kalerkantho

সোমবার । ২২ আষাঢ় ১৪২৭। ৬ জুলাই ২০২০। ১৪ জিলকদ  ১৪৪১

প্রাণের মেলা

কবিতার পালে হাওয়া

আজিজুল পারভেজ   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কবিতার পালে হাওয়া

কবিতার বিপুলসংখ্যক বই প্রকাশিত হয়েছে অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। নবীন-প্রবীণ প্রায় সব কবিরই বই এসেছে এবার। কোনো কোনো কবিতার বই বিক্রিও হচ্ছে বেশ। একাধিক মুদ্রণ ফুরিয়ে যাওয়ার খবরও প্রচারিত হয়েছে।

বরাবরের মতো এবারও মেলায় কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে সর্বাধিক। মেলার প্রথম ১৯ দিনে মোট নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে দুই হাজার ৭৩৮টি। এর মধ্যে কবিতার বই ৯৯৮টি।

কবিতার বইয়ের আধিক্যের একটা ব্যাখ্যা পাওয়া গেল বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কাছ থেকে। তাঁর মতে, তরুণরা বরাবরই কবিতার প্রতি আকৃষ্ট হয়। আর এখন বই প্রকাশ করা অনেক সহজ। চাইলে নিজের টাকায় একটা বই অনায়াসে বের করা যায়। তা ছাড়া প্রচারের মোহ তো আছেই। মেলায় বই করলে প্রচার পাওয়া যায়। এসব কারণে কবিতার বই বেশি প্রকাশিত হয়।

এর মধ্যেও এবার কবিতার বই নিয়ে কথা হচ্ছে নানামাত্রিক। কবিতার বই কেনার জন্য তরুণদের লাইন পড়েছে—এ দৃশ্য অনেক বছর পর দেখা গেল মেলায়। কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর মতে, এবার কবিতার বইয়ের অবস্থা অন্যান্য বছরের চেয়ে ভালো। পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে। কবিদের নতুন বইয়ের পাশাপাশি অনেক কবির কবিতার সংকলনও প্রকাশিত হয়েছে নানা অভিধায়।

প্রয়াত কবি সৈয়দ শামসুল হকের দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবারের মেলায়। ‘নুন পূর্ণিমা’ বেঙ্গল পাবলিকেশনস আর ‘আমার শহর’ প্রকাশ করেছে প্রথমা।

প্রয়াত আরেক কবি শহীদ কাদরীর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ প্রকাশ করেছে চারুলিপি। আরেক প্রয়াত কবি আল মাহমুদের মহাকাব্য ‘এ গল্পের শেষ নেই শুরুও ছিল না’ প্রকাশ করেছে সরলরেখা।

মহাদেব সাহার কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ এসেছে মেলায়। ‘এত যে সুখের নৃত্য, এত যে দুঃখের অশ্রু’ এনেছে প্রথমা; ‘মাটির মাধুর্য’ এনেছে মাওলা; ‘চোখ বুঝে পাহাড় দেখেছি’ এনেছে অনন্যা।

কবি নির্মলেন্দু গুণের নতুন কবিতার বই ‘চুমুর দুপুর’ প্রকাশ করার কথা প্রথমার। নির্মলেন্দু গুণের অনূদিত পৃথিবীর নানা ভাষার কবিদের কবিতার ‘অনুবাদিত কবিতাসমূহ’ প্রকাশ করেছে বাতিঘর।

হাবীবুল্লাহ সিরাজীর নতুন বইয়ের পাশাপাশি কয়েকটি সংকলন বেরিয়েছে এবার। নতুন কবিতার বই ‘জমিনে ফারাক নেই’ এনেছে প্রথমা। ‘প্রেম ও প্রকৃতির কবিতা’ এনেছে বাংলাপ্রকাশ, ‘কবিতাসমগ্র-২’ প্রকাশ করেছে অনন্যা।

প্রথমা মেলায় প্রকাশ করেছে বেশ কয়েকটি কবিতার বই। এর মধ্যে রয়েছে—মোহাম্মদ রফিকের ‘পিরিতে বসাবো বসত’, ওমর কায়সারের ‘আমিহীন আমার ছায়াগুলো’, তারিক সুজাতের ‘ও প্রাণ ও বর্ণমালা’, কামরুজ্জামান কামুর ‘আমাকে এবার পিছমোড়া করো’, টোকন ঠাকুরের ‘বুদবুদ পর্যায়ের কবিতা’ ইত্যাদি।

৩৪ বছর পর হেলাল হাফিজের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ প্রকাশিত হয়েছিল। বইটি ভালোই চলছে মেলায়। প্রকাশ করেছে দিব্যপ্রকাশ।

আনিসুল হকের ‘কবিতাসমগ্র’ প্রকাশ করেছে অনন্যা।

কবি কামাল চৌধুরীর নতুন কাব্যগ্রন্থ ‘টুঙ্গিপাড়ার গ্রাম থেকে’ অন্যপ্রকাশ এবং ‘১০০ প্রেমের কবিতা’ ভাষাচিত্র মেলায় এনেছে।

ফরিদ কবিরের প্রেমের কবিতা এবং কবিতার সঙ্গে চিত্রশিল্পীদের চিত্রকর্মসংবলিত গ্রন্থ ‘প্রেমমন্ত্র’ প্রকাশ করেছে পাঞ্জেরী। শিহাব সরকারের প্রয়াত কন্যাকে নিয়ে লেখা ও তাকে উৎসর্গ করা কবিতার বই ‘আমার পূর্বা তারা’ প্রকাশ করেছে চিত্রা প্রকাশনী। নূহ-উল-আলম লেনিনের ‘পোড়া মাঠে চৈত্রের ফসল’, আসাদ মান্নানের ‘শত কবিতায় বঙ্গবন্ধু’ প্রকাশ করেছে সময় প্রকাশন।

মারুফ রায়হানের নির্বাচিত কবিতা প্রকাশ করেছে ধ্রুবপদ। সময় থেকে এসেছে আমিনুর রহমান সুলতানের ‘সাতই মার্চের তর্জন’।

আবু হাসান শাহরিয়ারের ‘নোনা ব্যঞ্জনার শিলালিপি’, রহমান হেনরীর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ প্রকাশ করেছে ভাষাচিত্র।

বাতিঘর মেলায় প্রকাশ করেছে বেশ কয়েকজন কবির কাব্যগ্রন্থ। ময়ূখ চৌধুরীর ‘চরণেরা হেঁটে যাচ্ছে মুণ্ডুহীন’, জুয়েল মাজহারের ‘রাত্রি ও বাঘিনী’, আলফ্রেড খোকনের ‘কবিতা সমগ্র’, মোস্তাক আহমদ দীনের ‘স্ফটিকচূড়ার নিচে’ ও সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের ‘ছুরিতে ঠিকরানো আধিয়ার’।

অন্যপ্রকাশ মেলায় এনেছে ঔপন্যাসিক নাসরীন জাহানের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘মদের গেলাসে নাচে বরফের ওম’, শিহাব শাহরিয়ারের ‘অদৃশ্যগুচ্ছ’, নওশাদ জামিলের ‘প্রার্থনার মতো একা’, মারুফুল ইসলামের ‘আজ বরং একটা গল্প বলি’। এ ছাড়া সংকলন গ্রন্থের মধ্যে আশরাফ আহমদের ‘নির্বাচিত কবিতা’, মিনার মনসুরের ‘নির্বাচিত ১০০ কবিতা’, রাজু আলীমের ‘১০০ প্রেম’ প্রভৃতি প্রকাশ করেছে অন্যপ্রকাশ।

এগারো কবির কবিতা সিরিজ প্রকাশ করেছে অভিযান। প্রতিটি বই এক ফর্মার। এই কবিদের মধ্যে আছেন সরকার আমিন, শাহনাজ মুন্নী, শামীম রেজা, শাহেদ কায়েস, মুজিব ইরম, কবির হুমায়ূন, ওবায়েদ আকাশ, স্নিগ্ধা বাউল, মনিরুজ্জামান পিন্টু, খোকন মাহমুদ ও নেহাল আহমেদ।

পিয়াস মজিদের তিনটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবারের মেলায়। ‘বসন্ত, কোকিলের কর্তব্য’ প্রথমা প্রকাশন, ‘গোলাপের নহবত’ পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স, ‘দুপুরের মতো দীর্ঘ কবিতা’ পাঠক সমাবেশ।

কবি-সাংবাদিক ফখরে আলমের কাব্যগ্রন্থ ‘অন্ধকার চূর্ণ করি’ প্রকাশ করেছে বিদ্যাপ্রকাশ।

ঐতিহ্য প্রকাশ করেছে শাহেদ কায়েসের ‘নির্বাচিত কবিতা’ ও মিজান মালিকের কাব্যগ্রন্থ ‘গল্প ছাড়া মলাট’। উড়কি এনেছে সুমন রহমানের ‘নির্বাচিত কবিতা’।

প্রকাশনা সংস্থা বায়ান্ন থেকে এসেছে মারজুক রাসেলের কাব্যগ্রন্থ ‘শরীর বণ্টনবিষয়ক চুক্তিনামা স্বাক্ষর’।

মেলায় প্রকাশিত কবিতার বইয়ের মধ্য থেকে নির্বাচিত চারটি বইয়ের তথ্য তুলে ধরা হলো।

এ গল্পের শেষ নেই শুরুও ছিল না : মহাকাব্যের দাবি নিয়ে আল মাহমুদের মৃত্যুর এক বছর পর প্রকাশিত হলো এই কাব্যগ্রন্থটি। বইয়ে নিজেই এ সম্পর্কে কৈফিয়ত দিয়েছেন কবি। লিখেছেন, ‘আমাদের ভাষায় মহাকাব্য লেখার প্রয়াস কেউ বহুকাল যাবৎ করেনি। বলা হয়ে থাকে, মহাকাব্য রচনার যুগ এখন আর নেই। এ কথাটি আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। যখন প্রায় একশ বছরের মধ্যে এই কাজে কেউ মনোযোগ দেয়নি, বুঝতে হবে যে কাজটি দুঃসাধ্য বলেই সবাই ভেবে নিয়ে সরে থেকেছে।’ এটি প্রকাশ করেছে সরলরেখা। রয়েল সাইজের ৮০ পৃষ্ঠার বইটির মূল্য ৩১৫ টাকা।

নুন-পূর্ণিমা : কবি সৈয়দ শাসসুল হকের তৃতীয় প্রয়াণবার্ষিকীতে প্রকাশিত হয়েছে এ কাব্যগ্রন্থ। মৃত্যুর আগে রচিত এ কাব্যগ্রন্থে এই বহুগুণান্বিত কবি দীর্ঘ এক কবিতায় প্রবহমান জীবন ও নারীর প্রতি ভালোবাসার ছবি অঙ্কন করেছেন। এটি প্রকাশ করেছে বেঙ্গল পাবলিকেশন্্স। মূল্য ২৪৫ টাকা।

অনুবাদিত কবিতাসমূহ : কবি নির্মলেন্দু গুণ অনূদিত কবিতার সংকলন। কবি বিভিন্ন সময়ে প্রাচীন সংস্কৃত ভাষা থেকে শুরু করে জাপানি হাইকু ভাষাসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার কবিতা অনুবাদ করেছেন। সেগুলোকেই মলাটবন্দি করা হয়েছে এই সংকলনে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তাঁকে নিয়ে লেখা প্রথম কবিতাটিও স্থান পেয়েছে এই গ্রন্থে। এটি প্রকাশ করেছে বাতিঘর। মূল্য ২৫০ টাকা।

জমিনে ফারাক নেই : কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী কবিতায় নতুন নিরীক্ষা করেছেন ‘জমিনে ফারাক নেই’ গ্রন্থে। ব্যক্তি ও সমষ্টি এখানে অভেদ। সমাজ ও দেশগত অনুভব আড়াল করে না বৈশ্বিক উপলব্ধি। বইটি প্রকাশ করেছে প্রথমা। মূল্য ১৮০ টাকা।

গতকালের মেলা : গতকাল বৃহস্পতিবার অমর একুশে গ্রন্থমেলার ১৯তম দিনে গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আবুল কাসেম রচিত ‘বঙ্গবন্ধু ও চা শিল্প’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দীপংকর মোহান্ত। আলোচনায় অংশ নেন মেসবাহ কামাল ও মোকারম হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ।

আজ মেলা সকাল থেকে : আজ শুক্রবার একুশে ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। মেলার দ্বার খুলবে সকাল ৮টায়। তবে এরও আগে সকাল ৭টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর। সভাপতিত্ব করবেন কবি রুবী রহমান।

 

মন্তব্য