kalerkantho

শনিবার । ১০ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৮ জমাদিউস সানি ১৪৪১

হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক

এস এম আজাদ   

২৯ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক

রাজধানীর কামরাঙ্গীর চরের রসুলপুরের বিদ্যুৎ অফিসের গলি। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে পথচারীদের মধ্যে একজনকে হঠাৎ দাঁড়িয়ে যেতে দেখা গেল। তার দিকে এগিয়ে গেল তিন ব্যক্তি। গোল হয়ে কিছুক্ষণ কথা বলার পর তারা দুই দিকে চলে গেল। অনুসরণ করে তাদের একজনের সঙ্গে কথা বলেন এ প্রতিবেদক।

মাসুদ নাম জানিয়ে ওই যুবক বললেন, ‘ভাই তাড়াতাড়ি চইলা যাইবো। মাল নিছি।’ ‘কী মাল?’ এ প্রশ্নের জবাবে বললেন, ‘গুটি, বাবা। বোঝেন তো সবই!’ কিভাবে পাওয়া যাবে—প্রশ্ন করা হলে মাসুদ বলেন, ‘সবখানেই পাওয়া যায়। লাইন লাগাইয়া আসতে হইবে। এমনে পাইবেন না।’

গত শনিবার সন্ধ্যায় সরেজমিনে গিয়ে এভাবেই মাসুদ নামের ওই যুবকের সঙ্গে দেখা ও কথা হয়। তিনি জানালেন, রাত যত গভীর হয় ভাসমান বিক্রেতা ও ক্রেতাদের ভিড় ততই বাড়ে। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে রাস্তায় বা নির্দিষ্ট কোনো স্থানে হাতবদল হয় ইয়াবার।

কয়েকজন মাদকসেবী ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কামরাঙ্গীর চরের অর্ধশতাধিক স্থানে ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা ও ফেনসিডিল কারবার চলছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুলিশ খুচরা বিক্রেতা ও মাদকসেবীদের গ্রেপ্তার করলেও বড় কারবারিরা আছে আড়ালে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড পর্যায়ের কতিপয় নেতা মাদক কারবারের হোতা। তাঁরা কাউন্সিলরসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ঘনিষ্ঠ বলেও অভিযোগ এলাকাবাসীর।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে কামরাঙ্গীর চর থানা এলাকা। এখানে অন্যতম সমস্যা মাদক। বিশেষ অভিযানেও এখানকার মাদক কারবারে ভাটা পড়েনি। সন্তানদের নিয়ে উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকেন অভিভাবকরা। সে কারণে এবারের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মাদক সমস্যাটি সামনে চলে এসেছে।

একাধিক মাদকসেবী, বিক্রেতা ও ভুক্তভোগী জানান, প্রতিদিন ভোরে পূর্ব রসুলপুর ২ নম্বর ব্রিজ এলাকা দিয়ে কামরাঙ্গীর চরে ইয়াবাসহ অন্য মাদকদ্রব্য ঢুকছে। পিকআপ ভ্যান ও মোটরসাইকেলে করে মাদকদ্রব্য আসে। এ ছাড়া কেরানীগঞ্জের কালন্দী থেকে নৌকায় কলামোড়া ঘাট হয়ে মাদক ঢুকছে। মাদক কারবারিরা নির্দিষ্ট স্থানে বসে বিক্রি করে না এবং বাসায় মাদক রাখে না। এলাকার বেশ কিছু গ্যারেজে বিক্রি হয় ইয়াবা ও গাঁজা।

ওই সূত্রগুলো বলছে, ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব রসুলপুরের ৫ ও ৬ নম্বর সড়কের উত্তর খালপাড় সড়কে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করেন ইয়াবার ‘ডিলার’ বিপ্লব। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেনের সঙ্গে রয়েছে বিপ্লবের ঘনিষ্ঠতা।

রসুলপুরের ৭ ও ৮ নম্বর গলির নদীর পারসহ আশপাশে ইয়াবার কারবার নিয়ন্ত্রণ করছেন সিরাজ তালুকদার ওরফে বাবা সিরাজ ওরফে টোকাই সিরাজ। ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক পরিচয়ে তিনি এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করেন। তিনিও কাউন্সিলর হোসেনের ঘনিষ্ঠ বলেই এলাকাবাসী জানায়। অভিযোগ সম্পর্কে সিরাজ তালুকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি কখনোই মাদকের সঙ্গে ছিলাম না। আমার বিরুদ্ধে একটি মহল অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমি মাদকের লোক ধরিয়ে দিয়েছি।’

৭ ও ৮ নম্বর সড়ক ও আশপাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেন ‘ডিলার’ আহমেদ।

পূর্ব রসুলপুরে ৯ নম্বর গলির দক্ষিণে মুক্তির বাড়ির পাশে ইন্টারনেটের ব্যবসার আড়ালে কারবার করেন আলমগীর হোসেন। ৫৬ ওয়ার্ড যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আলমগীরের বিরুদ্ধে আগে মামলাও হয়। জানতে চাইলে আলমগীর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি মাদক কারবারে জড়িত না।’

একই ওয়ার্ডের যুবলীগের সহসম্পাদক সোনা মিয়া, তাঁর ছেলে মাসুদ, স্ত্রী ও শ্যালক নসু বড় মাদক কারবারি। নসুর স্ত্রী ও ভাই জালালও মাদক কারবারে জড়িত।

৫৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মামুনের ভাই নাদিম এলাকার চিহ্নিত কারবারি।

জানতে চাইলে ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী মোহাম্মদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে অনেকেই রাজনীতি করে। কিছু লোক এগুলো করতে পারে। তবে জানলে এদের আমি প্রশ্রয় দিই না। আমি পাঁচ বছর মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করেছি। এবার নির্বাচিত হলে পঞ্চায়েত কমিটি করে সচেতনতার কাজ করব।’

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কামরাঙ্গীর চরে তিন নারী, যাঁরা ‘মাদক সম্রাজ্ঞী’ হিসেবে পরিচিত—তাঁদের পুরো পরিবার মাদক কারবারে জড়িত। একজন হলেন রনি মার্কেট মোড়ের বিউটি। স্বামী রাজ্জাক, দুই মেয়েজামাই ও ভাই শামছুকে নিয়ে কারবার চালান তিনি। প্রায়ই গ্রেপ্তার হলেও জামিনে ছাড়া পেয়ে কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন। আরেকজন পশ্চিম রসুলপুরের বি-ব্লকের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ১৬ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা শাহিনুর বেগম ওরফে দিনারা ওরফে মিনারা ওরফে শাহনাজ বেগম। তিনি কামরাঙ্গীর চর ও নিউ মার্কেট এলাকায় মাদক কারবার করেন। তাঁর স্বামীর নাম বাবু ওরফে মোবাইল বাবু। নয়াগাঁও ২৫২ নম্বর মুড়ির ফ্যাক্টরির পাশে থেকে কারবার করেন খুরশিদা বেগম ওরফে খুশি ও তাঁর বোন হাসি। স্থানীয় লোকজন বলছে, অভিযানের পর দুই বোন গাঢাকা দিয়েছেন।

রনি মার্কেটের আলোড়ন স্কুল গলির মনির হোসেন শাকিল রহমতবাগে ছাত্রলীগকর্মী পরিচয় দিয়ে মাদক কারবার করেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বুড়িগঙ্গা গণপাঠাগারে বই পড়ার আড়ালে মাদক সেবন ও বিক্রি চলছে। ৫৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী সাইদুল ইসলাম মাদবরের ঘনিষ্ঠ এসব কারবারি। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি প্রশাসনের সঙ্গে মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করি। কোনো মাদক কারবারিকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। এবার নির্বাচিত হলে পরিবেশ আরো ভালো করতে কাজ করব।’

৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইদুর রহমান রতন বলেন, ‘কেউ কেউ মাদক কারবারিদের শেল্টার দিচ্ছেন। এ কারণে এলাকার মাদক দূর হচ্ছে না।’

কামরাঙ্গীর চর থানার ওসি মশিউর রহমান বলেন, ‘এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ। বেশির ভাগ মানুষই নিম্ন আয়ের। এখানে গোপনে মাদক কারবার চলছে। অনেক মাদকসেবীও আছে। এখন প্রতি মাসে ৫০ থেকে ৬০টি মামলা হয়।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা