kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ চৈত্র ১৪২৬। ৭ এপ্রিল ২০২০। ১২ শাবান ১৪৪১

এখনো লোকালয়ে ভয়ংকর রাসায়নিক গুদাম

► অর্থাভাবে কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ভূমি অধিগ্রহণই শেষ হয়নি ► প্রায় প্রতি বাড়িতে চলছে রাসায়নিকের কারবার

রেজোয়ান বিশ্বাস ও শাখাওয়াত হোসাইন   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এখনো লোকালয়ে ভয়ংকর রাসায়নিক গুদাম

‘আগুনে একমাত্র ছেলেটাকে হারিয়েছি। সেই থেকে প্রতিটি দিন ওয়াহিদ ম্যানশনের সামনে এসে বসে থাকি। এক বছরেও মনকে বুঝ দিতে পারিনি। আমার মতো কত মা-বাবার বুক খালি হয়েছে। কিন্তু তার পরও তো এই এলাকা রাসায়নিকমুক্ত হয়নি। খোঁজ নিলে জানবেন, পুরান ঢাকা এখনো রাসায়নিক গুদামে সয়লাব।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন ষাটোর্ধ্ব নাসির উদ্দিন। গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ আগুন কেড়ে নিয়েছে তাঁর একমাত্র ছেলে অসিউদ্দিন মাহিদকে। সন্তানহারা এই বাবার মতো গত মঙ্গলবার দুপুরে ওয়াহিদ ম্যানশনের সামনে হাজির হয়েছিল আরো অনেক স্বজনহারা পরিবার। তাদের একজন ৭০ বছর বয়সী শাহেদ উল্লাহ বলেন, ‘ওয়াহিদ ম্যানশনের রাসায়নিকের আগুনে পুড়ে আমার দুই ছেলে রাজু ও রানা মারা গেছে। আর কোনো মা-বাবার বুক এভাবে খালি না হোক—সে জন্যই এখানে এসেছি। পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরানোর দাবি জানাচ্ছি।’ চুরিহাট্টার পাশের মোঘলটুলি, চাঁদনিঘাট, পাটুয়াটুলীসহ আশপাশের বাসিন্দাদেরও একই দাবি।

পুরান ঢাকার নিমতলীতে ২০১০ সালে অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জনের প্রাণহানি ঘটে। এরপর এই এলাকা থেকে রাসায়নিকের গুদামগুলো সরানোর পরিকল্পনা করে সরকার। কিন্তু ওই পর্যন্তই। এরপর গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি চুড়িহাট্টায় আরেক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান ৭১ জন। রাসায়নিকের গুদামগুলো সরাতে আবারও শুরু হয় তোড়জোড়। বাস্তবতা হলো, কোনো পরিবর্তন নেই। পুরান ঢাকা থেকে সরেনি রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা।

ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডের পর বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন পৃথকভাবে তদন্ত করে নানা সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন দেয়। প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই পুরান ঢাকায় আগুনের ঝুঁকি মোকাবেলায় রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা সরিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করে। কিন্তু ঘটনার এক বছরেও সুপারিশ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি সরকারি কোনো সংস্থা।

রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম সরিয়ে নিতে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে নির্মিতব্য কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ভূমি অধিগ্রহণের কাজই এখনো শেষ হয়নি। এমনকি পুরান ঢাকার দাহ্য রাসায়নিক ব্যবসায়ীরা ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন নাকি কারখানা ও গুদাম অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন সে ব্যাপারেও সঠিক কোনো তথ্য নেই সরকারি কোনো সংস্থার কাছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, আগের মতোই প্রতিটি বাড়ির নিচে প্লাস্টিকের দোকান ও কারখানা বহাল রয়েছে। অনেক দোকানেই রাসায়নিক বিক্রি হওয়ার তথ্য জানায় এলাকাবাসী। ৬১ নম্বর চাঁদনিঘাট কেবি রুদ্র রোড লাগোয়া জিকে প্লাস্টিক কারখানায় কাজ করছিলেন শাহেদ ও শিহাব নামের দুই শ্রমিক। কারখানাটির মালিক জসিম উদ্দিন। খোঁজ করে তাঁকে পাওয়া যায়নি। কারখানার ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম জানালেন, এখানে প্লাস্টিক দানা থেকে বিভিন্ন ধরনের খেলনা তৈরি হয়। এতে কোনো রাসায়নিকের ব্যবহার হয় না। পাশেই এমএম এন্টারপ্রাইজ নামের অপর একটি কারখানায় ঢুকেও একই চিত্র দেখা যায়। তারাও একই ধরনের দাবি করে। তবে আশপাশের কয়েকজন দোকানি বলেন, রাসায়নিক ছাড়া কারখানায় প্লাস্টিক সরঞ্জাম তৈরি করা অসম্ভব। কারখানার লোকজন মিথ্যা তথ্য দিচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, কেবি রুদ্র রোডে শতাধিক বাড়ির নিচে কারখানা ও রাসায়নিকের সরঞ্জাম রয়েছে। আবার কোনো কোনো বাড়ির নিচে বিশেষ কায়দায় রাসায়নিক গুদামজাত করে রাখা আছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা গভীর রাতে ট্রাকে করে রাসায়নিক এনে মজুদ করেন এবং গোপনেই চলে এসবের বিকিকিনি। একটি ভিডিও চিত্রেও এমন ঘটনার প্রমাণ মেলে।

জানা গেছে, কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। ২০১৮ সালের জুলাই মাস থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির মেয়াদ। পরবর্তীতে প্রথম সংশোধনীতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। এ প্রকল্পের আওতায় ৩০৮ দশমিক ৩৩ একর জমিতে মোট দুই হাজার ১৫৪টি প্লট করার কথা। এই প্রকল্পে শুধু ভূমি অধিগ্রহণেই বিসিককে পরিশোধ করতে হবে ৫৩১ কোটি ৩৬ হাজার ৭৪০ টাকা। এর মধ্যে দুই ধাপে ২৪৭ কোটি সাত হাজার টাকা জেলা প্রশাসককে পরিশোধ করতে পেরেছে বিসিক। বাকি টাকা পরিশোধ করে জমি বুঝে নিতে পরিকল্পনা কমিশন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে বিসিক। 

এদিকে কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক নির্মাণে ধীরগতি নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে রাসায়নিক ব্যবসায়ীদের মধ্যেও। তাঁরা বলছেন, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন না হওয়ায় সব ধরনের ব্যাংকিং লেনদেন বন্ধ রয়েছে। অন্য আরো নানা কারণে তাঁদের ব্যবসা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইমপোর্টার্স অ্যান্ড মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি সাইদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সেমিনারে বসে বক্তব্য দেওয়া আর কাজ করা এক নয়। কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক তৈরি হলে আমরা অন্তত ব্যবসাটা চালিয়ে যেতে পারতাম। বসে খেতে খেতে মূলধনই শেষ করে ফেলেছি আমরা।’

ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ধীরগতির কারণ জানতে চাইলে বিসিকের চেয়ারম্যান মোশ্তাক হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অর্থ পরিশোধ না করায় জমি পাচ্ছি না। জমি পাওয়ার পর মাটি ভরাটের কাজ শুরু হবে। তবে জমি বুঝে পাওয়ার দুই বছরের মধ্যে আমরা কাজ শেষ করব।’

বিসিকের উপব্যবস্থাপক তানমীরা খন্দকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যে অর্থ বরাদ্দ পেয়েছি তা জেলা প্রশাসন বরাবর পাঠানো হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ শেষ হলে মূল কাজ শুরু হবে।’

মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মনিরুজ্জামান তালুকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভূমি অধিগ্রহণের সব কাজ শেষ। এখন বিসিক থেকে টাকা পাওয়ার পর তা ক্ষতিগ্রস্তদের দিয়ে জমি হস্তান্তর করা হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা