kalerkantho

ক্রিকেট বীরদের সংবর্ধনা

দুই পাশে হাজারো মানুষ, ফুলের বৃষ্টি শুভেচ্ছার করতালি

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দুই পাশে হাজারো মানুষ, ফুলের বৃষ্টি শুভেচ্ছার করতালি

খোলা গাড়িতে দণ্ডায়মান, গলায় অসংখ্য ফুলের মালা। শুভেচ্ছা জানাতে হাত ঊর্ধ্বমুখী। দুই পাশে হাজারো মানুষ। সংবর্ধনার এমন আয়োজন তাঁর প্রাপ্যই। গতকাল অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়ক আকবর আলীকে এভাবেই বরণ করে নেয় রংপুরবাসী। ছবি : কালের কণ্ঠ

যখন তাঁরা বাড়ি বা এলাকা থেকে বের হয়েছিলেন তাঁদের সঙ্গে ছিলেন দু-একজন। আর যখন এলাকায় ফিরলেন তাঁদের ঘিরে অসংখ্য মানুষের ভিড়। সবাই উচ্ছ্বসিত। সবার মুখে হাসি, আনন্দধ্বনি। বিদেশে উড়াল দেওয়ার আগে যা তাঁরা কল্পনাও করেননি, গতকাল বৃহস্পতিবার তা-ই ঘটেছে। আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপে বিজয়ী হয়ে দেশকে অনন্য মর্যাদা এনে দেওয়া বীররা নিজ নিজ এলাকায় ফিরেছেন গতকাল। আর তাঁদের অভাবনীয়, বিপুল সংবর্ধনা দিয়েছে এলাকাবাসী। ফুলের বৃষ্টি, মিষ্টি, করতালি আর বুকভরা ভালোবাসা দিয়ে বরণ করে নিয়েছে তাঁদের।

ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রওনা দিয়ে দুপুর সাড়ে ১২টায় সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছেন অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয়ের বীর আকবর আলী। সেখানে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান রংপুর সিটি করপোরেশনের (রসিক) মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফাসহ বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সুধীজন। পরে তাঁকে বিশাল মোটর বহরে করে জন্মভিটা রংপুরে নেওয়া হয়। তাঁর বাড়ি রংপুর নগরের পশ্চিম জুম্মাপাড়ায় ঢোকার পথে কৈলাসরঞ্জন স্কুল গেটের সামনে থেকে ফুল বিছানো গালিচা দিয়ে মা-বাবার কোলে পৌঁছান আকবর। বিকেলে রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠের সংবর্ধনা মঞ্চে তাঁকে জেলা প্রশাসন ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার উদ্যোগে গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়। গান গেয়ে, ফুল ছিটিয়ে আকবরকে বরণ করে রংপুরবাসী। আকবরকে নতুনরূপে দেখতে ভিড় জমায় ছোট-বড় সবাই। টাউন হল চত্বরের মূল ফটকের সামনে মেট্রোপলিটন পুলিশের সুসজ্জিত ব্যান্ডদলের বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে গান আর ভক্তদের ছিটানো ফুলের পাঁপড়িসিক্ত ভালোবাসা নিয়ে মঞ্চে উঠেন ক্রিকেটসাম্রাজ্যের নয়া অধিপতি আকবর আলী। অনুষ্ঠানে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক আকবর বলেন, ‘বাংলাদেশ টিমকে আপনারা যেভাবে সমর্থন করে আসছেন, তা আগামীতেও ধরে রাখবেন। দোয়া করবেন, আমাদের এই অর্জন যেন শেষ না হয়ে যায়। আমরা আরো সাফল্য চাই। আমি আপনাদের ভালোবাসার কাছে কৃতজ্ঞ। আমি ঋণী হয়ে গেছি। দেশের জন্য কিছু করতে চাই।’ এরপর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আকবর। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রংপুরের মানুষ আমাকে এত ভালোবাসা দেবে তা স্বপ্নেও কল্পনা করিনি। তাদের ভালোবাসায় আমি অভিভূত।’ জুনিয়র ক্রিকেটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, অধ্যবসায় ও একাগ্রতা থাকলে সাফল্য আসবেই।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রসিকের মেয়র, জেলা প্রশাসক আসিব আহসান, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক আনোয়ারুল ইসলাম, জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা, শিক্ষাঙ্গনের শিক্ষার্থী ও ক্রীড়ানুরাগী সাধারণ জনগণ আকবরকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়। সেখান থেকে পশ্চিম জুম্মাপাড়ায় নিজ বাড়িতে যান আকবর আলী। সন্ধ্যায় বাড়ির পাশের মাঠে তাঁকে এলাকাবাসী সংবর্ধনা দেয়। এলাকাজুড়ে প্রকম্পিত হয় ‘আকবর দ্য গ্রেট’।

অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ দলের দুই খেলোয়াড় বগুড়া জেলার দুই কৃতি সন্তান তানজিদ হাসান তামিম ও তৌহিদ হৃদয়কে দুপুরে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। বগুড়ার বনানীতে তাঁদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়। এরপর জাতীয় পতাকা উড়িয়ে পুলিশি নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাঁদের নেওয়া হয় শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথায়। ক্রিকেটভক্তরা তাঁদের পেয়ে আনন্দিত হয়ে ওঠে। জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্যরা তাঁদেরসহ উপস্থিত সবাইকে মিষ্টিমুখ করান। এ সময় তামিম বলেন, ‘এ (বিশ্বকাপ) বিজয় দেশের ১৬ কোটি মানুষের বিজয়। আমাদের ক্রিকেট গুরু, ক্রিকেট শিক্ষক মুসলেম স্যার মারা গেছেন। আমরা খবরটি সাউথ আফ্রিকা থেকে শুনেছি। খুব খারাপ লেগেছে। আমরা মুসলেম স্যারের জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।’

বগুড়া শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামের ভেন্যু ম্যানেজার জামিলুর রহমান বলেন, জেলা ক্রীড়া সংস্থার পক্ষে একটি গণসংবর্ধনার আয়োজন করা হবে। এ সময় জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহসভাপতি আলহাজ্ব শেখ, সদস্য আরিফুর রহমান আরিফ, স্বপন, আলেয়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপের দুই খেলোয়াড় মাহমুদুল হাসান জয় ও শামীম হোসেন পাটোয়ারীকে বীরোচিত সংবর্ধনা দিয়েছে চাঁদপুরবাসী। গতকাল সকালে রাজধানী থেকে জয় নদীপথে ও শামীম সড়কপথে চাঁদপুরে ফেরেন। পরে তাঁদের নিয়ে চাঁদপুরবাসী শহরে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করে। এতে অংশ নেয় মোটরসাইকেলসহ কয়েক শ যানবাহন। নেচেগেয়ে-বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে শহর মাতিয়ে তোলে তারা। ক্রিকেটের দুই বীরকে একনজর দেখতে হাজারো মানুষের ঢল নামে। দুপুরে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জামান তাঁদের ফুল দিয়ে বরণ করেন। পরে পৌর মেয়র নাসিরউদ্দিন আহম্মদ, জয়-শামীমের গ্রামের বাড়ি ফরিদগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম রোমান, চাঁদপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ওসমান গনি পাটোয়ারী তাঁদের ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। পরে শামীম ধানুয়ায় এবং জয় পশ্চিম লাড়ুয়ায় নিজ বাড়িতে ফিরে যান। স্বজন ও গ্রামবাসী ফুল, মিষ্টি আর নানা স্লোগানে তাঁদের বরণ করে নেয়। মা-বাবা তাঁদের কাছে পেয়ে আনন্দে কেঁদে ফেলেন। এদিকে জয়-শামীমের নৈপুণ্যের ধারা অব্যাহত রাখার আশাবাদ জানিয়ে তাঁদের প্রথম কোচ, চাঁদপুর ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমির প্রধান শামীম ফারুকী তাঁদের কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন।

বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন দলের অন্যতম অলরাউন্ডার নড়াইলের অভিষেক দাস অরণ্য দুপুরে নড়াইলে  এসে পৌঁছেন। তাঁকে বাজনা বাজিয়ে আর কয়েক শ গাড়ির শোভাযাত্রা করে যশোর বিমানবন্দর থেকে ৩৫ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে নিজ শহরে আনা হয়। বিমানবন্দরে বাবা অসিত দাস, মা করুণা দাস, ভাই দীপ্ত দাসসহ বিভিন্নজনকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ প্রকাশ করেন অভিষেক। পথে যশোর শহর, চাড়াভিটা, ভাঙ্গুড়া ও তুলারামপুরে প্রিয় ছেলেকে অভিবাদন জানায় অসংখ্য মানুষ। সকাল থেকে প্রিয় খেলোয়াড়কে দেখার জন্য অভিষেকের বাড়ির সামনে শহরের বাঁধাঘাট এলাকায় শত শত মানুষের ভিড় জমে। পুরো এলাকা সাজানো হয় অভিষেকের নানা পোস্টার দিয়ে। নড়াইলে ঢুকে অভিষেক প্রথমেই চলে যান আদর্শ খেলোয়াড় মাশরাফির মা হামিদা মোর্তজাকে সালাম করতে। সেখান থেকে অভিষেকের জয়ধ্বনি করতে করতে খোলা জিপে করে তাঁকে আনা হয় বাঁধাঘাট এলাকায়। এখানে ফুল দিয়ে বরণ করে নেয় এলাকাবাসী। মাশরাফির বাবা গোলাম মোর্তজা, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক শরফুল আলম লিটু, হাফিজ খান মিলন, ছাত্রলীগের নেতারাসহ শত শত মানুষ তাঁকে অভিনন্দন জানায়। অভিষেক তাঁর কোচদের ধন্যবাদ দিয়ে এলাকাবাসীর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পরে বাড়িতে তাঁকে ডালায় সাজানো ফুল-দূর্বা দিয়ে বরণ করে নেন মা-কাকিরা। এরপর তিনি বৃদ্ধ ঠাকুরমার ঘরে যান। ঠাকুরমা তাঁকে আশীর্বাদ করেন। ঠাকুরমাকে নিজের পরনের মালা পরিয়ে দেন অভিষেক।

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর ও বগুড়া এবং চাঁদপুর ও নড়াইল প্রতিনিধি]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা