kalerkantho

শুক্রবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৭ নভেম্বর ২০২০। ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

জেলার প্রধান সমস্যা : মানিকগঞ্জ

যানজটে থেমে থাকে শহরের জীবনযাত্রা

সাব্বিরুল ইসলাম সাবু, মানিকগঞ্জ   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



যানজটে থেমে থাকে শহরের জীবনযাত্রা

রাজধানী ঢাকার অদূরের জেলা মানিকগঞ্জ। জেলা শহরের শহীদ রফিক সড়কের পাশেই খোন্দকার খালেকুজ্জামানের আবাস। কয়েক বছর আগেও সড়কের পাশে টুল ফেলে শীতের সকালে রোদ পোহাতেন। অন্যান্য বাসিন্দা আর দোকানদাররা মিলে জমে উঠত জম্পেশ আড্ডা। রিকশা আর কদাচিৎ আসা-যাওয়া করা মোটর গাড়ি সেই আড্ডায় সমস্যা ঘটাত না। বর্তমানে সেই সড়কে স্রোতের মতো ছুটে চলেছে যানবাহন। টুলে বসা দূরে থাক, রাস্তার পাশে একদণ্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাও সম্ভব নয়।

খোন্দকার খালেকুজ্জামান বললেন, ‘আমাদের মতো বয়স্কদের জন্য এই শহরে হাঁটাচলা করাটাও এখন আর নিরাপদ নয়। কখন না ঘাড়ের ওপর গাড়ি উঠে পড়ে! আর ভিড়ের কারণে ফুটপাত দিয়েও হাঁটার সুযোগ নেই। মানিকগঞ্জে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে হাঁটার সুযোগটুকুও থাকবে না, তেমন উন্নয়নের প্রয়োজন কি?’

অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহম্মেদ নান্নুর দৃষ্টিতে মানিকগঞ্জের প্রধান সমস্যা যানজট। এই সমস্যা জেলা শহর ছাড়িয়ে ক্রমেই উপজেলা সদরগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, ‘সরকারি-বেসরকারি চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নানা কারণে শহরে মানুষ বাড়ছে। তৈরি হচ্ছে বাড়িঘর, বহুতল বিপণিবিতান। বাড়ছে হাট-বাজার, দোকানপাট। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যানবাহন। কিন্তু রাস্তা প্রশস্ত হয়নি। নতুন রাস্তাও হয়নি। তার ওপর পৌরসভা, জেলা পরিষদ, এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাজে সমন্বয় নেই। অবস্থার উত্তরণে রাস্তা প্রশস্তকরণ, নতুন রাস্তা নির্মাণ ও কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।’

মানিকগঞ্জ শহরে ১০-১৫ বছর আগেও যানজট বলতে কিছু ছিল না। শহরবাসীর চলাচলের একমাত্র বাহন ছিল রিকশা। আর ছিল বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কিছু গাড়ি। ব্যক্তিগত গাড়ি ছিল হাতে গোনা। সেই শহরে এখন নানা যানবাহনের ভিড়ে দম নেওয়াও কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

শহরের প্রধান সড়কটির নামকরণ করা হয়েছে ভাষা শহীদ রফিকের নামে। বাসস্ট্যান্ড থেকে বাজার পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তাটি ঘিরে মূল শহর। রাস্তার গড় প্রশস্ততা ১৫ ফুট। এর দুই পাশে শত শত দোকানপাট, বহুতল বিপণিবিতান, ফ্ল্যাট বাড়ি আর সরকারি-বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠান। রাস্তাটির দুই মাথায় রয়েছে বড় বাজার। সকাল না হতেই এই রাস্তায় মানুষ আর যানবাহনের ঢল নামে। অটোরিকশা, রিকশা, টেম্পো, প্রাইভেট কার, ট্রাকসহ সব ধরনের যানবাহন। সামনের গাড়িটি থামতে হলে পেছনে গাড়ি ওভারটেক করার সুযোগ নেই। আর মুহূর্তেই পেছনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দীর্ঘতর হতে থাকে। আবার ফুটপাতে জায়গা না হওয়ায় রাস্তায় নেমে আসতে হয় পথচারীদের। তার ওপর কোথাও কোথাও ফুটপাত দখল করে রাখা হয় দোকানের জিনিসপত্র ও নির্মাণসামগ্রী।

শহীদ রফিক সড়কের চার রাস্তার মোড় থেকে বেওথা ঘাট পর্যন্ত আধা কিলোমিটার রাস্তারও একই অবস্থা। এই সড়কের পাশজুড়েই রয়েছে নানা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোয়ার্টার, জেলা প্রশাসকের বাসভবনসহ সাধারণের আবাসিক এলাকা। অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত হলেও সড়কটিকে ভয়ংকর সড়ক হিসেবে চেনে সবাই। এর মূল কারণ বালুবাহী ট্রাকের বেপরোয়া চলাচল।

স্টেডিয়ামের কাছে তিন রাস্তার মোড় থেকে দুধবাজার পর্যন্ত সড়কটিতেও সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যানবাহন আর মানুষের ভিড় লেগে থাকে। ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয় শিক্ষার্থীদের।

সিংগাইর, সাটুরিয়া, শিবালয়, ঘিওরসহ মানিকগঞ্জের উপজেলা সদরগুলোও যানজটের যন্ত্রণামুক্ত নয়। ঘিওর সদর থেকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক পর্যন্ত রাস্তাটি সরু হওয়ায় যানজট লেগেই থাকে। একই কারণে বাসস্ট্যান্ড থেকে উপজেলা পরিষদ পর্যন্ত রাস্তায় সব সময় থাকে যানবাহনের ভিড়। সাটুরিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে উপজেলা পরিষদ পর্যন্ত তিন কিলোমিটার রাস্তায় চলতে গেলেই ভয়াবহ যানজটে পড়তে হয়। ঢাকা-হেমায়েতপুর-মানিকগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে সিংগাইর বাসস্ট্যান্ড। রাস্তাটি অপ্রশস্ত হওয়ায় বাসস্ট্যান্ড থেকে বাজার পর্যন্ত আধাকিলোমিটার যেতে লেগে যায় কমপক্ষে আধাঘণ্টা। শিবালয় উপজেলার অভ্যন্তরীণ সমস্যার পাশাপাশি পাটুরিয়া ফেরিঘাটে যানজট তো একটি জাতীয় সমস্যা।

সড়ক ও জনপথ, এলজিইডি, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপকালে তাঁরাও স্বীকার করেন মানিকগঞ্জে যানজট বড় সমস্যা। তাঁদের ভাষ্য মতে, মানিকগঞ্জ নিচু এলাকা। রাস্তা নির্মাণ করতে হয় অনেকটা উঁচু করে। ফলে রাস্তার পাশে বাড়তি জায়গা থাকে না। প্রশস্ত করে রাস্তা নির্মাণ করতে হলে জমি অধিগ্রহণে অনেক টাকার প্রয়োজন। কিন্তু সে অনুযায়ী বরাদ্দ মেলে না। অথচ যানজটমুক্ত করতে হলে রাস্তা প্রশস্ত করার বিকল্প নেই।

মানিকগঞ্জ পৌরসভার মেয়র গাজী কামরুল হুদা সেলিম বলেন, ‘যানজট সমস্যা নিরসনে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের মতামতের ভিত্তিতে একটি মহাপরিকল্পনা দরকার। এ জন্য জেলার রাজনৈতিক-সামাজিক নেতারাসহ সর্বস্তরের মানুষকে সোচ্চার হতে হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা