kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

জাতীয়করণের ৩০২ কলেজে হাহাকার

► শিক্ষক-কর্মচারী আত্তীকরণে ধীরগতি
► সরকারি কলেজে চাকরি করেও অবসরে যাচ্ছেন বেসরকারি হিসেবে
► নিয়োগ বন্ধ, শিক্ষক সংকটে লেখাপড়া ব্যাহত
►অনেক বিভাগে শিক্ষকের সব পদই শূন্য

শরীফুল আলম সুমন   

২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জাতীয়করণের ৩০২ কলেজে হাহাকার

রংপুরের তারাগঞ্জ কলেজ ২০১৬ সালে জাতীয়করণের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পায়। এরপর ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট কলেজটি সরকারীকরণের গেজেট হয়। কিন্তু ২০১৬ সাল থেকেই ওই কলেজে অর্থ ব্যয় ও নিয়োগ কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরই মধ্যে কলেজটির ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক রশিদুল হক ও আবু বকর সিদ্দিক অবসর নিয়েছেন। আগামী মে মাসে ওই বিভাগের একমাত্র শিক্ষক গোলাম রব্বানি লাবুও অবসরে যাবেন।

গোলাম রব্বানি লাবু বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের কলেজের শিক্ষার্থী প্রায় তিন হাজার। শিক্ষক আছেন মাত্র ৩৯ জন। কমপক্ষে ১৫ শিক্ষকের পদ ফাঁকা। ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে আমি চলে গেলে এই বিভাগও ফাঁকা হয়ে যাবে। কিন্তু পরীক্ষা তো থেমে থাকবে না। শিক্ষার্থীদের ক্লাস ছাড়াই পরীক্ষায় বসতে হবে।’

তারাগঞ্জ কলেজ থেকে সম্প্রতি অবসরে গেছেন হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মিজানুর রহমান ও কাজী লুত্ফর রহমান, যুক্তিবিদ্যার আবদুর রহমান ও ইংরেজি বিভাগের আবদুল কাদের। আগামী জুনে অবসরে যাবেন ইংরেজি বিভাগের একরামুল হক। তখন ইংরেজি বিভাগও শূন্য হয়ে যাবে।

রংপুরের বদরগঞ্জ কলেজে সম্প্রতি অবসরে গেছেন হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষক নজরুল ইসলাম ও আমিরুল হক বাবু এবং ইতিহাসের মতিনুর রহমান ও আফরোজা বানু। এ দুই বিভাগেই এখন একজন করে শিক্ষক। এ ছাড়া রসায়ন ও দর্শন বিভাগের শিক্ষকও অবসরে গেছেন।

বদরগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মু. মাজেদ আলী খান বলেন, ‘আমাদের শিক্ষকের প্যাটার্ন ৫২ জনের, আছে ৩৪ জন। দুই হাজার শিক্ষার্থীর এই কলেজ চালাতে গিয়ে শিক্ষক সংকটে ভুগছি। ইতিহাসের মজিবুর রহমান চৌধুরী ও হিসাববিজ্ঞানের ইয়াসীন আলীকে প্রতিদিন ছয়টি করে ক্লাস নিতে হয়। এভাবে কত দিন চালানো যায়? সামনে আরো শিক্ষক অবসরে যাবেন। তখন কোনোভাবেই ক্লাস চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।’

জানা যায়, জাতীয়করণের গেজেট হওয়া ৩০২ কলেজের সবটিরই কমবেশি একই হাল। বিশেষ করে যেসব কলেজে ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালে বেশি শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন তাদের সংকট অনেকখানি বেশি। এর মধ্যে ইংরেজি, ইতিহাস ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখার শিক্ষক সংকট প্রকট। এমনকি অনেক কলেজের দু-একটি বিভাগে একজন শিক্ষকও নেই।

এ ব্যাপারে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ গোলাম ফারুক বলেন, ‘জাতীয়করণ হওয়া কলেজ শিক্ষকদের আত্তীকরণে মাউশির কাগজ যাচাইয়ের কাজ শেষ। এখন মন্ত্রণালয় কাজ করছে। আমরা দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করছি। পুরনো সরকারি কলেজেও শিক্ষক সংকট রয়েছে। জাতীয়করণ কলেজের শিক্ষকরা যেহেতু অবসরে যাচ্ছেন, তাই সেখানে সংকট তৈরি হচ্ছে। এই সমস্যা কিভাবে কাটিয়ে ওঠা যায় সে ব্যাপারে শীঘ্রই আমরা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে করণীয় ঠিক করব।’

জানা যায়, জাতীয়করণের লক্ষ্যে ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পায় ৩০২টি কলেজ। এরপর ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট কলেজ সরকারীকরণের গেজেট হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত শিক্ষকদের চাকরি আত্তীকরণ সম্ভব হয়নি। শুধু কাগজপত্র যাচাই-বাছাই চলছে।

তবে আত্তীকরণের আগে যেসব শিক্ষক অবসরে যাচ্ছেন তাঁরা সরকারি কলেজে চাকরি করেও বেসরকারি শিক্ষকের মর্যাদা নিয়ে অবসরে যাচ্ছেন। এমনকি সরকারি সুযোগ-সুবিধাও পাচ্ছেন না। এতে শিক্ষকদের কষ্ট দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

জানা যায়, কলেজগুলো জাতীয়করণের সম্মতির পর মাউশি অধিদপ্তর ও তাদের আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোর পরিদর্শকদল সরেজমিন কলেজে গিয়ে প্রত্যেক শিক্ষকের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে। জাতীয়করণের গেজেট হওয়ার পর আবার প্রত্যেক শিক্ষককে কাগজপত্র মাউশি অধিদপ্তরে জমা দিতে হয়। এরপর কয়েকটি কলেজকে মডেল হিসেবে ধরে পদ সৃজনের জন্যও কিছু কলেজের কাগজপত্র নেওয়া হয়। এ বছরের এপ্রিল থেকে আবারও প্রত্যেক শিক্ষকের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শুরু করে মাউশি অধিদপ্তর। বর্তমানে ফাইলগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর তারাও আবার যাচাই-বাছাই শুরু করেছে।

সূত্র জানায়, মাউশি অধিদপ্তরে শিক্ষকদের চাকরি আত্তীকরণের মূল দায়িত্বে ছিলেন পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন)। তিনি বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সাবেক মহাসচিব। তিনি কলেজ জাতীয়করণ ও শিক্ষকদের চাকরি আত্তীকরণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর হাতেই যেহেতু যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব, তাই তিনি নানা ছুতায় সময় ক্ষেপণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানা যায়, দুই-তিন বছরের মধ্যে যেসব শিক্ষক-কর্মচারী অবসরে যাবেন তাঁরাও শঙ্কায় রয়েছেন। কারণ যদি এই সময়ের মধ্যে আত্তীকরণ শেষ না হয়, তাহলে তাঁদেরও সরকারি কলেজে চাকরি করেও বেসরকারি হিসেবেই অবসরে যেতে হবে। এ জন্য অনেক শিক্ষক পাঠদানেও মন বসাতে পারছেন না।

জাতীয়করণ শিক্ষকদের সংগঠন সরকারি কলেজ শিক্ষক সমিতির (সকশিস) সভাপতি জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যে গত সাড়ে তিন বছরে এক-চতুর্থাংশ অবসরে গেছেন। শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি আত্তীকরণে এক কাগজ কেন বারবার যাচাই হচ্ছে তা আমাদের বোধগম্য নয়। এভাবে চলতে থাকলে চার-পাঁচ বছরেও আত্তীকরণ শেষ হবে না। আর কলেজগুলো সরকারি করা হলো শিক্ষার মান উন্নয়নের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এখন যেভাবে শিক্ষক সংকট বিরাজ করছে, তাতে আগের চেয়ে শিক্ষার মান আরো নিচের দিকে নামছে। ফলে প্রধানমন্ত্রী যেই উদ্দেশ্য নিয়ে সরকারি করেছিলেন, তা ব্যাহত হচ্ছে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা