kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৭ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৪১

দুই পরিবারে বন্দি আ. লীগ বিএনপিতে অন্তঃকোন্দল

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল    

২৭ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দুই পরিবারে বন্দি আ. লীগ বিএনপিতে অন্তঃকোন্দল

প্রভাবশালী দুই পরিবারের হাতে ২৭ বছর ধরে ‘বন্দি’ হয়ে আছে বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগ। বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু প্রায় ২৭ বছর ধরে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বে। একই সময় ধরে সাধারণ সম্পাদক পদে আছেন জাহাঙ্গীর কবীর। পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়রা দখল করে সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদ। ক্ষমতাসীন দলটি পরিবারকেন্দ্রিক হয়ে পড়ায় এবং সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে বিরোধ ঘিরে সংগঠনের নিবেদিত নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ-হতাশা বিরাজ করছে।

অন্যদিকে অন্তঃকোন্দলে জেরবার বরগুনা বিএনপি। বিশেষত জেলার নবগঠিত কমিটি নিয়ে নেতাকর্মীদের মাঝে দ্বন্দ্ব-বিভেদ ও হতাশা বিরাজ করছে। এই অন্তর্বিভেদের কারণে দলটি মাঠেও সেভাবে তৎপরতা দেখাতে পারছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এমপির স্ত্রী মাধবী দেবনাথ জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। তাঁদের একমাত্র ছেলে সুনাম দেবনাথ পারিবারিক পরিচয়ে রাজনীতিতে এসেই হয়ে গেছেন জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক। সুনামের শ্বশুর অমূল্য কৃষ্ণ তালুকদার ওরফে নন্দ তালুকদার জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ। চাচাতো শ্বশুর সুবল কৃষ্ণ তালুকদার জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক। আর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সংসদ সদস্যের ভায়রা সিদ্দিকুর রহমান।

অন্যদিকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বরগুনা চেম্বার অব কমার্স সভাপতি জাহাঙ্গীর কবীরও প্রায় ২৭ বছর ধরে একই পদে আছেন। দুই ভাই, দুই ভাগ্নে, দুই চাচাতো ভাই জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদ দখল করে আছেন। তাঁর বড় ছেলে রুবায়েদ আদনান জেলা আওয়ামী লীগের উপপ্রচার সম্পাদক। ছোট ছেলে জুবায়ের আদনান অনিক জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি। তাঁর স্ত্রী ইয়াসমিন কবীর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন।

এ ছাড়া জাহাঙ্গীর কবীরের বড় ভাই আলমগীর কবীর পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি, ছোট ভাই হুমায়ুন কবীর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। চাচাতো ভাই গোলাম আহাদ সোহাগ সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। আরেক চাচাতো ভাই তরিকুল ইসলাম বাবলু জেলা আওয়ামী লীগের পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক। চাচাতো ভাই ইমাম হোসেন রোকন জেলা যুবলীগের সহসভাপতি। তিন ভাগ্নের মধ্যে ইমাম হোসেন শিপন জেলা যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। তারিকুল ইসলাম টিটু পৌর ছাত্রলীগের সভাপতি। লাবলু মোল্লা সদর উপজেলার ধলুয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। নিকটাত্মীয় অ্যাডভোকেট আ. খালেক মাস্টার জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা।

এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীর কবীর গতকাল রবিবার মোবাইল ফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজনৈতিক পরিবার হিসেবে আমাদের পরিচিতি জেলা ছাড়িয়ে বিভাগজুড়ে। একসময় আওয়ামী লীগ বলতে আমাদের পরিবারকেই বোঝানো হতো। আমাদের পরিবারের ওপর ভর করেই শম্ভু বাবু বারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসছেন। আমাদের পরিবারকে বাদ দিলে বরগুনায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী খুঁজে পাবেন না। যোগ্যতার ভিত্তিতেই পরিবারের একাধিক সদস্য আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন।’

দীর্ঘ সময় ধরে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কেন্দ্র কমিটি গঠন করে বারবার দায়িত্ব দেয় বলেই এ পদে এখনো রয়েছি। তবে যোগ্য কেউ এলে নিজ থেকেই দায়িত্ব ছেড়ে দেব। সে রকম ব্যক্তি পাচ্ছি না।’

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এমপির মোবাইল ফোনে গতকাল একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফোনে এসএমএস পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। সুনাম দেবনাথও ফোন রিসিভ করেননি।

দলে ক্ষোভ-হতাশা : জেলা আওয়ামী লীগ এভাবে ২৭ বছর ধরে দুই পরিবারে বন্দি হয়ে থাকায় সংগঠন ঘিরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে তরুণ নেতৃত্ব। জেলা ছাত্রলীগ থেকে শুরু করে যুবলীগ হয়ে জেলা আওয়ামী লীগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসা অনেকেই হতাশা ব্যক্ত করেছেন। হতাশা আছে তৃণমূলেও।

কেন্দ্র থেকে জেলা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনের জন্য ১ নভেম্বরের মধ্যে বর্ধিত সভা এবং ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে সম্মেলনের নির্দেশনা ছিল। কিন্তু আকস্মিকভাবে তা স্থগিত করা হয়েছে। এ নিয়ে ক্ষোভ আর হতাশা প্রকাশ করেছেন জেলা, উপজেলা ও তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

কাউন্সিল প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীর কবীর বলেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে কমিটি গঠনের জন্য কেন্দ্র থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে উপজেলা ও ইউনিয়ন মিলে প্রায় ৫০ ভাগ কমিটি গঠন করা হয়েছে। আসছে কাউন্সিলে গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আসতে পারে।       

নতুন নেতৃত্ব তৈরিতে অন্তরায় : অ্যাডভোকেট শাহ মো. ওয়ালী উল্লাহ অলি একসময় জেলা ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু পারিবারিক জোর না থাকায় তিনি পিছিয়ে পড়েছেন। তাঁকে করা হয়েছে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। আর একই কমিটির সভাপতি করা হয়েছে এমপি শম্ভুর ভায়রা সিদ্দিকুর রহমানকে। একসময় যার পরিচয় ছিল শম্ভুর ক্যাডার হিসেবে। অভিযোগ রয়েছে, বিগত উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ভোট করেও শুধু এমপির বিরোধিতায় ওয়ালী উল্লাহ হেরে যান।

বিগত পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মেয়র পদে মনোনয়ন পান জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জেলা যুবলীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান মহারাজ। তাঁর পরাজয়ের পেছনেও এমপি শম্ভুর পরোক্ষ বিরোধিতা ছিল বলে নেতাকর্মীদের বড় একটা অংশের অভিযোগ।

জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম সরোয়ার টুকু বলেন, দু-একজন প্রভাবশালী নেতার আজ্ঞাবহ হতে না পারায় আর তাঁদের অনিয়ম-দুর্নীতি সমর্থন না করায় চাপের মুখে থাকতে হচ্ছে সব সময়। তিন বছর পরপর সম্মেলনের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত তরুণ ও দক্ষ নেতাদের নিয়ে কমিটি হওয়ার কথা। কিন্তু ২৭ বছরেও সভাপতি-সম্পাদকের পদে পরিবর্তন আসেনি। এতে নেতাকর্মীদের মধ্যে ভালো কাজে আগ্রহ থাকে না।

জেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও বরগুনা পৌরসভার দুইবারের নির্বাচিত মেয়র অ্যাডভোকেট মো. শাহজাহান বলেন, জেলার রাজনীতি মেধাশূন্য হয়ে পড়ছে। মেধা, স্বচ্ছতা ও সততার চেয়ে এখানে টাকার প্রভাব বেশি। আওয়ামী লীগের মতো একটি রাজনৈতিক দলে এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। 

বিএনপি : এদিকে জেলা বিএনপির নবগঠিত কমিটি নিয়ে রয়েছে অন্তঃকোন্দল। স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে এই কমিটি হয়নি। বরং কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনের নির্দেশে নজরুল ইসলামকে সভাপতি ও জাতীয় পার্টি থেকে বিএনপিতে যোগ দেওয়া আব্দুল হালিমকে সাধারণ সম্পাদক করে জেলা বিএনপির কমিটি দেওয়া হয়েছে। এতে জেলা বিএনপির একটি বড় অংশই ক্ষুব্ধ, হতাশ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা