kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

সুজনের সংবাদ সম্মেলন

ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন ছিল ‘নিয়ন্ত্রিত’

► প্রতিপক্ষ দুর্বল ছিল বলে শান্তিপূর্ণ ভোট
► ভোটার কম উপস্থিত হওয়ার প্রধান কারণ নির্বাচনী ব্যবস্থায় আস্থা না থাকা
► জরিপে ৯৪ শতাংশই বলছে, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি   

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন ছিল ‘নিয়ন্ত্রিত’

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামগ্রিকভাবে ‘নিয়ন্ত্রিত’ ছিল মন্তব্য করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বলছে, ভয়ের সংস্কৃতি ও প্রতিপক্ষের চরম দুর্বলতার কারণে আপাতদৃষ্টিতে ভোট শান্তিপূর্ণ হয়েছে। ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার প্রধান কারণ নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা না থাকা বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। সুজনের মতে, অতীতের মতো সিটি নির্বাচনেও নিজের সামর্থ্য প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ফেসবুকভিত্তিক একটি জরিপের ফলাফল তুলে ধরে বেসরকারি সংস্থাটি জানিয়েছে, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি বলে মনে করে ৯৪ শতাংশ মানুষ।

গতকাল সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে ‘ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন ২০২০ : বিজয়ীদের তথ্য বিশ্লেষণ ও নির্বাচন মূল্যায়ন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সুজন নিজেদের মূল্যায়ন তুলে ধরেছে।

সুজন বলছে, সামগ্রিকভাবে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন ছিল ‘নিয়ন্ত্রিত’। তবে অতীতের তুলনায় নিয়ন্ত্রণের ধরন ছিল কিছুটা ভিন্ন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এই ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনগুলো যেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

লিখিত বক্তব্যে সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার বলেন, ‘একটি প্রচার আছে যে নির্বাচন ছিল শান্তিপূর্ণ। আমরা মনে করি, এই শান্তি অশান্তির চেয়েও ভয়াবহ। কেননা ভয়ের সংস্কৃতির কারণে কেউ যদি অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সাহস না পায়, তবে সেই অন্যায়ের প্রতিকার পাওয়া দুষ্কর। ব্যাপক অনিয়ম হওয়ার পরও যদি সেই নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়, তবে বুঝতে হবে প্রতিপক্ষ এখানে চরম দুর্বল।’

নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ছিল দুর্বল এবং নানা অনিয়ম হলেও বিএনপিকে প্রতিবাদী হতে দেখা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটারদের আস্থা ফেরাতে ভোটে হওয়া সব অনিয়মের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেন সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। ইভিএমে (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) কারচুপির অভিযোগ এনে তিনি বলেন, ‘অনেকগুলো অভিযোগ এসেছে, এগুলোর তদন্ত হওয়া দরকার। এগুলোর তদন্ত হলেই যা ঘটেছে সত্যিকারভাবে সেটা বের হয়ে আসবে; যার মাধ্যমে এই নির্বাচন কমিশনকে পরিশীলিত করতে পারব, নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসবে। এ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন ও ইভিএমের এক অগ্নিপরীক্ষা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এই অগ্নিপরীক্ষা তারা উত্তীর্ণ হতে পারেনি। তারা ব্যর্থ হয়েছে।’

একজনের ভোট আরেকজন দিয়ে দেওয়ার বহুল আলোচিত অভিযোগ নিয়ে সুজন বলছে, এর মধ্য দিয়ে নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে খুবই অল্প ভোট পড়েছে। উত্তর সিটিতে গড় ভোট পড়েছে ২৫.৩৪ শতাংশ এবং দক্ষিণে পড়েছে গড়ে ২৯.৭ শতাংশ। সিটি নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কম থাকার কারণ হিসেবে সুজন বলছে, নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর ভোটারদের আস্থা না থাকাই হলো প্রধান কারণ। ভোট সুষ্ঠু হবে না—এ ধরনের পূর্বধারণার কারণেও ভোটার উপস্থিতি কম হয়েছে।

কম ভোটার উপস্থিতির পেছনে আরো কিছু কারণ রয়েছে উল্লেখ করে সুজন বলছে, ইভিএমের ওপর আস্থা না থাকা, দলগুলোর পাল্টাপাল্টি হুমকির কারণে শঙ্কিত হয়ে ভোটারদের কেন্দ্রবিমুখ হওয়া, পাড়া-মহল্লা ও ভোটকেন্দ্র পাহারা এবং ভোটকেন্দ্রের বাইরে সরকারদলীয় কর্মী-সমর্থকদের জটলা ও মহড়া, আঙুলের ছাপ না মেলায় কিছু ভোটারের ভোট না দিয়েই ফিরে যাওয়া, একজনের ভোট আরেকজন দিয়ে দেওয়ার বিষয়টি প্রচার হওয়া, ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের মধ্যে ‘ভোটকেন্দ্রে না গেলেও তাদের প্রার্থীরা জয়ী হবেই’ এমন ধারণায় বদ্ধমূল থাকা, প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যে শঙ্কা ও ‘তাদের প্রার্থী জিততে পারবে না’ এমন ধারণা সৃষ্টি হওয়া, এ ছাড়া যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকা ও একসঙ্গে দুই দিন ছুটি থাকাও ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার অন্যতম কারণ।

ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন কেমন হয়েছে, তা জানতে চেয়ে ফেসবুক পেজে একটি অনলাইন জরিপ করেছে সুজন। এতে চার হাজার ৩০০ জন অংশ নেন। সুজন জানায়, যাঁরা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, তাঁদের ৯৪ শতাংশই বলেছে, নির্বাচনগুলো অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়নি। যদিও অনলাইন ভোট বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নয়, এটি জনসাধারণের ধারণার অনেকটা ইঙ্গিত বহন করে।

সুজন বলেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ঢাকা উত্তর ও ঢাকা সিটি নির্বাচন ইসির সামর্থ্য প্রমাণের সুযোগ হিসেবে এসেছিল। কিন্তু এ সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে ইসি। আর ইভিএম সম্পর্কে ভোটারদের মধ্যে যে উদ্বেগ ও আস্থাহীনতা ছিল, এই নির্বাচনের পর তা কাটিয়ে উঠা সম্ভব হয়নি ইসির পক্ষে। বরং সেগুলো আরো প্রকট হয়েছে। এই উদ্বেগ ও আস্থাহীনতা আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থার পুরোপুরি ভেঙে পড়ার ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করছে। তবে নির্বাচনই ক্ষমতা বদলের একমাত্র বৈধ এবং শান্তিপূর্ণ পথ। যদি ক্ষমতা হন্তান্তরের শান্তিপূর্ণ পথটি রুদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে আমরা এক অশুভ ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হতে পারি, যার দায় সরকার ও ইসিকে নিতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সুজনের সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খান। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. রুবায়েত ফেরদৌসও বক্তব্য দেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা