kalerkantho

শনিবার । ১০ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৮ জমাদিউস সানি ১৪৪১

বিয়ের অনুষ্ঠানের রেশ তখনো কাটেনি

আগুনে এক পরিবারের পাঁচজন পুড়ে অঙ্গার

নিজস্ব প্রতিবেদক, মৌলভীবাজার   

২৯ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আগুনে এক পরিবারের পাঁচজন পুড়ে অঙ্গার

মৌলভীবাজারে আগুনে পুড়ে নিহতদের স্বজনদের আহাজারি। ছবি : কালের কণ্ঠ

একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের রেশ কাটার আগেই মৌলভীবাজার শহরে একটি জুতার দোকানে এবং দোকানের ওপর দোতলা ঘরে আগুন লেগে এক পরিবারের পাঁচজন নিহত হয়েছেন। আগুন লাগার ঘটনা টের পেয়ে ওই ঘরে থাকা আরো সাতজন প্রাণ নিয়ে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শহরের এম সাইফুর রহমান রোডের (সেন্ট্রাল রোড) পিংকী শু স্টোর এবং এর ওপরে কাঠের দোতলায় এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন সুভাষ রায় (৬০), তাঁর মেয়ে প্রিয়া রায় (১৯), ভাই মনা রায়ের স্ত্রী দীপ্তি রায় (৪৫), শ্যালক হবিগঞ্জের উমেদনগরের সজল রায়ের স্ত্রী দীপা রায় (৪৫) এবং দীপা রায়ের মেয়ে দীপিকা রায় বৈশাখী (৩)। সুভাষের মেয়ে পিংকীর বিয়ে উপলক্ষে দীপা ও বৈশাখী এই বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন। 

স্থানীয় ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম কামরান এবং ফায়ার সার্ভিস সূত্র কালের কণ্ঠকে জানায়, সকাল সোয়া ১০টার দিকে সুভাষ রায়দের মালিকানাধীন পিংকী শু স্টোরে আগুন লাগে। জুতার দোকানের ওপরে কাঠের দোতলার ঘরে সুভাষ ও মনা তাঁদের পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। দোকানের আগুন খুব দ্রুত দোতলায় সুভাষদের ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। ১০ মিনিটের মধ্যেই ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিটের কর্মীরা ঘটনাস্থলে এসে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করেন। প্রায় দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে ওই ঘর থেকে একে একে পাঁচটি লাশ উদ্ধার করা হয়। অগ্নিকাণ্ডের সময় জুতার দোকানের শাটার বন্ধ ছিল।

মৌলভীবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক মো. আব্দুল্লাহ হারুন পাশা কালের কণ্ঠকে বলেন, ঘরের ভেতরে একটি গ্যাস রাইজার রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, শর্ট সার্কিটের পর গ্যাস রাইজার বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ঘর থেকে বের হওয়ার রাস্তা ছিল দোকানের ভেতর দিয়ে। আর শাটার বন্ধ থাকায় নিহতরা সেখানে আটকা পড়েন।

জানা গেছে, যাঁর নামে এই জুতার দোকানের নাম, সেই পিংকী রায়ের বিয়ে ছিল গত ২২ জানুয়ারি। সুভাষের বড় মেয়ে পিংকী। গত সোমবার ছিল বউভাত। বিয়ে উপলক্ষে দোকান ও ওপরের বাসায় লাইটিংসহ সাজানো হয়েছিল। বউভাত উপলক্ষে এসেছিল অনেক আত্মীয়-স্বজন। আত্মীয়-স্বজনের কেউ কেউ দোকানের ওপরে বাসায় উঠেছিল। কেউ কেউ ওঠে মোস্তফাপুর ইউনিয়নের গন্ধর্বপুরে তাদের গ্রামের বাড়িতে। মেয়ের বউভাত শেষে বাসায় ১২ জন সদস্য অবস্থান করে। গতকাল সকালে নিচতলায় তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। বিয়ের অনুষ্ঠানাদি শেষে ক্লান্ত সবাই তখন ঘুমে ছিল। আগুন লাগার ঘটনা টের পেয়ে আশপাশের বাসিন্দাদের সহায়তায় সাতজন প্রাণ নিয়ে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন, কিন্তু ভয়াবহ আগুনের ভেতর আটকা পড়ে পাঁচজন পুড়ে ঘটনাস্থলেই অঙ্গার হয়ে যান।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঘটনাস্থলের পাশের একটি ভবনের সিঁড়িতে নিহত সুভাষ রায়ের স্বজনরা বিলাপ করছে। স্ত্রী ও মেয়ের মৃত্যুতে সজল রায় অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন। ভিড় করে থাকা মানুষের ভেতর তিনি এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে বলছিলেন, ‘আমি ভালো আছি, আমি ভালো আছি।’

মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, পুলিশ ফায়ার সার্ভিসকে সহায়তা করেছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় আগুন পাশের বিল্ডিংগুলোতে ছড়ায়নি। এর পরও দুঃখজনক হচ্ছে, একটি পরিবারের পাঁচজন প্রাণ হারাল।

মৌলভীবাজার পৌরসভার মেয়র মো. ফজলুর রহমান বলেন, ‘মৌলভীবাজারে অতীতে অগ্নিকাণ্ডে এভাবে এত প্রাণহানি হয়নি। এটা আমাদের জন্য একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা।’

অগ্নিকাণ্ডের বিষয়টি তদন্তের জন্য জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তানিয়া সুলতানাকে প্রধান করে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মল্লিকা দে জানান, এ ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে এক লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে।

মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. আহমদ ফয়সল জামান বলেন, ‘দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পাঁচটি লাশ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। আমরা ময়নাতদন্ত করে বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যে স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করেছি।’

গতকাল সন্ধ্যায় মৌলভীবাজার শহরের সৈয়ারপুর এলাকার মনু নদের তীরের শ্মশানঘাটে পৃথক চিতায় পাঁচটি লাশের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা