kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি

ক্লাবগুলোতে এখনো পুলিশের তালা

খেলাধুলা ফিরে পেতে চায় এলাকাবাসীসহ সবাই

রেজোয়ান বিশ্বাস   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ক্লাবগুলোতে এখনো পুলিশের তালা

সামনে সাইনবোর্ড থাকলেও প্রতিটি ক্লাবের দরজা সিলগালা করা। ঝুলছে পুলিশের লাগানো তালা। দিন-রাত কোলাহল লেগে থাকা ক্লাবঘর আর চত্বর এখন নীরব-নিস্তব্ধ। নেই খেলোয়াড়দেরও তেমন উপস্থিতি। সন্ধ্যার পর এখন আর আসেন না সেই দামি গাড়ি, নামি মানুষ। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে বদলে গেছে মতিঝিলের ক্লাবপাড়ার পুরো দৃশ্যপট।

গত কয়েক দিন সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির কারণে পুলিশি অভিযানের পর  ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব লিমিটেড, ওয়ারী ক্লাবসহ ফকিরেরপুল ইয়ংমেনস, ভিক্টোরিয়া ক্লাব, আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ, আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব, সোনালী অতীত ক্রীড়াচক্র, দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়াচক্র, ধানমণ্ডি ক্লাব, কলাবাগান ক্রীড়াচক্র এখন নীরবতায় ডুবে আছে। একমাত্র ওয়ারী ক্লাব ছাড়া আর সব ক্লাবের ফটকে পুলিশের লাগানো তালা ঝুলছে। মতিঝিল থানার আশপাশের এসব ক্লাবে এর আগে বছরের পর বছর ধরে জুয়া খেলা চলেছে। চলত মদ্যপানও। একসময় রাতের বেলা জুয়ার আসরের সামনে পুলিশের গাড়িও দাঁড়িয়ে থাকত।

ওয়ারী ক্লাবের ফটক খোলা পাওয়া যাওয়ায় ভেতরে ঢুকতেই একজন এগিয়ে এসে পরিচয় জানতে চান। পরিচয় পেয়ে তিনি বলেন, ভেতরে কোনো কর্মকর্তা নেই। এ সময় অন্য একজন এগিয়ে এসে তাঁকে সরিয়ে দিয়ে বলেন, ভেতরে অফিস রুম খোলা আছে। এ সময় অপর একজন এসে বলেন, ভেতরে কর্মকর্তারা আছেন। ভেতরে গিয়ে দেখা গেল দুই কর্মকর্তা বসে আছেন। তাঁদের একজন জাতীয় দলের সাবেক হকি খেলোয়াড় শামসুল আলম আনু। বর্তমানে তিনি ওয়ারী ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক। পরিচয় জেনে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে তিনি বলে ওঠেন, ‘কী আর বলব আপনাকে, ক্লাবগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে। এখন প্রধানমন্ত্রীই পারেন ক্লাবগুলো বাঁচাতে।’

তাঁর সামনে বসা ক্লাবের সিনিয়র সদস্য আব্দুল করিম বলেন, ‘এভাবে আর বেশিদিন চললে খেলাধুলা শেষ হয়ে যাবে। ক্লাবগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। অথচ এখানকার প্রতিটি ক্লাবের রয়েছে গর্বিত ইতিহাস।’ কথা বলার একপর্যায়ে সেখানে আসেন ভিক্টোরিয়া ক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক (ক্রীড়া) এ কে এম নুরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘ওই অভিযানের পর থেকে ভিক্টোরিয়াসহ এ এলাকার বেশির ভাগ ক্লাবে তালা ঝুলছে। এই পরিবেশে খেলাধুলা সম্ভব নয়। অনেক তো হলো। এবার তালা খুলে দিলে খেলাধুলায় মনোযোগ দিতাম আমরা।’ তিনি বলেন, ‘ক্যাসিনো কারবারকে আমরা বরাবরই অপছন্দ  করি। ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনো চলুক, এটা আমরাও চাই না।’ তাঁর কথায় সায় দেন শামসুল আলম আনু ও শেখ আব্দুল করিম।

সেখান থেকে বের হয়ে পাশেই মোহামেডান ক্লাবে গেলে বোর্ডরুমের দরজায় তালা ঝোলানো চোখে পড়ে। তবে পাশেই মোহামেডানের ফুটবল প্র্যাকটিস মাঠ সংলগ্ন অফিস রুমে ঢুকতেই মোহামেডানের সাবেক গোলকিপার কাননকে দেখা যায় একজনের সঙ্গে কথা বলতে। পরিচয় পেয়ে কানন বলে ওঠেন, ‘ক্লাবপাড়া শেষ। মোহামেডানসহ সব ক্লাবের তালা খুলে না দিলে ক্লাবগুলো হারিয়ে যাবে।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মোনালিসা বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ক্লাবগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রমে আমাদের কোনো বাধা নেই। তবে ক্যাসিনো কারবারসহ অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলে কি না তার ওপর আমাদের নজরদারি আছে।’

অন্যান্য ক্লাবের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলে জানা যায়, তাঁরা ক্লাবগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে তালা খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছেন। তাঁরা চান, ক্লাবগুলোর তালা খুলে দিয়ে স্বাভাবিক পরিবেশ আনতে সরকার সুদৃষ্টি দিক। তাঁরা মনে করেন, এভাবে তালাবদ্ধ অবস্থায় থাকলে খেলাধুলা লাটে উঠবে। এক ক্লাব কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের দিকে সরকারকে একটু তাকাতে বলুন। অনেক শিক্ষাই তো হলো। পুলিশ ক্লাবের দরজায় তালা মেরে রেখেছে। কর্তৃপক্ষ আছে দৌড়ের ওপর। আগে যাঁরা নিয়মিত ক্লাবগুলোতে আড্ডা দিতেন, কার্ড ও হাউজি খেলতে আসতেন, ভয়ে তাঁরা এখন আর এমুখো হন না। আর হবেই বা কেন বলুন। এসব বয়স্ক লোক অবসর সময় কাটাতে ক্লাবে এসে যদি অ্যারেস্ট হন, তাহলে এই বয়সে মান-সম্মান থাকে তাঁদের? তাঁরা ক্লাবে এসে হাউজি খেলাটাকে জমিয়ে রাখতেন। এতে ক্লাবেরও কিছু আয় হতো। সেই টাকা খেলোয়াড়দেরও দেওয়া হতো পকেট মানি হিসাবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব ক্লাব পরিচালনার সঙ্গে যাঁরা যুক্ত ছিলেন তাঁদের বেশির ভাগই এখনো গাঢাকা দিয়ে রয়েছে। কেউ কেউ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।

এলাকাবাসী চায় খেলাধুলা হোক ক্লাবগুলোতে : মোহামেডান ক্লাবের সামনে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী কামরুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটির এখন খুবই দৈন্যদশা। এখন সব ক্লাবেই তালা খুলে দিয়ে ফুটবল, ক্রিকেট, হকিসহ অন্যান্য খেলাধুলার পরিবেশ তৈরি করা উচিত। প্রধানমন্ত্রী এদিকে নজর না দিলে ক্লাবপাড়া শেষ হয়ে যাবে। 

ওয়ারী ক্লাবের সামনে বাসিন্দা আরমান সেখ বলেন, ‘ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তবে অনেক দিন হলো, এখন উচিত তালা খুলে দিয়ে ক্লাবগুলোতে মাঠের খেলার পরিবেশ তৈরি করা। সেই সঙ্গে ক্লাবগুলোর আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব নজরদারির মধ্যে রাখাও দরকার।’

ইয়ংমেনস ক্লাবের সামনের খাবারের দোকানি আব্বাস আলী বলেন, অভিযানের পর থেকে ক্লাবে তালা ঝুলছে। এখন তালা খুলে পরিবেশ ঠিক করা উচিত।  দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাবের গেটের সামনে এলাকার বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘ক্লাবগুলোর স্বাভাবিক পরিবেশ থাকলে খেলাধুলা হয়। মনও ভালো থাকে।’

ভিক্টোরিয়া ক্লাবের পাশের দোকানি হাফিজুর রহমান বলেন, ‘ভিক্টোরিয়া ক্লাবে তালা লাগানোর পর এখানে এখন আর মানুষের আনাগোনা নেই। অথচ একসময় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষের আনাগোনায় বেচাকেনা বেশি হতো। এতে পরিবার নিয়ে তিন বেলা ডাল-ভাত খেয়ে ভালোই চলত। এখন খুব কষ্টে আছি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা