kalerkantho

রবিবার । ২২ চৈত্র ১৪২৬। ৫ এপ্রিল ২০২০। ১০ শাবান ১৪৪১

প্রকাশকের মেলা

বইমেলা এক মাসের, বই পুরো বছরের

জাফর আহমদ রাশেদ

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বইমেলা এক মাসের, বই পুরো বছরের

অমর একুশে বইমেলা আমাদের প্রাণের মেলা—এই কথাটা বলতে কী যে ভালো লাগে! বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের পরিসর ছাড়িয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের খোলা মাঠে বইমেলার বিস্তার একটা বড় ঘটনা। কিন্তু একুশে বইমেলা প্রকাশকদের বিনিয়োগ যেমন কিছুটা তুলে আনতে সহায়তা করছে, তেমনি বইয়ের প্রকাশনাকে বৃত্তাবদ্ধ করে রেখেছে। আমাদের লেখকরা প্রধানত লেখেন ও পাণ্ডুলিপি তৈরি করেন বইমেলাকে সামনে রেখে; প্রকাশকদের বইয়ের কাজও আবর্তিত হয় বইমেলাকে কেন্দ্র করে। বছরের বাকি সময় খুব অল্পসংখ্যক বই প্রকাশিত হয়। যেহেতু সারা বছর সে অর্থে বইয়ের কাজ হয় না, সে কারণে ছাপাখানা, বাঁধাইখানাসহ যাদের বইয়ের কাজে লাগে তাদের কাজকর্মও সীমিত হয়ে পড়ে। মেলার পরে প্রেস ও বাঁধাইখানায় লোক কমিয়ে দেওয়া হয়। মেলার সময় নতুন লোক আসে, যাদের অনেকেই পেশাদার কর্মী নয়। তাদের হাতে সব সময় মানসম্মত কাজ হয় না। প্রকাশনার জগতে তাই দক্ষ কর্মীর অভাব রয়ে যাচ্ছে।

প্রকাশনাশিল্পকে একটি শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে হলে পুরো বছর কাজ করতে হবে, পুরো বছর বই প্রকাশ করতে হবে। বইমেলার সময় বইয়ের বিষয়ে প্রচারমাধ্যমে যে প্রচারণা চলে, বছরের বাকি সময়টা তা আর হয় না। আবার বইমেলার সময় মেলায় প্রকাশিত বইয়েরই প্রচার হয়। বছরের অন্য সময় প্রকাশিত বইকে বইমেলার বই হিসেবে গণ্য করা হয় না।

প্রথমা প্রকাশনার যাত্রা শুরু ২০০৯ সালের মার্চ মাসে। বইমেলার সময় প্রথমার বই একটু বেশি প্রকাশিত হয় বটে, কিন্তু বই প্রকাশিত হয় পুরো বছরই। বইমেলার পর মার্চ থেকে প্রতি মাসে কমপক্ষে চারটি করে বই প্রকাশের ব্যাপারে আমাদের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আমরা মনে করি, একটি বইমেলার পর, মার্চ মাস থেকে পরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত এক বছর যত বই প্রকাশিত হয় সবই পরের বইমেলার নতুন বই। ২০-২১ বছর আগে থেকে প্রথম আলোর ‘সাহিত্য সাময়িকী’তে জুন-জুলাই মাসে বই নিয়ে তিনটি আয়োজন থাকত। এই আয়োজনে মার্চ থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক বছরে যত বই প্রকাশিত হতো, সব বইকে বইমেলার নতুন বই হিসেবে বিবেচনা করে তার মধ্য থেকে বই নির্বাচন করা হতো। এখন অন্য কোনো কোনো গণমাধ্যম বা কোনো কোনো সংবাদপত্রকর্মী তাঁদের প্রতিবেদন বা অন্যান্য রচনায় এক মেলার পরে প্রকাশিত সব বইকে পরের মেলার বই হিসেবে গণ্য করছেন এবং সেভাবে প্রচার করছেন। আসলে এক মেলার পরে প্রকাশিত সব বইকে বইমেলার বই হিসেবে গণ্য করা না হলে মেলাকেন্দ্রিক বইয়ের যে বৃত্তাবদ্ধতা, তা কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে না।

প্রকাশক শুধু নতুন বইগুলো নিয়ে মেলায় যান না। আগে প্রকাশিত বইগুলোও মেলায় নিয়ে যান। অনেক পুরনো বইও ভালো বিক্রি হয়। মেলার সময় প্রচারমাধ্যমে তারও উল্লেখ প্রয়োজন। ২০১৯ সালের বইমেলায় প্রকাশিত প্রথমার কোনো কোনো বই ২০২০ সালের মেলায়ও সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ১০টি বইয়ের তালিকায় রয়েছে। অন্য প্রকাশকের বেলায়ও তা ঘটছে। পাঠক গুরুত্ব দেন এমন পুরনো বইয়ের প্রচার হওয়া দরকার। কোনো বইয়ের নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হলে (নতুন মুদ্রণ নয়), তারও গুরুত্ব পাওয়া উচিত। তবে দেখতে হবে সত্যি কতটা সংস্কার করা হয়েছে।

বইয়ের জগিটকে পুরো বছর সক্রিয় রাখার বিকল্প নেই। এর জন্য আমরা কিছু প্রস্তাব রেখেছি। সংশ্লিষ্টজনরা নিশ্চয় আরো প্রস্তাব রাখবেন, প্রকাশকরা নতুন উদ্যোগ নেবেন। আরেকটি উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে তা হলো, জুন-জুলাই-আগস্ট মাসে একুশে বইমেলার চেয়ে অপেক্ষাকৃত ছোট পরিসরে হলেও জাতীয় পর্যায়ে আরো একটি বইমেলা করা। তখন বৃষ্টির আশঙ্কা থাকে। তাই মেলার প্রস্তুতি সেভাবে নিতে হবে। এক দিনে হবে না। কিছু সময় লাগবে। নতুন আর পুরনো বইয়ের প্রত্যক্ষ সংযোগ স্থাপনের জন্য এটি আরেকটি বিকল্প।

লেখক : ব্যবস্থাপক, প্রথমা প্রকাশন

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা