kalerkantho

সোমবার । ২৩ চৈত্র ১৪২৬। ৬ এপ্রিল ২০২০। ১১ শাবান ১৪৪১

ভারতে বসেই জেএমবি গোছাচ্ছে জঙ্গি সালেহীন

এ আঞ্চলিক নেতাকে খুঁজছে দুই দেশের গোয়েন্দারা অনুদানের নামে তার কাছে অর্থ আসছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে

এস এম আজাদ   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভারতে বসেই জেএমবি গোছাচ্ছে জঙ্গি সালেহীন

সালাউদ্দিন সালেহীন সানি

সালাউদ্দিন সালেহীন সানি। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) শীর্ষস্থানীয় নেতা তিনি। ছয় বছর আগে ময়মনসিংহের ত্রিশালে আরো দুজনের সঙ্গে তাঁকে প্রিজন ভ্যান থেকে ছিনিয়ে নেয় সহযোগীরা। এই দুর্ধর্ষ জঙ্গি এখন বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের গোয়েন্দাদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

বাংলাদেশের পুলিশের গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, আগে জেএমবির বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের আমির সালেহীন এখন ভারতীয় উপমহাদেশের সংগঠক। ভারতে জেএমবির শাখা জামাআতুল মুজাহিদিন ইন্ডিয়া (জেএমআই) খুলেছেন সালেহীনই। তাঁকে বাংলাদেশের পুরনো জেএমবির প্রধান হিসেবে মেনে নিয়েছে সংগঠনটির বড় অংশ। তাঁর নেতৃত্বে ‘জওয়াল’ বা আঞ্চলিক জঙ্গি সংগঠন হিসেবে জেএমবি বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে সক্রিয় হয়ে উঠছে। কারাগারের প্রিজন থেকে পালিয়ে ভারতে যাওয়ার পর তিনি সীমান্তবর্তী কোচবিহার, উত্তর দিনাজপুর, মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও নদিয়ার গ্রামে থেকে ছয়টি ছদ্মনামে জঙ্গি কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছেন। পাকিস্তানেও সালেহীনের যাতায়াত আছে বলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি।  

গত নভেম্বরে বাংলাদেশে সালেহীনের সহযোগী আবু রায়হান ওরফে মাহমুদ ওরফে আবদুল হাদীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। ফারুক হোসেন ওরফে জামাই ফারুক, বোমা মিজান, জাহিদুল ইসলাম, ইজাজ আহমেদ, আব্দুল করিমসহ তাঁর আট সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে ভারতের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ) সূত্রের বরাতে ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য, বর্ধমানের খাগড়াগড় ও বিহারের বুদ্ধগয়াতে বিস্ফোরণে জড়িত সালেহীন। সম্প্রতি তাঁকে ধরতে মুর্শিদাবাদ জেলার মুকিমনগর গ্রামে অভিযানও চালানো হয়। তবে অল্পের জন্য ফসকে যান সালেহীন।

এদিকে বাংলাদেশের গোয়েন্দারা জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে অনুদানের নামে অর্থ এনে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে সংগঠন সক্রিয় করতে চাচ্ছেন সালেহীন। সৌদি আরব থেকে আব্দুর রাকিব এবং ইয়েমেন থেকে আব্দুল ওয়াহেদ নামের দুই ব্যক্তি তাঁকে এই অর্থ পাঠাচ্ছেন। মোস্ট ওয়ান্টেড সালেহীনকে ধরতে ভারতের গোয়েন্দারা বাংলাদেশের সহায়তা চাচ্ছে।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে সিটিটিসি ইউনিটের এক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশে সক্রিয় জেএমবির একটি বড় অংশ সালেহীনকেই আমির বলে মনে করে। গত বছরের ২৪ নভেম্বর রাজধানীর ভাটারা থেকে জেএমবির বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের আমির আবু রায়হানকে গ্রেপ্তারের পর দুই দফায় রিমান্ডে নতুন কিছু তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। ভারতে বসে সালেহীন মধ্যপ্রাচ্য থেকে অনুদানের নামে অর্থ সংগ্রহ করছেন। মসজিদ, মাদরাসাসহ বিভিন্ন স্থাপনা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জেএমবির নিজস্ব নেটওয়ার্ক তৈরির জন্য সাবেক আমির শায়খ আব্দুর রহমানের ভাগ্নিজামাই আব্দুর রাকিব সৌদি আরব থেকে অর্থ পাঠান। তিনি মদিনা ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছেন। আব্দুল ওয়াহেদ নামের আরেকজন টাকা পাঠান ইয়েমেন থেকে। ওয়াহেদের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।

সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, “এখন জেএমবিকে বলা হচ্ছে ‘জওয়াল’ সংগঠন। দীর্ঘদিন এ সংগঠনের আমিরের দায়িত্ব পালন করছিল আবু রায়হান। রায়হানকে গ্রেপ্তারের পর সালেহীনের আর্থিক সাপোর্ট ও নির্দেশনা মেনেই কাজ করছে সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তাকেই প্রধান বলে মানছে বড় অংশ। কিছু মতবিরোধও আছে।”

তদন্তকারী সূত্র জানায়, বাংলাদেশের পুরনো জেএমবিতে রায়হান ছাড়া দুজন শুরা সদস্য এবং অন্তত ৩০ জন সাধারণ সদস্য সক্রিয় আছে। নব্য জেএমবিতে যোগ না দেওয়া এই সদস্যরা ‘প্রটেক্টর টেক্সট’ ওয়েবসাইটে সালেহীনের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। জেএমবির সদস্যরা নব্য জেএমবির কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে ‘হত্যাকাণ্ড’ ঘটানো নিয়ে নানা মত দিতে থাকে। রায়হানের আগের আমির খোরশেদ আলম জিয়া আল-কায়েদার মতাদর্শী এবিটি ও আনসার আল ইসলামের কর্মকাণ্ড সঠিক বলে মনে করতেন। তিনি এবিটির নেতা মেজর (চাকরিচ্যুত) সৈয়দ জিয়াউল হকের সঙ্গে সমঝোতা করেন। পরে এবিটির টার্গেটে থাকা প্রকাশক শাহজাহান বাচ্চুকে মুন্সীগঞ্জে হত্যার মাধ্যমে এবিটির বিশ্বাস অর্জন করে জেএমবির এই দলটি।

যে কারণে সালেহীনকে নিয়ে ভয় : আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো জানায়, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা দেশে সিরিজ বোমা হামলা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সালেহীন আগে জেএমবির শুরা সদস্য ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ৪০টি মামলা আছে, যার মধ্যে ১৩টি মামলায় সাজা হয়। তিনটি মামলায় তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন আদালত। রায়ের সময় কারাগারেই ছিলেন সালেহীন। ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে এক পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে জেএমবি সদস্যরা। প্রিজন ভ্যানে থাকা সালেহীন, জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমা মিজান ও রাকিবুল হাসানকে ফিল্মি স্টাইলে ছিনিয়ে নেয় সহযোগীরা। ওই দিনই মির্জাপুরে গ্রেপ্তারের পর রাকিবুল হাসান ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। বাকি দুজন ভারতে পালিয়ে যান। গত দুই বছরে জামাই ফারুক, মিজানসহ সালেহীনের আট সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে ভারতের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সালেহীনকে ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে বাংলাদেশ পুলিশ। এনআইএ তাঁকে মোস্ট ওয়ান্টেড ঘোষণা করে। গণমাধ্যমের খবর, ভারতে গিয়ে সালেহীন পশ্চিমবঙ্গে জেএমবির নতুন শাখা খোলেন, যার নাম জামাআতুল মুজাহিদিন ইন্ডিয়া (জেএমআই)। ভারতে ‘সুন্নি’, ‘হাফিজুর রহমান শেখ’, ‘সজীব’, ‘তাওহীদ’, ‘বাংলার বাঘ’ ও ‘মাহিন’ ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন সালেহীন। সহযোগীদের ভাষ্য মতে, সালেহীন কোচবিহার, উত্তর দিনাজপুর, মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও নদিয়ার গ্রামে থেকে জঙ্গি কার্যক্রম চালাচ্ছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা