kalerkantho

রবিবার । ২২ চৈত্র ১৪২৬। ৫ এপ্রিল ২০২০। ১০ শাবান ১৪৪১

লেখকের মেলা

মানের দিকে খেয়াল দেওয়ার সময় এখন

প্রশান্ত মৃধা

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মানের দিকে খেয়াল দেওয়ার সময় এখন

একুশে বইমেলা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আসার পর থেকে ধীরে ধীরে দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠছে। বাংলা একাডেমির মূল প্রাঙ্গণে সে সুযোগ ছিল না। গত বছর ছয়েকের ধারাবাহিকতায় এবার বইমেলা সবচেয়ে গোছানো। কেউ কেউ বলছেন আন্তর্জাতিক মানের। প্রশ্ন হচ্ছে, আন্তর্জাতিক মানটা কেমন? কোনো নির্দিষ্ট মান নিশ্চিত নেই। আর সেটি যখন নেই তখন বরং ভাবা উচিত বইমেলার বিন্যাস আমাদের ঐতিহ্যগত নান্দনিকবোধসম্পন্ন হলে সেটিই মানসম্পন্ন। তা হচ্ছে। ধীরে ধীরে এই মেলার পরিসর, বিন্যাস আর ব্যবস্থাপনা এমন হয়ে উঠছে যে যাকে বলে সুচারু সুন্দর, সেদিকে এগোচ্ছে বইমেলা।

আগের কোনো কোনো বছর এই কলামে কেউ কেউ এ বিষয়টি নিয়ে বেশ কথা তুলেছেন। বলেছেন, মেলার পরিসরে দৃষ্টির সুখসহ অনায়াসে যাতে মানুষ চলাচল করতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। একই সঙ্গে এই উদ্যানের যে গাছ ও স্থাপনা, তা-ও এর ভেতরে থাকবে; কিন্তু কোনোটি কোনোটির সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ হবে না। সেদিকটি যখন অর্জিত হয়েছে ও হচ্ছে তখন আশা করা যায়, ভবিষ্যতে এ বিষয়গুলো আরো যথাযথ হবে। তাই খেয়াল রাখার সময় এসেছে বইমেলা সত্যিকার অর্থে লেখক, পাঠক ও প্রকাশকের মেলা হয়ে উঠছে কি না?

পরিসর তো কাঠামোগত দিক। মেলার নান্দনিকতার দিকও। কিন্তু যে বইকে নিয়ে এই মেলা, সেই বইয়ের কতটা উন্নতি হলো অর্থাৎ ভাষার সৃষ্টিশীল জায়গায় সারা বছর আমাদের কী ফসল ফলল, সেদিকে খেয়াল রাখাও একই সঙ্গে জরুরি ছিল, আমরা রাখিনি। সেটি বাংলা একাডেমির একার কাজ নয়। প্রকাশকেরও একার কাজ নয়। যদিও কাজটি প্রকাশকের তরফ থেকেই পহেলা হতে পারত; কিন্তু হচ্ছে না। হবে বলে মনে হয় না। হলে এত দিনে হতো। মেলাজুড়ে যেমন মৌসুমি প্রকাশকের ভিড়, একই ভিড় মৌসুমি লেখকেরও। লিখতে আর লেখক হতে দুনিয়ার কোথাও তো কোনো  মৌসুম লাগে না, আমাদের এখানে লাগে—ফেব্রুয়ারি এখন সেই মৌসুম! শীতের দীর্ঘ রাতে রচিত হয়েছে যে বাণী, তা এই রোদনভরা বসন্তে হয়ে উঠেছে গান! শুধু গান নয়, মৌসুমি লেখককুলের গণসংগীত। তাঁদের এমন মাঘী-বসন্তের আগেও খোঁজ নেই, পরেও না। এ বড় বিচিত্র ঋতুভিত্তিক কলকাকলি! ফলে আট লাখ বর্গফুট চত্বরজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ছে সম্পাদনাহীন বইয়ের সমাহার। এত সম্পাদনাহীন বই কী করে বেরোয়? প্রকাশকদের সমিতি কী বলে? প্রতিবছর বাংলা একাডেমি বইমেলার শেষে প্রকাশিত মোট বইয়ের তালিকা প্রকাশ করার পাশাপাশি মানসম্পন্ন বইয়েরও সংখ্যা প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, মোট প্রকাশিত বইয়ের ১০ শতাংশই মাত্র মানসম্পন্ন। এটি দুঃখজনক।

বইয়ের ভেতরের মানে তারতম্য থাকবেই। লেখকে লেখকে সে তফাত হতে বাধ্য। তবে বইটির প্রচ্ছদের চটক দেখে হাতে নেওয়া যাবে; কিন্তু পড়া যাবে না—এ শুধু দুঃখজনকই নয়, অমার্জনীয় অপরাধ। এমনকি বাংলা ভাষার প্রধানতম লেখকদের বইও ভুল বানান ও বাক্যে প্রকাশিত হয়। লেখক ও বইয়ের নামও সেখানে ভুল থাকে। যে পাঠকের জানা নেই তিনি ওই বইটি কিনে নেন এবং ভুল বই পড়েন। সেই প্রকাশকদের বিবেচনা হলো মৌসুমি লেখকদের কাছ থেকে তো টাকা-পয়সা তবু পাওয়া গেছে, ও ব্যাটা রবীন্দ্রনাথ [পড়ুন, ‘রবী’ ঠাকুর ও ‘গীতাঞ্জলী’], নজরুল [পড়ুন, ‘কাজি’ নজরুল], জীবনানন্দ [পড়ুন, জীবনানন্দ ‘দাস’], বিভূতিভূষণ [পড়ুন, ‘বিভুতি’ভূষণ ‘বন্দোপাধ্যায়’], মানিক [পড়ুন, মানিক ‘বন্দোপাধ্যায়’] তো আর আমায় টাকা দেবেন না, তাই তাঁদের বই ছাপিয়ে যেকোনোভাবে পকেটে পয়সা এলেই হলো। শুনেছি, বাংলা একাডেমি প্রকাশকদের ক্ষেত্রে শাস্তির ব্যবস্থা রাখে, এমন বই প্রকাশ, প্রদর্শন ও বিক্রির জন্য কোনো প্রকাশক শাস্তি পেয়েছেন—এমন কথা শুনিনি। আশা করি, সেটি সামনে হবে। তা না হলে বইমেলার এমন নান্দনিকতা উপরচালাকি হয়ে পড়বে। যে বই নিয়ে এই মেলা, সেই বইয়ের সার্বিক উন্নতিই একটি ভাষার অগ্রগতি। সেখানে একটি জাতির মননের প্রকাশ।

এবারের বইমেলায় আমার ‘গোলকধাঁধায় ঘোরাফেরা’ নামে একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে নাগরী প্রকাশনী থেকে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা