kalerkantho

সোমবার । ২৩ চৈত্র ১৪২৬। ৬ এপ্রিল ২০২০। ১১ শাবান ১৪৪১

বনানীতে ‘দুর্ঘটনায়’ দুই নারীর মৃত্যু রহস্যঘেরা

শনাক্ত হয়নি ধাক্কা দেওয়া গাড়ি ► যাত্রাপথের তথ্য নেই স্বজনদের কাছে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বনানীতে ‘দুর্ঘটনায়’ দুই নারীর মৃত্যু রহস্যঘেরা

রাজধানীর বনানীতে রাস্তা থেকে উদ্ধার হওয়া দুই নারীর মরদেহের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁদের একজন কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের পালটিলার মৃত সৈয়দ ফজলুল হকের মেয়ে সৈয়দা দুলদানা কচি (৩২) ও আরেকজন ভোলা সদর উপজেলার মাছভেদুরিয়া গ্রামের নুরুল আমিনের মেয়ে সোনিয়া আক্তার (২৬)। পরস্পর বান্ধবী এই দুজন অনলাইনে প্রসাধন সামগ্রীর ব্যবসা করতেন।

স্বজনরা জানান, কচি রাজধানীর কল্যাণপুরে নতুন বাজারে একটি বাসায় সাবলেট থাকতেন। ব্যক্তিগত জীবনে অবিবাহিত এই নারী অনলাইনে প্রসাধনী বিক্রির পাশাপাশি স্কুটি চালিয়ে রাইড শেয়ারিং করতেন। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত ‘প্রেস’ লেখা মোটর সাইকেলটি তাঁর এবং তিনি সাংবাদিকতা করতেন বলে দাবি স্বজনদের।

কচির বান্ধবী সোনিয়া পরিবারের সঙ্গে মিরপুর শাহ আলীর গুদারাঘাটের কাজীপুরী এলাকায় থাকতেন। তবে তিনি প্রায়ই কচির বাসায় থাকতেন এবং অনলাইনে প্রসাধনীর ব্যবসা করতেন। তিনি ভারতীয় এক নাগরিককে বিয়ে করেছিলেন।

স্বজনরা বলছেন, গত মঙ্গলবার রাতে বনানীতে লিলি নামে একজনের বাসায় যান দু’জন। এরপর মধ্যরাতে  তারা কীভাবে ‘সড়ক দুর্ঘটনায়’ প্রাণ হারান তা বুঝতে পারছেন না তারা।

কোন গাড়ির ধাক্কায় এই প্রাণহানি হয়েছে তা গতকাল বুধবার রাত ১০টা পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বা সিসি ক্যামেরার ফুটেজও মেলেনি। দুই নারী কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছিলেন তা-ও নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা স্কুটির মালিকানার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। বিআরটিএ-তে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা মেট্রো-হ-২৪-৪২৮৩ নম্বরের বাহনটি রানার অটোমোবাইল কোম্পানির নামেই রেজেস্ট্রেশন করা।

বনানী থানার ওসি নূরে আজম মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রাথমিক আলামত দেখে কোন ভারি যানবাহন স্কুটিকে ধাক্কা দেওয়ায় দুই নারীর মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে কোনো প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া যায়নি। সেতু ভবনে সিসি ক্যামেরা থাকলেও গেটের বাইরে রাস্তা পর্যন্ত সেটি কাভার করে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘পরিচয় পাওয়া গেলেও ওই দুই নারী কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছিলেন এবং তারা সাংবাদিক কীনা তা-ও জানা যায়নি। এটি সড়ক দুর্ঘটনা নাকি অন্য কিছু তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গতকাল কচির মামা অ্যাডভোকেট নুরুল আমিন ভূঁইয়া বলেন, ‘কচি উত্তরায় পার্ল ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী ছিল। দুই বোনের মধ্যে সে ছিল ছোট। কল্যাণপুরের একটি বাসায় এক রুমে ভাড়া থাকতো সে। নিজের স্কুটারে চলাফেরা করত। স্বাভাবিকভাবে সে সকাল ৯টায় অফিসে যেত। আবার রাত ১১টার আগেই বাসায় ফিরতো। তবে গতকাল (মঙ্গলবার) এত রাতে সে কোথায় যাচ্ছিল তা বলতে পারছি না।’

সোনিয়ার মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘সোনিয়া ও কচি প্রায়ই একসঙ্গে থাকতো। মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে আমার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয় সোনিয়ার। সে জানায়, ওদের এক আপু লিলির বনানীর বাসায় যাচ্ছে। পরে রাতে সোনিয়ার মোবাইল ফোন থেকে কল করে বাসযাত্রী পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি জানায়, একটি কাভার্ড ভ্যান সোনিয়াদের ধাক্কা দিয়েছে। এরপর থেকে ফোন বন্ধ। পরে খুজতে খুঁজতে হাসপাতালে এসে ওদের লাশ পাই।’ স্বজনরা জানান, সোনিয়া অনলাইনে ব্যবসার কারণে ভারতে যাওয়া-আসা করতেন। সেখানে মহসিন নামে এক ভারতীয় নাগরিককে নয় মাস আগে বিয়ে করেন তিনি।’

বনানী সেতু ভবনের সামনের সড়ক থেকে দু’জনকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান প্রাইভেটকার চালক সাদ্দাম হোসেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘রাস্তায় ভিড় দেখে এগিয়ে গিয়ে দু’জনকে পড়ে থাকতে দেখি। তাদের মধ্যে একজন জীবিত ছিল ধারণা করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাই। তবে দুর্ঘটনার ব্যাপারে সেখানে উপস্থিত লোকজনও কিছু বলতে পারেনি।’

কচি ফটোসাংবাদিক ছিলেন!   

হাওরাঞ্চল প্রতিনিধি জানান, দুর্ঘটনার আগের দিন সোমবার রাতে বড় বোন সৈয়দা আফসানা চুমকিকে ফোন করে সাড়ে চার বছরের ভাগ্নে তামজিদের খোঁজখবর নেন কচি। বড় বোন ছাড়া আপনজন বলতে তার কেউ ছিল না। বাবা সৈয়দ ফজলুল হক মারা যান ছোটবেলায়। কয়েক বছর আগে মারা যান মা রেখা আক্তার। ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল রাতে নিজ বাড়ি কুলিয়ারচরের পালটিয়ায় নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

সরেজমিনে গতকাল বিকালে পালটিয়ায় গিয়ে দেখা যায়, কচিদের বাড়িতে আত্মীয় ও গ্রামের মানুষ ভিড় করেছেন। আফসানা চুমকি ছোট বোনের সংগ্রামী জীবনের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি জানান, লেখাপড়া করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন ছিল কচির। সেজন্য বিয়ে করেননি।

কচির মরদেহ বাড়ি নিয়ে যান চাচাতো ভাইয়ের ছেলে অ্যাডভোকেট তাসমিন আজাদ। তিনি জানান, কচি সৌখিন ফটোসাংবাদিক ছিলেন। একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে ফটোসাংবাদিক হিসাবে কাজ করতেন। তবে অনলাইন নিউজ পোর্টালটির নাম জানাতে পারেননি তিনি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা