kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ১৯ চৈত্র ১৪২৬। ২ এপ্রিল ২০২০। ৭ শাবান ১৪৪১

চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির এক বছর কাল

সেই সুগন্ধির গুদাম মালিক আড়ালেই

এস এম আজাদ   

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সেই সুগন্ধির গুদাম মালিক আড়ালেই

রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ যে অগ্নিকাণ্ডে অর্ধশতাধিক প্রাণহানি হয়েছিল, তার সূত্রপাত যে সুগন্ধির গুদাম ও বোতলজাত করার কারখানা থেকে, তার মালিকরা এখনো আড়ালেই রয়ে গেছেন। নাম জানা গেলেও তাঁদের ঠিকানা কিংবা অবস্থান জানা যায়নি। প্রতিষ্ঠানের দুটি কার্যালয়েও তালা ঝুলছে।

আগামীকাল ২০ ফেব্রুয়ারি সেই ঘটনার এক বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তই শেষ হয়নি। মামলার দুর্বল এজাহারে আলোচিত সেই ভবনটির নামও নেই। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে সুগন্ধি বোতলজাত করার কারখানা ও গুদামে আগুনের সূত্রপাতের তথ্য মিললেও এজাহারে উল্লেখ ছিল সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কথা। এসব ভুলের সুযোগ নিয়ে ভবন মালিকের দুই ছেলে দীর্ঘদিন জামিনে রয়েছেন। এমনকি নিহত ব্যক্তিদের সবার ময়নাতদন্তও এখনো শেষ হয়নি।

গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চুড়িহাট্টা মোড়ের কাছে চারতলা ভবন ওয়াহিদ ম্যানশনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে। রাস্তায় থাকা গাড়ির সিলিন্ডারও বিস্ফোরিত হয়। ওই ভবন এবং আশপাশের দোকানে থাকা রাসায়নিক আর প্লাস্টিক-সুগন্ধির গুদাম আগুনের মাত্রা অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়। ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট দীর্ঘ ১৪ ঘণ্টার চেষ্টায় সেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনাস্থল থেকে ৬৭ জনের পোড়া ও খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে গণনায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭১-এ। এদের মধ্যে চারজনের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিয়ে যান তাঁদের স্বজনরা।

অগ্নিকাণ্ড তদন্তে ফায়ার সার্ভিস, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিস্ফোরক পরিদপ্তর, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন—এই পাঁচটি সংস্থার পাঁচটি কমিটি কাজ করেছিল। সরেজমিনে ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে এবং ঘটনাস্থলের বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণের পর কমিটিগুলো তদন্ত প্রতিবেদনও দেয়। সব প্রতিবেদনেই উল্লেখ করা হয়, আগুনের সূত্রপাত ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলার রাসায়নিক গুদাম থেকে হয়েছিল।

আলামতের সূত্র ধরে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলায় ছিল ‘পার্ল ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সুগন্ধির (বডি স্প্রে) কারখানা ও গুদাম। মাস কয়েক আগে চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ড নিয়ে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এই তথ্য ছিল। মূলত ওই কারখানায় বিস্ফোরণ থেকেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার পর পুরান ঢাকার মৌলভীবাজার ও হাতিরপুলে প্রতিষ্ঠানটির অফিস বন্ধ করে মালিকপক্ষ সটকে পড়ে। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ কাশিফ এবং দুই পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ ও মোজাম্মেল ইকবাল আত্মগোপনে চলে গেছেন। ওই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায়ও তাঁদের নাম নেই।

নিহতদের একজন জুম্মন (৫২) ছিলেন চকবাজারের ‘বিউটি মসলা’ নামের একটি কারখানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তাঁর বাসা ওয়াটার ওয়ার্কস রোডে। ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে জুম্মন ৬৫/৬৬ নন্দকুমার দত্ত রোডের ভবনের নিচে মদিনা ডেকোরেটরে তাঁর বন্ধুর কাছে যান। ঘটনার পরদিন জুম্মনের ছেলে মো. আসিফ বাদী হয়ে ‘অবহেলার কারণে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডের ফলে মৃত্যু ঘটাসহ ক্ষতিসাধনের’ অভিযোগে চকবাজার থানায় মামলা করেন। মামলায় ভবন মালিকের দুই ছেলেসহ ১০-১২ জনকে আসামি করা হয়।

এজাহারে বলা হয়, এ ভবনটির মালিক মৃত হাজি ওয়াহেদের (সাবেক কমিশনার) দুই ছেলে মো. হাসান ও সোহেল ওরফে শহীদ তাঁদের চারতলা বাড়িটির বিভিন্ন তলায় দাহ্য পদার্থ রাখতেন। মানুষের জীবনের ঝুঁকি জেনেও অবৈধভাবে রাসায়নিকের গুদাম করার জন্য ব্যবসায়ীদের কাছে বাসা ভাড়া দেন তাঁরা।

মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা (চকবাজার থানা থেকে যিনি বদলি হয়ে গেছেন) মোরাদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মামলার এজাহারে প্রাইভেট কারের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ এবং ৬৫ ও ৬৬ নম্বর ভবনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ ওই দুটি নম্বরের কোনো ভবনের মালিক নয় আসামিরা। দুই ভাই ৬৪ নম্বর ওয়াহেদ ম্যানশনের স্বত্বাধিকারী। এসব ভুল থাকায় আসামি প্রথমে জামিন পান।’ এসব বিষয় পরে আদালতকে অবহিত করা হয়েছে বলে জানান পরিদর্শক মোরাদুল ইসলাম।

জানা গেছে, গত বছরের ১৬ এপ্রিল এজাহারভুক্ত আসামি দুই ভাই ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এরপর মার্চে জামিন পান তাঁরা। ৮ আগস্ট হাইকোর্ট থেকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান দুজন। এরপর গত ১৬ ফেব্রুয়ারি জামিনের মেয়াদ আরো এক বছর বাড়ান বিচারপতি আবদুল হাফিজ ও মো. ইজারুল হক আকন্দের হাইকোর্ট বেঞ্চ।

মামলার বাদী আসিফ একটি পোশাকের দোকানের বিক্রয়কর্মী। জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এজাহার পুলিশই ঠিক করে দিয়েছিল। ভবনের মালিক, গোডাউনের মালিক কারা কী আমি তখন কিছুই জানতাম না। এখনো তেমন জানি না। তবে যারাই দায়ী হোক, আমি তাদের বিচার চাই।’

ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলের কাছে পাওয়া সুগন্ধির (বডি স্প্রে) কয়েকটি বোতলে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের নামের সূত্র ধরে জানা গেছে, পার্ল ইন্টারন্যাশনাল নামের প্রতিষ্ঠান ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলায় বিদেশি সুগন্ধির রাসায়নিক মজুদ এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নকল সুগন্ধি বোতলজাত করত। সুগন্ধি যেমন দাহ্য কেমিক্যাল, এর সঙ্গে থাকা গ্যাসও দাহ্য। এ কারণে পুরো দোতলা একরকম ‘গ্যাস চেম্বার’ হয়েছিল।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পার্ল ইন্টারন্যাশনালের মূল কার্যালয় ছিল পুরান ঢাকার ৬৬ মৌলভীবাজারের তাজমহল মার্কেটে। হাতিরপুলে ১৩/১ নম্বর সোনারগাঁও রোডে কাশেম সেন্টারের ছয়তলায় তাদের আরেকটি কার্যালয় ছিল। এসব ঠিকানায় গিয়ে তালাবদ্ধ থাকতে দেখা গেছে। ঘটনার পর থেকে পার্ল ইন্টারন্যাশনালের অন্যতম নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ কাশিফ এবং দুই পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ ও মোজাম্মেল ইকবাল আত্মগোপনে চলে যান।

জানতে চাইলে মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা, চকবাজার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কবির হোসেন হাওলাদার বলেন, ‘যতটুকু জানতে পেরেছি, গোডাউনের মালিক ভারতের মারোয়াড়ি গোত্রের লোক ছিল। বাংলাদেশে তাদের স্থায়ী কোনো ঠিকানা, ট্রেড লাইসেন্স—এসব পাওয়া যায়নি। তাদের অবস্থানও শনাক্ত করা যায়নি। এর পরও তাদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘পাঁচ-ছয়জনের অবহেলার তথ্য পাওয়া গেছে। এখন যাচাই-বাছাই চলছে।  এ ছাড়া ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া তদন্ত শেষ করা যাবে না। আগে একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছিল, নিয়মিত মামলা হওয়ার পর ওই মামলা শেষ হয়ে গেছে। এখন একটিই মামলা রয়েছে।’ তবে তিনি অবহেলার জন্য দায়ী কারো নাম বলতে রাজি হননি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দগ্ধ ও খণ্ডিত লাশের পরিচয় শনাক্ত করতে দীর্ঘদিন লাগায় এখন পর্যন্ত মাত্র আটজনের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। নিহতদের ময়নাতদন্তসহ কিছু তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের পর প্রতিবেদন দাখিল করা হবে বলে জানান তাঁরা। আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য আছে বলেও জানা গেছে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান সোহেল মাহমুদ জানান, পরিচয় শনাক্তকরণে বিলম্ব হওয়ায় সাত-আটটি লাশের ময়নাতদন্ত হয়েছে। বাকিগুলো প্রক্রিয়াধীন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা