kalerkantho

শনিবার । ১০ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৮ জমাদিউস সানি ১৪৪১

লেখকের মেলা

বইমেলা : সংস্কৃতির উজ্জ্বল উদ্ধার

বিশ্বজিৎ ঘোষ

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বইমেলা : সংস্কৃতির উজ্জ্বল উদ্ধার

স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে, ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি, বাংলা একাডেমি চত্বরে মুক্তধারার স্বত্বাধিকারী চিত্তরঞ্জন সাহা চাটাই বিছিয়ে

যে বইমেলার সূত্রপাত করেছিলেন, প্রায় অর্ধশতাব্দীর ব্যবধানে আজ তা বাঙালি সংস্কৃতির অনিবার্য এক উপাদানে পরিণত। বাংলা একাডেমির একুশের বইমেলা শুধু বই বেচাকেনার মেলা নয়, এ মেলা বাঙালির আবেগ আর সংরাগ, দ্রোহ আর প্রতিবাদ, মানুষের সঙ্গে মানুষের সংঘবাসনারও অনন্য এক মেলা। একুশের বইমেলা আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, বাঙালি জাতিসত্তার আত্মপরিচয়ের উল্লেখযোগ্য অনুষঙ্গ। এ সূত্রেই ফ্রাংকফুর্ট-লন্ডন-কলকাতা বইমেলার সঙ্গে আমাদের বইমেলার এত পার্থক্য। একুশের বইমেলার অন্তরে আছে দ্রোহের আগুন, আছে মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসার আবেগ, আছে বিচ্ছিন্নতা আর খণ্ডতার সীমানা পেরিয়ে অখণ্ড সংঘসত্তায় জেগে উঠার আহ্বান। একুশের বইমেলার মৌল আবেদনে আছে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনা।

বিচ্ছিন্নতাই এখন ক্রমশ প্রবল হয়ে উঠছে। বাংলা একাডেমির বইমেলা সামাজিক এই প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রবল এক প্রতিবাদ। এ মেলা পাঠক-লেখক-প্রকাশকদের এক মিলনমেলা; এ মেলা মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক উদ্ধারের মেলা। কেবল বই কেনার জন্য বইমেলায় মানুষ আসে না, মানুষ আসে অন্য মানুষের সান্নিধ্য পেতে, আড্ডা জমাতে, চা খেতে, গল্প করতে। লেখকের সঙ্গে পাঠকের এখানে দেখা হয়, দেখা হয় প্রকাশকের সঙ্গেও। বইমেলার সঙ্গে লেখক-পাঠক-প্রকাশকদের একটা উন্মাদনা জড়িত থাকে—এ কথা অস্বীকার করি কিভাবে? অপশক্তির আঘাত এসেছে বইমেলায়, আক্রান্ত হয়েছেন লেখক কিংবা প্রকাশক, কখনো রুদ্ররূপে ধেয়ে এসেছে প্রকৃতি, লণ্ডভণ্ড হয়েছে সব আয়োজন, তবু বইমেলা দিনে দিনে সমৃদ্ধ হয়েছে, লাভ করেছে জাতীয় পরিচয়। লেখক-পাঠক-প্রকাশকের উন্মাদনাই সব প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে বইমেলাকে নিয়ে গেছে সামনের দিকে।

পণ্যায়নের এই যুগে সব কিছুই পণ্যে পর্যবসিত। বইমেলায় আসা বইও কি পণ্যায়নের বাইরে আছে? এ প্রশ্নেই আমাদের বইমেলা ভিন্ন এক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। পণ্য নয়, একুশের বইমেলায় বই প্রকাশিত হোক মননবিকাশের জন্য, বই প্রকাশিত হোক জ্ঞান সৃষ্টির জন্য, বই প্রকাশিত হোক পাঠকচিত্তে সৃষ্টিশীল ভাবনার খোরাক হয়ে। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রকাশকদের ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। এ কথা সবাই স্বীকার করবেন যে বাংলাদেশে এখন সিংহভাগ বই প্রকাশিত হয় একুশের বইমেলাকে কেন্দ্র করে। মেলাকেন্দ্রিক বই প্রকাশের কারণে অনেক সময়েই প্রকাশের প্রতি প্রত্যাশিত যত্ন নেওয়া যায় না। পণ্য বিক্রির আশায় বইও কম প্রকাশিত হয় না একুশের বইমেলায়। গ্রন্থ সম্পাদনার তো বালাই নেই, সম্পাদনার ধারণাটাই তো এখন পর্যন্ত সৃষ্টিই হলো না আমাদের দেশে। বছরজুড়ে বই প্রকাশিত হোক, বই প্রকাশিত হোক সুসম্পাদিত হয়ে—এমন প্রত্যাশা তো আমরা প্রকাশকদের কাছে করতেই পারি।

এবারের বইমেলা মুজিববর্ষের বইমেলা, বইমেলা উৎসর্গও করা হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তাই এবারের বইমেলার রয়েছে বিশেষ তাত্পর্য। কেবল পরিধিতে বইমেলা বেড়েছে, কয়টা গেট রাখা হয়েছে, এটার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমাদের কাছে এবারের বইমেলার এই বিশেষ চারিত্র্য। এবারের বই কেনার শীর্ষে যে থাকবেন লেখক শেখ মুজিবুর রহমান, তা ইতিমধ্যে বোঝা গেছে।

মুজিববর্ষের বইমেলায় আমার তিনটা বই প্রকাশিত হবে। কথাসাহিত্যবিষয়ক একটা বই এরই মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে অন্যপ্রকাশ থেকে। অভিন্ন সংস্থা থেকে ১৫ তারিখের মধ্যে বের হবে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আমার ভাবনাসমগ্র ‘অশেষ রবীন্দ্রনাথ’। পত্রিকার কলাম নিয়ে কথাপ্রকাশ প্রকাশ করবে ‘কথামালা’র দ্বিতীয় খণ্ড। ধারণা করি, ১৫ তারিখের মধ্যে এটিও মেলায় চলে আসবে।

বাংলা একাডেমির বইমেলা বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, বাংলা একাডেমির বইমেলা আমাদের সংস্কৃতির উজ্জ্বল উদ্ধার। বইমেলায় প্রকাশিত বই আমাদের মননচর্চার ধারাকে সম্প্রসারিত করুক, ঋদ্ধ করুক আমাদের জ্ঞানস্পৃহা—এই আমার প্রত্যাশা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা