kalerkantho

সোমবার । ৪ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪১

জেলার প্রধান সমস্যা : রাজশাহী

শহরে ছিনতাই আর গ্রামে বেহাল রাস্তা

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শহরে ছিনতাই আর গ্রামে বেহাল রাস্তা

রাজশাহী নগরীতে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে গত ১৯ জানুয়ারি রাত ২টার দিকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের (রামেক) দুই শিক্ষার্থী আহত হন। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয় মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ। এর দুই দিন আগে নগরীর সাগরপাড়া এলাকায় হামলার শিকার হন গোদাগাড়ীর এক অটোরিকশাচালক। অটোরিকশাটি ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে ওই যুবককে ছুরিকাঘাত করা হয়। একসময়ের নিরাপদ শিক্ষানগরে এমন ছিনতাই এখন প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা।

মহানগরের ট্রাফিক পুলিশের এক কর্মকর্তার কথায়ও পরিস্থিতির ভয়াবহতা উঠে এসেছে। অনেকটা আক্ষেপ করেই তিনি বলছিলেন, ‘এমন কোনো দিন কাটছে না যেদিন নগরে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে না। আর ছিনতাই হলেই আমাদের ওপর চাপ বাড়ে। কিন্তু কোনোভাবেই এটা রোধ করা যাচ্ছে না। এক শ্রেণির অটোরিকশাচালক ও মোটরসাইকেলচালকও এই অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছেন।’

অন্যদিকে রাজশাহীর গ্রামাঞ্চলের মানুষের বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে উঠেছে বেহাল রাস্তাঘাট। যাতায়াত করতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠেছে সাধারণ মানুষের। কোনো কোনো রাস্তা অনেকটাই যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বিকল্প না থাকায় অনেকটা ঝুঁকি আর অবর্ণনীয় কষ্ট স্বীকার করে এই ভাঙাচোরা পথেই নিত্যদিন চলতে হচ্ছে তাদের। জনদুর্ভোগ লাঘবে তেমন কোনো উদ্যোগও চোখে পড়ছে না। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বছরের ৬ আগস্ট ভোরে রাজশাহী সিটি কলেজের ছাত্র ফারদিন ইসনা আশারিয়া রাব্বী (১৯) খুন হন। ঘটনার পরদিন ওই এলাকার বাসিন্দা কুদরত আলীর ছেলে রনককে (২৩) হেরোইনসহ গ্রেপ্তার করা হয়। রিমান্ডে এই মাদকসেবী স্বীকার করেন যে ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে তিনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। রাজশাহীতে গত পাঁচ-ছয় বছরে এভাবে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে কমপক্ষে পাঁচজন খুন হয়েছে।

নগরীর উপশহর এলাকার বাসিন্দা মাজহার আলী বলেন, ‘কয়েক দিন আগে আমার মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফেরার পথে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে। মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা অটোরিকশায় থাকা অবস্থায় মেয়ের ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এর পর থেকে পরিবারের সব সদস্যই ছিনতাই আতঙ্কে ভুগছে।’

ট্রাফিক পুলিশের একজন সার্জেন্ট নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ছিনতাইকারীরা নানা কৌশল নিয়ে তৎপর। ভোরে বা গভীর রাতে হেঁটে, দিনে কেউ মোটরসাইকেল নিয়ে আবার কেউ অটোরিকশা নিয়ে ছিনতাই করছে। ঘটনা ঘটার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা তল্লাশির জন্য আমাদের চাপ দেন। কিন্তু শহর ভরে আছে হাজার হাজার অটোরিকশায়। সেখানে কয়টা তল্লাশি করা যায়। এসব যান দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে ছিনতাই রোধ করা সম্ভব না। আবার মোটরসাইকেলেও ছিনতাইকারীরা বেপরোয়া।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সনাক) রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি আহম্মেদ শফিউদ্দিন বলেন, ‘রাজশাহী নগরে গত ছয় মাসে যেভাবে একের পর এক ছিনতাই হচ্ছে, তাতে শান্তির শহর রাজশাহীর নামই হয়তো একসময় ছিনতাইয়ের শহর হবে। আমরা মনে করি, প্রশাসন, নগর সংস্থা ও রাজনীতিবিদরা একটু দৃষ্টি দিলেই এটা রোধ করা সম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘শহরের প্রতিটি মোড়ে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো দরকার। চালকদের নাম-পরিচয় ঝুলিয়ে দিতে হবে অটোরিকশার সামনে। আর মোটরসাইকেলে ছিনতাইকারী নিয়ন্ত্রণে কঠোর হতে হবে প্রশাসনকে। কিশোরদের মোটরসাইকেল চালাতে দেওয়া যাবে না। কারণ বেশির ভাগ ছিনতাইকারী কিশোর বয়সের।’

মহানগর পুলিশের মুখপাত্র গোলাম রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘ছিনতাই কিছু ঘটছে। ছিনতাই রোধে নিয়মিত টহলের ব্যবস্থা করেছি। তবে পুলিশের পাশাপাশি পথচারীদেরও এগিয়ে আসতে হবে। ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানাতে হবে। প্রয়োজনে ছিনতাইকারীদের ছবি তোলার চেষ্টা করতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো দ্রুত সংস্কারের পাশাপাশি নতুন নতুন স্থানে ক্যামেরা বসানো দরকার। তাহলেই নিয়ন্ত্রণে আসবে ছিনতাই।’

এদিকে রাজশাহীর হরিয়ান থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার রাস্তাটির অবস্থা এতটাই খারাপ যে যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। মহেন্দ্রা বাজারের ব্যবসায়ী মুকুল হোসেন বলেন, ‘একেবারে বিপদে না পড়লে কেউ এই রাস্তা ব্যবহার করছে না। এতটা জনদুর্ভোগের পরও সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই।’ রাজশাহীর বায়া থেকে তানোর সড়কটিরও একই অবস্থা।

রাজশাহীর গ্রামগঞ্জের ২৫-৩০টি রাস্তাই দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠেছে। সংস্কারের তেমন উদ্যোগ নেই। আবার সংস্কার হলেও কাজের মান খুবই নিম্নমানের হওয়ায় কার্পেটিং এক মাসও থাকছে না।

রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, ‘গ্রামীণ সড়কগুলো সংস্কারের উদ্যোগ না থাকায় মানুষের কষ্ট দিন দিন বাড়ছে। রাস্তাগুলো সংস্কার করা জরুরি। আবার কাজের মানও ভালো হতে হবে। কারণ রাস্তাগুলো নির্মাণ বা সংস্কারে অনিয়মের কারণেই এত দ্রুত বেহাল হয়ে পড়েছে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা