kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ১ ডিসেম্বর ২০২০। ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২

লেখকের মেলা

আমাদের সাহিত্যে বইমেলার দারুণ প্রভাব

ইসহাক খান

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



আমাদের সাহিত্যে বইমেলার দারুণ প্রভাব

বইমেলার দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে আমরা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এবং প্রত্যক্ষ সাক্ষী। সেই যে বাবু চিত্তরঞ্জন সাহা পাটি বিছিয়ে বই নিয়ে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বসে পড়লেন—এসবই ঘটেছে আমাদের চোখের সামনে।

সেই সময়টায় বই প্রকাশের এমন চল ছিল না। তখন ছিল একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশের ধুম। পাড়া-মহল্লায় তরুণ সাহিত্যমোদিরা চাঁদা তুলে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করতেন। নবীন লেখকরা সেই ম্যাগাজিনেই নিজের প্রথম লেখাটি প্রকাশ করে লেখায় হাতেখড়ি নিতেন।

ধীরে ধীরে ম্যাগাজিনের চলটা উঠে যেতে থাকে। সেই জায়গা দখল করে বই প্রকাশনা। নবীন লেখকরা বই প্রকাশে ভীষণ আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সেই ধারা এখন আরো তীব্র হয়েছে। প্রতি বছর বাংলা একাডেমির ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ উপলক্ষে প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার নতুন বই প্রকাশ হয়ে থাকে। যদিও এসব বই নিয়ে সমালোচকদের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। বেশির ভাগ বইয়ে সম্পাদনার কাজটি সুচারুভাবে করা হয় না। ভুল বানানে, ভুল বাক্যে বইগুলো পাঠকের হাতে পৌঁছলে স্বাভাবিকভাবে পাঠক বিভ্রান্ত হবেন। এ নিয়ে নানা মহল থেকে কথা উঠছে। তারা সবাই দাবি করেছে প্রকাশকদের সম্পাদনা পর্ষদ থাকতে হবে। সম্পাদনা ছাড়া কোনো বই বইমেলায় ঢুকবে না।

প্রাথমিকভাবে বাংলা একাডেমির বটতলা ঘিরে ১০-১২টি স্টল নিয়ে শুরু হতো বইমেলা। এবং বইমেলা শুরু হতো ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে। চলত ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। আমরা নিজেরাও চেয়ার-টেবিল বিছিয়ে বই বিক্রি করেছি। বন্ধু রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ এবং মোহন রায়হান একই সঙ্গে তাঁরা দুজন তাঁদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন। সেই কাব্যগ্রন্থ দুটি আমরা একাডেমির মাঠে টেবিল-চেয়ার পেতে বিক্রি করেছি।

১৯৮২ সালে প্রথম যখন আমার গল্পগ্রন্থ ‘নগ্ন নাটমন্দির’ প্রকাশিত হয়, তখন মেলা ছিল বটতলাকেন্দ্রিক। স্টলগুলো ছিল ম্যাড়মেড়ে। এত জৌলুস ছিল না। কোনো রকম জোড়াতালি দিয়ে স্টল সাজানো হতো। আজকে যেভাবে মেলায় নান্দনিকভাবে প্যাভিলিয়ন তৈরি করা হচ্ছে, তখন এটা কল্পনাই করা যেত না।

ধীরে ধীরে বইমেলার পরিসর বাড়তে থাকে। একাডেমির ভেতরে পুকুর পার পর্যন্ত মেলা বিস্তৃত হয়। একসময় সেখানেও স্থান সংকুলান না হওয়ায় মেলা স্থানান্তরের কথা ওঠে। অনেক আলোচনা-সমালোচনার পর অবশেষে ২০১৫ সালে মেলা বাংলা একাডেমি থেকে বের হয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্থানান্তরিত হয়। তখন থেকে মেলার স্টলের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নান্দনিক সৌন্দর্য ঝলমলে রূপ ধারণ করে। এবার তো উদ্যানের অর্ধেক জায়গাজুড়ে মেলার আয়োজন। তাতে মেলার সৌন্দর্য এবং নান্দিকতা আরো ব্যাপকভাবে ফুটে উঠেছে। খোলামেলা পরিবেশ। কোনো ধাক্কাধাক্কি নেই। এর আগে মেলায় প্রবেশ নিয়ে অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। এবার সে সুযোগ নেই। সব মিলিয়ে মেলায় এবার ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়েছে। সে ক্ষেত্রে একাডেমি কর্তৃপক্ষ ধন্যবাদ পেতেই পারে।

প্রতিবছর বইমেলায় নতুন নতুন লেখকের আবির্ভাব হচ্ছে। এর মধ্যে কেউ কেউ চমক সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। আবার কেউ কেউ হাল ছেড়ে দিয়ে ক্লান্ত হয়ে অন্য পেশায় ফিরে যাচ্ছে। এটাই স্বাভাবিক। সবাই সফল হবে এমন ভাবা ঠিক নয়। তবে আশা করা যায় এখান থেকেও নতুন লেখক সৃষ্টি হবে। যারা আগামীতে বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদান রাখবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা