kalerkantho

শনিবার । ২১ চৈত্র ১৪২৬। ৪ এপ্রিল ২০২০। ৯ শাবান ১৪৪১

লেখকের মেলা

বইমেলা আমার বাঁচার শ্বাস-প্রশ্বাস

জাহিদ হায়দার

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বইমেলা আমার বাঁচার শ্বাস-প্রশ্বাস

কিছু শ্রম মানুষের চিন্তার সভ্যতাকে চিরায়ত রূপ দেয়। ফল, বই। দেখা গেছে, যে জাতি বই যত অধ্যয়ন করে, সেই জাতির শিক্ষারুচি, জীবনকে দেখার বোধ আভিজাত্যের আলোয় দৃশ্যমান। এবং অর্জিত জ্ঞান প্রজ্ঞায় রূপান্তরিত হয় মান্য প্রয়োজনের খাতিরে।

এই বদ্বীপ অঞ্চলের কিছু মানুষ প্রকৃতির সুবিধাবিলাসে আহ্লাদিত হয়ে দিনযাপন করার সময় শুধু শস্য উত্পাদনে আর মাছ ধরার আনন্দে সময় ব্যয় করেনি। নালন্দা ও শীলভদ্রর স্বর আমরা পেয়েছি। আমাদের বটেশ্বরী বলছে, আমাদের জ্যামিতিবোধ ছিল সুদৃঢ়। যে জনগোষ্ঠীর জ্যামিতি-জ্ঞান পরিষ্কার, তার পরিমিতির সীমা রুচিঋদ্ধ।

সময়ের গতিসত্তা বদলে দেয় কথার ধরন, চলার পদক্ষেপ, যুগসন্ধির বিবিধ পর্ব। এক ‘চতুর প্রযুক্তি’র ঘূর্ণিমণ্ডলে অর্থাৎ মোবাইলে শত শত ক্রিয়া ও প্রতিপ্রক্রিয়া ইতি ও নেতির যুদ্ধে জায়মান। তথ্যই শক্তি, তার প্রচার মহাশক্তিতে প্রলোভন ছড়ায় প্রতিদিনের জীবনচর্চায়।

একজন তরুণ লেখক আমাকে বলছেন, ‘আপনার ফেসবুক নেই?’ আমার উত্তর শোনার আগেই তার প্রগলভতা তাকে আরো কথা বলায় : ‘জাহিদ ভাই, আপনি এ-যুগের না।’ বললাম, ‘আমি গত শতাব্দীর।’ তরুণ সিদ্ধান্তবাচক কথা বলল : ‘আপনার এই নতুন কবিতার বিক্রি হবে না। ফেসবুকে আমি প্রতিদিন প্রচার করছি, আমার বই প্রচুর বিক্রি হচ্ছে।’ আমার মুখের ‘ও’ উচ্চারণে একটি শীতল উন্নাসিকতা ছিল বোধহয়। মনে হলো : প্রচারে বাণিজ্যলক্ষ্মী। তাকে সুখী করার জন্য বললাম, “আমার নতুন কবিতার বই ‘প্রেমকে যখন বানিয়ে ফেলেছি খুনি’র প্রকাশক পাঠক সমাবেশ জানে কিভাবে বিপণন করতে হয়। ভালো বিক্রি হবে।” তরুণ দৃঢ়তার স্বরে বলে, ‘আপনার একটা দায়িত্ব আছে না?’ বলি, ‘এই দেশে লেখককে কেবল লিখলেই চলবে না, নিজের বই বিক্রি করার জন্য হাট খুলতে হবে।’

আর একজন প্রকাশক আমাকে বললেন, ‘বইক্রেতাদের কিছু প্রবণতা লক্ষ করছি। আর তা হলো, লেখক যদি প্রকাশকের স্টলে বসেন, সেই লেখক অখ্যাত বা বিখ্যাত হোক, তাঁর বই পাঠক কেনেন। কারণ হচ্ছে, অনেক পাঠক মনে করেন, লেখকের স্বাক্ষর বইতে থাকলে বাড়িতে, বন্ধুদের বলা যায়, ‘লেখকের সঙ্গে পরিচয় হলো।’

‘আমার নাম তো জানে গাঁয়ের পাঁচজনে’ (দুজন পড়শি, দুজন মাছওয়ালা ও একজন কলাবিক্রেতা) ভেবে আমার প্রকাশক জয়তির স্টলে বসলাম এবং সত্যি দুই কপি ‘প্রেম ও মৃত্যুর কথন’ বিক্রি হলো। ক্রেতাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমার নাম জানেন, লেখা পড়েছেন কখনো?’ সৎ উত্তর দিলেন : ‘না।’ ‘বই কিনলেন যে?’ উত্তরে জানলাম, স্টলের একজনের কাছ থেকে জেনেছেন আমি লেখক কি না। জানার পর বই কিনে স্বাক্ষর নিলেন। বললাম, ‘বইটি নিজের নাকি অন্যের জন্য কিনলেন?’ তরুণ বইটি তার প্রেমিকাকে দেবে। আমি বললাম, ‘এই বই পড়লে প্রেম থাকবে না।’ রসিক তরুণ, ‘কী আর করা।’ উত্তরে হতাশা ছিল না।

আমার যতদূর মনে পড়ে, ভুল হলে ইতিহাস ঘেঁটে শুধরে দেবেন, বাংলা একাডেমির বইমেলায় ইমদাদুল হক মিলনই প্রথম প্রকাশকের স্টলে লেখকের সত্তা আনন্দ ও শঙ্কা নিয়ে বসে বইয়ে ক্রেতার চাওয়ার শীলিত প্রসন্নতাকে স্বাক্ষর দেওয়া শুরু করে। বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, আমরা মিলনের অনেক বন্ধুরাই কাজটাকে গ্রাম্য চোখে দেখেছি এবং পরশ্রীকাতরতার ব্যর্থ জিহ্বায় নিন্দাও করেছি। পরে আমাদের সাহিত্যের দুই হুমায়ুন, আজাদ ও আহমেদ ঘটা করে প্রতিধ্বনি তুলে বসা শুরু করলেন মেলার স্টলে। পাঠকরা বই কেনেন এবং লীলাস্মিত চোখে লেখকের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘আমার নাম শারমিন।’ ‘আমার নাম শাকিল’। লেখক পাঠকের নাম লেখেন কখনো লাল কালিতে, কখনো সিগনেচার পেনের মেরুন কালিতে। সে এক গ্রাহ্য উৎসব।

এখন শুধু লেখকের স্বাক্ষর নিয়ে বইক্রেতা আহ্লাদিত নন। মৃদু আবদারে বলেন, ‘বইসহ আপনার সঙ্গে একটি সেলফি নিতে চাই।’ লেখক হেসে দাঁড়ান। রাতে বাড়ি ফেরার পর বউয়ের মুখ ভেজা ভেজা, ভার ভার দেখতে পারেন। বউ শব্দ করে টেবিলে ভাতের থালা রাখে, তোর বাপকে খেতে ডাক, এখনো মেজাজ খারাপের কারণ জিজ্ঞেস করে না কেন? ‘কী হয়েছে?’ লেখকের প্রশ্নে ‘বাড়িতে তো হাসো না, কবির ভাব নিয়ে থাকো, সুন্দরী মেয়েটার পাশ ঘেঁষে তো সেলফি তুললা, কী হাসি? মিনা ভাবী আমারে বলল, শক্ত হ, কবিরা, লেখকরা শয়তান।’ নিশ্চয়ই ওই তরুণী মিনা ভাবির ফেসবুক ফ্রেন্ড। 

এবারের মেলার আয়োজন অনেক পরিকল্পিত। পরিসরের ব্যবস্থাপনা ভালো। ভবিষ্যতে আরো সুন্দর হবে; যদিও সুন্দরের শেষ নেই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা