকর্মীদের নিরাপত্তা উপকরণের ঘাটতি রয়েছে।’

চিকিৎসাকর্মীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা উপকরণ নিয়ে দেশজুড়ে চলছে এক ধরনের হাহাকার পরিস্থিতি। বিভিন্ন দিক থেকে গণমাধ্যমের কাছে অভিযোগ করা হচ্ছে, তাঁরা নিরাপত্তা উপকরণ পাচ্ছেন না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রতিদিনই জানানো হচ্ছে, হাজার হাজার উপকরণ বিতরণ করা হচ্ছে কন্ট্রোল রুম থেকে। আবার বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংগঠন প্রতিদিনই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা উপকরণ অনুদান হিসেবে দিচ্ছে। কন্ট্রোল রুম উপকরণ সংগ্রহ করে তালিকা অনুযায়ী পাঠিয়ে দিচ্ছে বিভিন্ন হাসপাতালে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমে দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা উপকরণ আসছে বিভিন্ন পরিবহনে। চিকিৎসক নেতা ও কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তা বুঝে রাখা হচ্ছে।

কন্ট্রোল রুমে উপস্থিত স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি চিকিৎসকদের ভয় কাটাতে। তাঁরা যাতে রোগীদের ফিরিয়ে না দেন বা চিকিৎসাবঞ্চিত না করেন। এ ছাড়া এই কন্ট্রোল রুম থেকে যাতে সারা দেশে সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে যতটা সম্ভব চিকিৎসকদের নিরাপত্তা উপকরণ বিতরণ করা যায়, সে বিষয়গুলো সমন্বয় করার কাজ করছি।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম সূত্র জানায়, গতকাল পর্যন্ত মোট তিন লাখ ৫৭ হাজার পিপিই সংগ্রহ হয়েছিল। এর মধ্যে দুই লাখ ৯১ হাজার বিতরণ করা হয়েছে এবং ৬৬ হাজার মজুদ রয়েছে। এ ছাড়া আরো সংগ্রহের পর্যায়ে রয়েছে। এসব উপকরণের মধ্যে রয়েছে পরীক্ষা ও সার্জিক্যাল গ্লাভস, হ্যান্ড রাব, মাস্ক, ক্যাপ, শু কাভার, প্রটেকটিভ কাভার অ্যান্ড সার্জিক্যাল মাস্ক, কম্বো সার্জিক্যাল ড্রেস, গাউন ও আই প্রটেক্টর গগলস।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিদিনই আমাদের এখানে বিভিন্ন পর্যায় থেকে বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা উপকরণ আসছে। আমরা তা সাধ্যমতো বিতরণ করে যাচ্ছি।’

এদিকে পরীক্ষার বিষয়ে আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আরো নতুন কয়েকটি সেন্টারে আজকালের মধ্যেই পরীক্ষা চালু করতে যাচ্ছি।’ ওই বিশেষজ্ঞও বলেন, সব পর্যায়ের চিকিৎসাকর্মীদের জন্য সব ধরনের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা উপকরণের দরকার নেই। কোন পর্যায়ের চিকিৎসাকর্মীর জন্য কোন উপকরণ লাগবে এবং কখন তা ব্যবহার করতে হবে তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইনেই দেওয়া আছে।

এদিকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ চিকিৎসায় সংকট দেখা দিয়েছে। জেলা-উপজেলাগুলোতে অনেক চিকিৎসক তাঁদের চেম্বার বন্ধ রেখে বাড়িতে অবস্থান করছেন। অনেক চিকিৎসক অনির্দিষ্টকালের জন্য চিকিৎসাসেবা বন্ধ বলে চেম্বারের সামনে পোস্টার টাঙিয়ে রেখেছেন। করোনাভাইরাস ঘোষণার পর থেকেই চিকিৎসকদের মধ্যে এই অনীহা দেখা যাচ্ছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতেও রোগী দেখার বিষয়ে চিকিৎসকদের অনাগ্রহের কথা জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

ফরিদপুর শহরের শিশু চিকিৎসক ডা. খন্দকার এ এইচ সায়াদ প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন শহরের আরোগ্য সদন নামের একটি ক্লিনিকে। তাঁর চেম্বারটি বন্ধ। চেম্বারের দরজায় লিখে রেখেছেন, ‘অনিবার্য কারণবশত ২৩/৩/২০২০ তারিখ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য চেম্বারে রোগী দেখা বন্ধ থাকবে’। একই প্রতিষ্ঠানের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জেবুননেছাও চিকিৎসাসেবা দান থেকে বিরত রয়েছেন।

বরিশাল নগরের বেশির ভাগ প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসকসংকট দেখা দিয়েছে। চিকিসত্করা হাসপাতালে আসছেন না। নগরীর ল্যাবএইড হাসপাতালে রোগী দেখা বন্ধ করে দিয়েছেন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শিখা সাহা, মেডিসিন ও লিভার বিশেষজ্ঞ ডা. স্বপন কুমার সরকার এবং একই বিভাগের ডা. সাইদুর রহমান। বরিশাল নগরীর আলেকান্দা এলাকার বাসিন্দা আরিফুর রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, তিনি তাঁর ছয় বছর বয়সী অসুস্থ ভাগ্নেকে নিয়ে গত শনিবার ডা. হামিদ শেখের প্রাইভেট চেম্বারে গিয়ে জানতে পারেন, ডাক্তার চেম্বারে আসবেন না।

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কর্মস্থলে আসছেন না। কখনো এলে শুধু স্বাক্ষর করে বাড়ি চলে যান। এ বিষয়ে ডা. আবদুল জব্বার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন মোবাইলের যুগ, আবাসিক চিকিৎসক হলেই তাঁকে রাতে হাসপাতালে থাকতে হবে—এটা জরুরি নয়।’

প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন কালের কণ্ঠ’র নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা ও বরিশাল এবং পীরগঞ্জ (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা