kalerkantho

রবিবার । ২২ চৈত্র ১৪২৬। ৫ এপ্রিল ২০২০। ১০ শাবান ১৪৪১

প্রকাশকের মেলা

মেলাকেন্দ্রিক প্রকাশনা থেকে বের হয়ে আসতে হবে

আলমগীর রহমান

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



মেলাকেন্দ্রিক প্রকাশনা থেকে বের হয়ে আসতে হবে

প্রকাশনাটা আমার পৈতৃক ব্যবসা। স্বাধীনতার অনেক আগে থেকেই প্রকাশনায় যুক্ত ছিলেন বাবা। পাকিস্তান আমলে সেটি ‘পাকিস্তান বুক করপোরেশন’ নামে পরিচিত ছিল। স্বাধীনতার পর বাবার হাত ধরেই সেটি হয়ে যায় ‘বাংলাদেশ বুক করপোরেশন’। সে যা-ই হোক, আমি মূলত লেখক ও সাংবাদিক হতে চেয়েছিলাম। এ উদ্দেশ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে অনার্স-মাস্টার্স করে প্রবেশ করি সাংবাদিকতাজগতে। ফজলুল হক মনি সম্পাদিত বাংলার বাণীতে যোগ দিয়েছিলাম। পরে ওই গ্রুপেরই সাপ্তাহিক সিনেমা পত্রিকায় কাজ করতাম। তখন আমার ধ্যান-জ্ঞান সাহিত্য ও সাংবাদিকতা। একপর্যায়ে যুক্ত হই শাহাদৎ চৌধুরী সম্পাদিত সাপ্তাহিক বিচিত্রায়। মূলত বিচিত্রায় কাজ করতে গিয়ে লেখক ও সাংবাদিক থেকে কাকতালীয়ভাবে হয়ে গেলাম প্রকাশক।

আশির দশকে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় কাজ করতে গিয়ে রফিকুন নবী, মুনতাসীর মামুন, হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলনের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ভালোই যাচ্ছিল দিন। ১৯৮৪ সালে পত্রিকায় ধর্মঘট শুরু হয়। ২০ থেকে ২৫ দিন সব পত্রিকা ছাপা বন্ধ। ওই ধর্মঘটের মধ্যে রফিকুন নবী, মুনতাসীর মামুন, ইমদাদুল হক মিলন ও আমি আড্ডা দিচ্ছিলাম বিচিত্রা অফিসে। উঠল প্রকাশনার কথা। তখন সেবা প্রকাশনী থেকে অনুবাদ বইয়ের পেপারব্যাক বের হতো। বেশ জনপ্রিয় সেসব বই। আমাকে মুনতাসীর মামুন বললেন, ‘চাইলে তুমিও পেপারব্যাক বই দিয়ে প্রকাশনায় নামতে পারো।’ তখন ভাবলাম, সেবা অনুবাদ বই বের করে, আমি সৃজনশীল বই দিয়ে শুরু করতে পারি। আড্ডাতেই কাকে দিয়ে লেখানো যায় তা-ও ঠিক করে ফেললাম আমরা। উপস্থিত সবাই হুমায়ূন আহমেদের নাম প্রস্তাব করেন। শেষে এ সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়। পাশাপাশি এও চূড়ান্ত করি, প্রকাশনীর নাম হবে অবসর।

প্রকাশনা নিয়ে আলোচনা করতে একদিন আমরা বসি মুনতাসীর মামুনের বাসায়। তখন মুনতাসীর মামুন থাকতেন মগবাজারের ইস্পাহানি কলোনিতে। বিকালবেলা সেই বাসায় উপস্থিত হই বিচিত্রা সম্পাদক শাহাদৎ চৌধুরী, হুমায়ূন আহমেদ, শাহরিয়ার কবির, ইমদাদুল হক মিলন ও আমি। সেখানেই সিদ্ধান্ত হলো অবসর থেকে বের হবে হুমায়ূন আহমেদের বই। তাঁকে দুই হাজার টাকা অ্যাডভান্স দেওয়া হয়। এর কয়েক দিনের মধ্যেই হুমায়ূন আহমেদ লিখে ফেললেন অতিপ্রাকৃত বিষয় নিয়ে আশ্চর্য এক উপন্যাস ‘দেবী’। এই উপন্যাসের মধ্য দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের কলমের ডগা থেকে বাংলা সাহিত্যে অবতীর্ণ হলো এক অবিস্মরণীয় চরিত্র—মিসির আলি। ‘দেবী’ দিয়ে শুরু হলো প্রকাশনা সংস্থা ‘অবসর’।

‘দেবী’ প্রকাশিত হয় বৈশাখ ১৩৯২, এপ্রিল ১৯৮৫। ক্রাউন সাইজের পেপারব্যাকের দাম ১৩ টাকা, হার্ড বাইন্ডিং ২৩ টাকা। প্রচ্ছদ আঁকলেন বিচিত্রা সম্পাদক শাহাদৎ চৌধুরী। প্রকাশের পরই বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। মিসির আলি নিয়ে দ্বিতীয় বই ছিল ‘নিশিথিনী’। এ বইটিও প্রকাশ করি আমরা।

প্রকাশনাজগৎ নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা আমার। এ অভিজ্ঞতা থেকে বলব, মেলাকেন্দ্রিক প্রকাশনা থেকে বের হয়ে আসতে হবে আমাদের। আমরা যখন প্রকাশনা শুরু করি তখন সারা বছরই বই প্রকাশিত হতো। পাঠকও সারা বছর বই কিনত। এখন তা ফেব্রুয়ারিকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। সারা বছর যদি বই প্রকাশিত না হয়, সারা বছর যদি পাঠকের কাছে বই পৌঁছানো না যায়, তাহলে প্রকাশনাজগৎ গভীর সংকটে পড়বে। তাই সারা বছর বই প্রকাশ ও বইয়ের বিপণনের দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। পাঠক সৃষ্টির জন্য কাজ করতে হবে।

লেখক : প্রকাশক, অবসর।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা