kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৭ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৪১

জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলার পাশাপাশি কমবে বিদ্যুতের মূল্য

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ

নিখিল ভদ্র   

২৬ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত ও কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমানোর অন্যতম উপায় হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার। তাই নবায়ণযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে এ বিষয়ে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ২০২১ সালের মধ্যে এ খাত থেকে ১০ শতাংশ ও ২০৩১ সালে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে বিদ্যুতের মূল্য বহুলাংশে কমে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা বিদ্যুৎ পাওয়ার তিনটি উপায় হচ্ছে—সূর্য, বায়ু ও পানি। বাংলাদেশে অবারিত ও পর্যাপ্ত সূর্যালোক রয়েছে। এরই মধ্যে দেশে সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এ ছাড়া পানিবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ, পৌর বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, গোবর ও পোল্ট্রি বর্জ্য ব্যবহার করে বায়োগ্যাস এবং ধানের তুষ ও ইক্ষুর ছোবড়া থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদন শুরু হয়েছে। আর নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে বাংলাদেশের।

১৯৫৭ সালে চট্টগ্রামের কাপ্তাইয়ে কর্ণফুলী নদীর ওপর দেশের প্রথম পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে এ কাজ শুরু হয়। এ কেন্দ্রে ১৯৮৮ সালের অক্টোবর মাসে ৫০ মেগাওয়াট কাপলান টাইপের টার্বাইনসংবলিত চতুর্থ ও পঞ্চম ইউনিট স্থাপন করা হয়। যাতে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ২৩০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে সিলেটে বেসরকারি উদ্যোগে প্রথম সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন করা হয়। এরপর ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কম্পানি লিমিটেড (ইডকল) কর্তৃক সোলার হোম সিস্টেম (এসএইচএস) কর্মসূচি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। ১৯৯৬ সালে  এসএইচএস চালু হওয়ার পর থেকে এটি বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নবায়নযোগ্য জ্বালানি কর্মসূচি। এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার মিলিয়ন সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে।

গত নভেম্বরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব মোকাবেলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি সৌরশক্তির ক্ষেত্রগুলো গতিশীল করতে গবেষণা, উন্নয়ন ও স্থানান্তরের নতুন দ্বার উন্মোচনে সরকার সচেষ্ট রয়েছে। এরই মধ্যে সরকার এ খাতে ছোট, মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি চালু করেছে। গ্রামীণ পরিবারে গত সাত বছরে ৩৬ লাখ সোলার হোম সিস্টেমের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রায় দুই কোটি জনগণ এ বিদ্যুতের সুফল ভোগ করছে। গ্রামাঞ্চলে সৌরবিদ্যুতে রান্না ও শহরে সড়কবাতি জ্বালানোর ফলে প্রান্তিক পর্যায়ে কার্বন নির্গমন হ্রাসের পাশাপাশি দেশে জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সারা বিশ্বে সৌরবিদ্যুতের প্রযুক্তি দ্রুত উন্নত হচ্ছে। প্যানেলগুলোর দক্ষতা (এফিশিয়েন্সি) বাড়ছে। ফলে অল্প জায়গা ব্যবহার করে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়তেই থাকবে। তাই দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উন্নতির জন্য একটি গবেষণা কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ও বিনিয়োগকারীদের সরকার বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা প্রদান করছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংক, ইডকল ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থায়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কিছু নবায়নযোগ্য জ্বালানিপণ্য, যেমন—সোলার প্যানেল, সোলার প্যানেল প্রস্তুতের উপাদান, চার্জ কন্ট্রোলার, ইনভার্টার, এলইডি লাইট, সৌরচালিত বাতি এবং বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর সরকার শুল্ক অব্যাহতিমূলক প্রণোদনা দেওয়া শুরু করেছে।

সরকারের নানামুখী পদক্ষেপে ২০৫০ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে দেশের পক্ষে নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর হয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে। এ বিষয়ে কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ (সিপিডি), ব্রেড ফর দ্য ওয়ার্ল্ড, ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনি এবং ওয়ার্ল্ড ফিউচার কাউন্সিল ২০১৮ সালে একটি গবেষণা চালায়। সেখানে বলা হয়েছে, দেশে ১৯১ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। আর বাংলাদেশের ভূ-ভাগে ও সমুদ্রাঞ্চলে প্রায় ১৫০ গিগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এ ছাড়া ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের পরিবহন খাতের ৪০ শতাংশকে বিদ্যুতায়ন করা সম্ভব বলেও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণার তথ্য-উপাত্ত ও সুপারিশ সম্পর্কে কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপের (সিডিপি) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ জাহাঙ্গীর হাসান মাসুম কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশের জন্য শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্জন সম্ভব। ২০৫০ সালের মধ্যে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারলে ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তিনি আরো বলেন, বিদ্যুতের দাম প্রতি কিলোওয়াট এখন ১৫ টাকা। কিন্তু নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটাতে পারলে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুৎ তিন থেকে চার টাকায় পাওয়া সম্ভব।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে সরকারের আন্তরিকতার কথা জানিয়ে সংসদীয় কমিটির সভাপতি শহীদুজ্জামান সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০৫০ সাল নাগাদ আমাদের অনেক প্রাকৃতিক জ্বালানি শেষ হয়ে যাবে। এ জন্য আমাদের এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে সরকার খুবই আন্তরিক। সরকার এ জন্য প্রতিটি বিকল্পকে কাজে লাগাতে চায়। তাই সব স্টেকহোল্ডারকে নিয়ে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা