kalerkantho

সোমবার । ২৩ চৈত্র ১৪২৬। ৬ এপ্রিল ২০২০। ১১ শাবান ১৪৪১

লেখকের মেলা

বইমেলা আমার প্রধান উৎসব

স্বকৃত নোমান

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বইমেলা আমার প্রধান উৎসব

একজন সাহিত্যকর্মী হিসেবে বইমেলা এখন আমার কাছে প্রধান উৎসব। এ কথা সত্যি যে মেলায় বই প্রকাশিত হবে, সে জন্য লিখি না। লিখি

প্রাণের তাগিদে। কিন্তু এই কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই, আমার নতুন সব কটি বই প্রকাশিত হয় মেলাকে কেন্দ্র করেই। ফেব্রুয়ারি মাসে সারা দেশ থেকে পাঠকরা আসে। প্রিয় লেখকের প্রিয় বইগুলো সংগ্রহ করে। আমার একটি বই সারা বছর যা বিক্রি হয় তার অন্তত পাঁচগুণ বেশি বিক্রি হয় মেলার সময়। এই একটি মাস আমি লিখি না, পড়িও না। চেষ্টা করি মেলাটিকে উপভোগ করতে। লেখক-প্রকাশকদের সঙ্গে দেখা হয়, পাঠকদের সঙ্গে দেখা হয়। দেখা ও আড্ডা আমার খুব ভালো লাগে।

বইমেলা এলে কেউ কেউ দাবি তোলেন, মেলায় প্রবেশের জন্য টিকিটের ব্যবস্থা করা হোক। তাঁদের যুক্তি, টিকিট সিস্টেম চালু হলে মেলায় ‘উটকো লোকজন’ যাবে না। এই উটকো লোক কারা? যারা বই কেনে না, যারা শুধু ঘুরতে যায়, যারা শুধু ফুচকা-চটপটি খেতে যায় এবং যারা সেলফি তুলতে যায়। টিকিট সিস্টেম চালু হলে এদের ‘উৎপাত’ কমবে, প্রকৃত পাঠকরা আরামসে বই কিনতে পারবে।

আচ্ছা, বইমেলাটা কি শুধুই বই কেনা-বেচার জন্য? মোটেই তা নয়। এর নাম কিন্তু মেলা। মেলায় মানুষ শুধু কেনা-বেচা করতে যায় না। মেলায় মানুষ যেমন কলা বেচতে যায়, তেমনি রথও দেখতে যায়। মেলায় মানুষ ঘুরতে যায়, আনন্দ করতে যায়। যেমন বৈশাখী মেলা। বৈশাখী মেলায় গিয়ে কাউকে জিনিসপত্র কিনতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বৈশাখী মেলায় প্রবেশের জন্য কেউ কি টিকিট সিস্টেম চালুর দাবি তোলে? তোলে না। বইমেলাও তেমনি একটি উৎসব। বইমেলা শুধু বই কেনা-বেচার উৎসব নয়, এটি একটি জাতীয় উৎসবের রূপ পেয়েছে। এই উৎসবে পাঠকরা যেমন অংশ নেবে, অপাঠকরাও নেবে। এই অংশ নেওয়াটা ইতিবাচক। অংশ নিতে নিতেই অপাঠকরা একদিন পাঠকে রূপান্তরিত হবে।

বই মানুষ কেন পড়ে? বেঁচে থাকার জন্য? বেঁচে থাকার জন্য বই পড়ার কোনো দরকার নেই। মানুষ বই পড়ে সাহিত্যরস আস্বাদনের জন্য। বই পাঠ একটা আনন্দও। বই কিনবেও মানুষ আনন্দের সঙ্গে। আমি তো এমন বই বিক্রয়কেন্দ্রের স্বপ্ন দেখি, যেখানে বসে মানুষ চা খাবে, কফি খাবে, আড্ডা দেবে, মন চাইলে বসে বসে বই পড়বে, ফেরার সময় পছন্দের বইগুলো কিনে নিয়ে যাবে। বইমেলাও তেমনি। মানুষ ঘুরবে, চা খাবে, চটপটি-ফুচকা খাবে, আড্ডা মারবে, মন চাইলে বই কিনবে, মন না চাইলে কিনবে না। আমরা যখন দাবি তুলছি, তোমাকে বই কিনতেই হবে, না কিনলে মেলায় ঢোকা যাবে না, তখন আমরা বইমেলাকে কেন্দ্র করে মানুষের উৎসবকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছি। এটা এক ধরনের জবরদস্তি। শিল্প-সাহিত্য কোনো জবরদস্তির ব্যাপার নয়। উৎসবের ব্যাপার, আনন্দের ব্যাপার।

এবারের বইমেলা উৎসর্গ করা হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। মেলার পরিসর বাড়ানো হয়েছে, স্টলও বেড়েছে, বেড়েছে প্যাভিলিয়নও। মেলাকে সুন্দর করার জন্য বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী আন্তরিক। স্থপতি ও লেখক এনামুল করিম নির্ঝরের শৈল্পিক পরিকল্পনায় মেলার সামগ্রিক বিন্যাস হয়ে উঠেছে নান্দনিক। মানুষে মানুষে ভরে উঠুক মেলা প্রাঙ্গণ। মানুষের জোয়ার নামুক। বইমেলা হয়ে উঠুক পাঠক-অপাঠকের সম্মিলিত উৎসব।

 

লেখক : কথাসাহিত্যিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা