kalerkantho

বুধবার  । ১৮ চৈত্র ১৪২৬। ১ এপ্রিল ২০২০। ৬ শাবান ১৪৪১

শহীদ মিনারের জমিতে মার্কেট নির্মাণ!

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি   

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শহীদ মিনারের জমিতে মার্কেট নির্মাণ!

সুনামগঞ্জের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পূর্ব দিকের সীমানায় রাতারাতি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান (মার্কেট) গড়ে তোলার এক মাসের মাথায় মুক্তিযোদ্ধা-জনতার প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মুখে স্থাপনাটি অপসারণ করা হয়েছে। গত বুধবার রাত ১০টায় শুরু হয়ে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত অপসারণের কাজ চলে। এর মাসখানেক আগে শহীদ মিনারের পশ্চিম পাশের সীমানায় গড়া আরেকটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও ২১শে ফেব্রুয়ারির আগেই অপসারণের দাবি জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা। তাঁরা বলেছেন, দ্রুত শহীদ মিনারটির সংস্কার ও সম্প্রসারণ করতে হবে।

মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ শত্রুমুক্ত হয়। মুক্তদিবসের পরই সুনামগঞ্জ শহীদ মিনারের নকশা করেন

টেকেরঘাট সাবসেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক সালেহ চৌধুরী। পরে মুক্তিযোদ্ধারা সুনামগঞ্জ ডিএস রোডের বাঁ পাশে পুরনো কলেজের পশ্চিম পাশে কমিউনিকেশন অ্যান্ড ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টের (বর্তমান গণপূর্ত ও সড়ক বিভাগ) জায়গায় শহীদ মিনার (কেন্দ্রীয়) প্রতিষ্ঠা করে একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বর শহীদদের উদ্দেশে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেন ও স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম বিজয় দিবস উদ্যাপন করেন। তখন থেকে এই শহীদ মিনারে মুক্তিযোদ্ধা-জনতা বিজয় দিবস-স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন এবং রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন সংগঠন কর্মসূচি পালন করে আসছে। ২০১৪ সালে শহীদ মিনারের এই ভূমি স্বত্ব প্রচার ও হাল জরিপে জেলা জজের নামে রেকর্ডের জন্য মামলা করা হয়। গত বছরের ৫ ডিসেম্বর জ্যেষ্ঠ সহকারী জজ আদালতে জেলা জজের পক্ষে আদালতের নাজির জমিটি থেকে কোনো স্থাপনা অপসারণে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ২০ কার্যদিবসের মধ্যে জেলা প্রশাসক ও গণপূর্ত বিভাগকে কেন শহীদ মিনারের দাগের জমিতে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি হবে না মর্মে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। এরপর তড়িঘড়ি করে শহীদ মিনারের জমিতে পূর্ব সীমানায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান (দোকানপাট/মার্কেট) নির্মাণ শুরু করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এর মাসখানেক আগে শহীদ মিনারের জমিতে (পশ্চিমে) মার্কেট নির্মাণ করা হয়।

শহীদ মিনারের জমিতে দুটি মার্কেট নির্মাণের ঘটনায় ক্ষুব্ধ মুক্তিযোদ্ধারা জেলা প্রশাসক ও পৌর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতিবাদ জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২ ফেব্রুয়ারি ‘সুনামগঞ্জ শহীদ মিনারের জায়গাসংক্রান্ত মামলার সর্বশেষ অবস্থা এবং জায়গার মালিকানাসংক্রান্ত বিষয়ে একটি উপকমিটি’ গঠন করা হয়। ১১ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জ স্থানীয় সরকারের উপপরিচালকের কক্ষে জরুরি সভায় বসেন কমিটির নেতারা। সভায় মুক্তিযোদ্ধারা এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে ২১শে ফেব্রুয়ারির আগেই ওই ব্যাবসায়িক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। না হলে ২১শে ফেব্রুয়ারি এর প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি না দিয়ে প্রতীকী শহীদ মিনার করে সেখানে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের প্রস্তাব দেন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। অবিলম্বে ওই স্থাপনা অপসারণ করা না হলে মুক্তিযোদ্ধারাই তা অপসারণ করবেন বলে বক্তব্য দেন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। সভায় বক্তব্য দেন মুক্তিযোদ্ধা আ ত ম সালেহ, আলী আমজদ, বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু, আবু সুফিয়ান, মালেক হুসেন পীর, আব্দুল মজিদ, নূরুল মোমেন প্রমুখ। সুধীজনও উপস্থিত ছিলেন সভায়।

মুক্তিযোদ্ধা মালেক হুসেন পীর বলেন, ‘২০১৪ সালে জেলা জজের পক্ষে কার্যালয়ের নাজির এই স্থানে (শহীদ মিনার) নিজেদের স্বত্ব প্রচার ও হাল জরিপে রেকর্ডের জন্য মামলা করলে আমি শহীদ মিনারের পক্ষে পক্ষভুক্তির জন্য আদালতে আবেদন করলে আমার আবেদন গ্রহণ করা হয়নি। সম্প্রতি এই স্থানের স্থাপনা যাতে অপসারণ না হয় তা চেয়ে আদালতে আবেদন করা হয় এবং দুই দিকে স্থাপনা নির্মাণ শুরু হয়।’

মুুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আলী আমজদ বলেন, ‘শহীদ মিনার মানে বাংলাদেশের হৃদয়। যারা শহীদ মিনারকে পরিত্যক্ত করার ষড়যন্ত্রে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান করেছে তাদের প্রতি ঘৃণা জানাই। স্বাধীন বাংলাদেশে শহীদ মিনারের বিপক্ষে গিয়ে এমন কাজ হতে পারে আমরা কল্পনাও করতে পারিনি।’

মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন, ‘শহীদ মিনারটি আমাদের আবেগের পবিত্র স্থান। এটাকে শ্রীহীন করে বাণিজ্যিক স্থাপনা যারা করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’ তবে একপাশের স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধন্যবাদ জানান তিনি।

এ বিষয়ে জেলা জজের নাজির দেবাশীষ দে বলেন, ‘পূর্ব পাশে শহীদ মিনারঘেঁষা যে স্থাপনা করা হচ্ছিল আমরা বুধবার রাতে তা অপসারণ করেছি। তবে পশ্চিম পাশে কারা স্থাপনা করেছে আমরা জানি না।’

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, ‘সম্প্রতি শহীদ মিনারের দাগের ভূমিতে জেলা জজের পক্ষে আদালত ২০ কার্যদিবসের মধ্যে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা কেন হবে না জানতে চেয়ে নোটিশ পাঠিয়েছেন। আমরা এ বিষয়ে জবাব দেওয়ার কাজ করছি।’ জেলা প্রশাসন নোটিশের জবাব দিতে ১৬ ফ্রেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় বাড়িয়ে নিয়েছে বলে সূত্র জানায়।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা