kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

প্রকাশকের মেলা

প্রকাশনা নিয়ে তিনটি প্রসঙ্গ

মাহ্রুখ মহিউদ্দিন

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রকাশনা নিয়ে তিনটি প্রসঙ্গ

ফেব্রুয়ারি মাস এলেই সকলের মনোযোগের কেন্দ্রে চলে আসে বইয়ের জগৎ। এটা এক দিক থেকে ইতিবাচক। কারণ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সারা বছর একই সঙ্গে কয়েক হাজার জগৎ সারাক্ষণ পাল্লা দিয়ে চলেছে। তাই এক মাস ধরে লেখালেখি, বই তৈরি, ভাষা, সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চা, সম্পাদনা নিয়ে উদ্‌যাপন আর আহাজারি হতে থাকার মধ্যে অনেক কিছু ভালো নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হলো—বছরের বাকি সময় মননশীল প্রকাশকরা খানিকটা নিভৃতে কাজ করতে থাকেন; তাঁদের কেউ তেমন খোঁজ-খবর নেন না। তাঁরা কী কী প্রতিকূলতার মধ্যে টিকে আছেন, প্রায় কোনো মুনাফা হবে না জেনেও একের পর এক প্রয়োজনীয় বই কেন প্রকাশ করে চলেছেন, দারুণ সব আইডিয়া থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁদের কিছু স্বপ্নের বই তৈরি করতে পারছেন না, প্রকাশ করার পর বইয়ের খবর কেন ছড়িয়ে দিতে পারছেন না, কেউ এসব জানতে আসে না। তাই বই প্রকাশের পাশাপাশি, প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম পুঁজি আর লোকবল নিয়ে একটা বিরাট কর্মযজ্ঞ সামলানোর পাশাপাশি, এসব খবর সবাইকে জানানোর জন্যও আমাদের এগারো মাস অপেক্ষা করতে হয়। তাও সৌভাগ্য যে এগারো বছর তো অপেক্ষা করতে হচ্ছে না!

প্রথম প্রসঙ্গে আসি। প্রায়ই আহাজারি করা হয়, তা হলো ভুলে ভরা বই প্রকাশ করছেন অনেকে। আর শুধু ভুলে ভরা নয়, ইন্টারনেটের যুগে অন্যের কাজ চুরি করে নিজের কাজ বলে চালিয়ে দেওয়া, যথাযথভাবে তথ্যসূত্র উল্লেখ না করা, ঋণ স্বীকার না করা, ভুল তথ্য সরবরাহ করা—এ সবই খুব সহজ হয়ে গেছে। যেটা সহজ নয় তা হলো—এই ভুলগুলো যত্নের সঙ্গে সংশোধন করা, দায়িত্ব নিয়ে সূত্র উল্লেখ করা, ক্ষেত্রবিশেষে অনুমতি চেয়ে নেওয়া, প্রয়োজনে তার জন্য কিছু সম্মানী দেওয়া, আর শেষমেশ একটা পেশাদার দায়িত্বপূর্ণ গ্রন্থ নির্মাণ করা। এই বিষয়গুলোর দিকে নজর দেওয়া লেখক ও প্রকাশকের যৌথ দায়িত্ব। প্রকৃত সম্পাদনা শুধুমাত্র বানান আর যতিচিহ্ন ঠিক করা নয়—এর পরিধি আরো অনেক বিস্তৃত। এই কাজগুলো করার দক্ষতা, ব্যয় বহনের সংগতি, সদিচ্ছা আমাদের মধ্যে কতজনের রয়েছে? অন্যদিকে ঠিকঠাক সম্পাদনা করার যে ব্যয়, আর সেটি যোগ করলে বইয়ের যে মূল্য দাঁড়ায়, তাতে পাঠকের কাছে আমরা কতটা ন্যায্য অফার নিয়ে পৌঁছাতে পারি?

দ্বিতীয় প্রসঙ্গ বলব, সরকারি বরাদ্দ নিয়ে। বাংলাদেশ সরকারের বই কেনার জন্য বার্ষিক বাজেট থাকে মাত্র দুই কোটি টাকা। কখনো এটা কমে, আবার খানিকটা বাড়েও। আমাদের কাছাকাছি অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভারতের একটি রাজ্যে বই কেনার বাজেট এর দশ গুণেরও বেশি; অন্যান্য অনুদান তো আছেই। শুধু বাজেট বাড়ানোই শেষ কথা নয়; সীমিত বাজেটেই বই বাছাইয়ের পদ্ধতি কতটা সুচিন্তিত, নিরপেক্ষ, সৎ আর স্বার্থ-সংঘাতবর্জিত সে প্রশ্নগুলো অবিলম্বে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তৃতীয় প্রসঙ্গ হলো—বইয়ের জন্য উপযুক্ত কাগজের সংস্থান। বিপুল সম্পাদকীয় পরিশ্রম ও রুচিশীল বিন্যাস, প্রচারের পরিকল্পনা, সব সম্পন্ন করার পর বই যখন ছাপা ও বাঁধাই হয়ে আসে, তখন মাঝে মাঝে মনে হয়, ধরনী দ্বিধা হও! উৎপাদন ব্যয়ের একটা বড় অংশ দখল করে আছে কাগজ, যাতে লুকায়িত কর সংযোজিত আছে ৬১%! জ্ঞান আর সাহিত্যচর্চার ওপর এটা সরাসরি আরোপিত কর। আমরা তাহলে কোথায় যাব!

সুচিন্তিত, সুসম্পাদিত, মননশীল, নির্ভুল বই যথাযথ মূল্যে পাঠকের কাছে হাজির করা, আর লেখকের রয়্যালটি যথাযথভাবে পরিশোধ করা—এই দুটোই শেষ পর্যন্ত হওয়া উচিত একজন দায়িত্বশীল ও পেশাদার প্রকাশকের মূলমন্ত্র। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে কাজ করেও কখনো কখনো বাণিজ্যের স্বার্থকে বড় করে দেখতে গিয়ে লেখক-সরস্বতী আর পাঠক-লক্ষ্মীকে প্রতারিত করছি কি না সে প্রশ্নটা প্রতিদিন মনে রাখলে লক্ষ্যচ্যুত হওয়া কঠিন।

লেখক : পরিচালক, ইউপিএল।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা