kalerkantho

শনিবার । ১৬ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ৪ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা

কক্সবাজারে উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়ামের সন্ধান

মোস্তাফিজ নোমান, ত্রিশাল (ময়মনসিংহ)   

২৬ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কক্সবাজারে উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়ামের সন্ধান

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আশরাফ আলী সিদ্দিকীর নেতৃত্বে একদল গবেষক ১০ বছর ধরে গবেষণা করে কক্সবাজারের ভূ-গর্ভস্থ মাটি ও পানিতে উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়ামের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছেন; যা এর আগে সিলেট ও মৌলভীবাজারে প্রাপ্ত আকরিকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ উচ্চমানের। কক্সবাজারের মাটি ও পানির নমুনা সংগ্রহ করে জাপানে পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাঁদের এই গবেষণাপত্রটি গত ৯ জানুয়ারি বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান জার্নাল সায়েন্সডাইরেক্ট ডটকম-এ (গ্রাউন্ড ওয়াটার ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের মুখপত্র) প্রকাশিত হয়েছে।

কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান আশরাফ আলী সিদ্দিকীর নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, কক্সবাজারের ভূ-গর্ভস্থ মাটিতে থাকা জিরকন ও মোনাজাইটে ৯৯০ পিপিএম মাত্রারও বেশি ইউরেনিয়াম রয়েছে। ওই মাটিতে থাকা জিরকন ও মোনাজাইটে ৮৫০ দশমিক ৭ পিপিএম থেকে ৯৯০ দশমিক ৬ পিপিএম মাত্রার ইউরেনিয়ামের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়।

অধ্যাপক ড. আশরাফ জানান, ওই গবেষণায় অনুসন্ধানের জন্য ভূ-পৃষ্ঠের সর্বনিম্ন ১৮ দশমিক ৯ মিটার গভীর থেকে মাটি সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে তিন মিটারের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি জিরকন ও মোনাজাইট পাওয়া যায়। কক্সবাজারের মাটিতে ১ দশমিক ১ পিপিএম থেকে ৩৩ দশমিক ৪ পিপিএম পর্যন্ত ইউরেনিয়াম এবং ৬ দশমিক ৩ পিপিএম থেকে ২০২ দশমিক ৩ পিপিএম থোরিয়াম পাওয়া যায়। আর এই মাটিতে মোনাজাইটের পরিমাণ ৩.২৮ শতাংশ এবং জিরকনের পরিমাণ ২.৩৬ শতাংশ। আর মোনাজাইট এবং জিরকন কণা নিজেই ৩৩৯৫ দশমিক ৯ পিপিএম থেকে ৩৯৩৭ দশমিক ৫ পিপিএম পর্যন্ত থোরিয়াম এবং ৮৫০ দশমিক ৭ থেকে ৯৯০ দশমিক ৬ পিপিএম পর্যন্ত ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ, যা সাধারণ মাত্রার তুলনায় অনেক সমৃদ্ধ। সাধারণ মাত্রায় থোরিয়াম থাকে ২৭৫ দশমিক ৫ পিপিএম থেকে ৩১৮ দশমিক ৪ পিপিএম এবং ইউরেনিয়াম থাকে ২৫৬ দশমিক ৩ পিপিএম থেকে ২৯০ দশমিক ৫ পিপিএম পর্যন্ত। এটা বেশ সমৃদ্ধ এবং কম গভীরতায় থাকায় উত্তোলনও হবে খুব লাভজনক।

২০১০ সালের শুরুর দিকে কক্সবাজারের ভূ-গর্ভস্থ পানীয় জলের রং পরিবর্তন ও পানি ঘোলাটে হওয়ার কারণ পরীক্ষা করতে গিয়ে পানির  নমুনা পরীক্ষা করে ১০ পিপিএম মাত্রার ইউরেনিয়ামের অস্তিত্ব পান বিজ্ঞানী ড. আশরাফ, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) নির্ধারিত সহনীয় মাত্রার চেয়ে ৫ গুণ বেশি। আর এ ফলাফলের পরই কক্সবাজারের মাটিতে উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম থাকার সম্ভাবনা থেকে এই গবেষণা চালানো হয়।

ড. আশরাফ সিদ্দিকী জানান, তাঁর গবেষণায় মোনাজাইটের মধ্যে অত্যন্ত উচ্চমাত্রার (১৬ শতাংশ) ইউরেনিয়ামের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। ইউরেনিয়াম একটি ঘন, রুপালি-সাদা, সামান্য প্যারাম্যাগনেটিক তেজস্ক্রিয় ধাতু। এটি নমনীয় এবং ক্ষতিকারকও। ইউরেনিয়ামের কালো স্তর অক্সাইডের মাধ্যমে বাতাসকে দূষিত করে। এটি প্রাকৃতিকভাবে তৈরি ভারী ধাতু, যা ৭৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঘনীভূত শক্তির প্রাচুর্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সাধারণত দুই থেকে চার পিপিএম ঘনত্বের পাথরেই ইউরেনিয়াম দেখা যায়। ইউরেনিয়াম সমুদ্রের পানিতে জন্ম নেয় এবং সেখান থেকেও আহরণ করা যায়। তবে ভূ-পৃষ্ঠের নিচে বা পানিতে, যেখানেই ইউরেনিয়াম থাকুক না কেন সেখান থেকে তেজস্ক্রিয়তা বের হয়। এতে উপাদানটি চিহ্নিত করা সহজ। তবে কক্সবাজারের ভূ-গর্ভস্থ মাটিতে ইউরেনিয়ামের কী পরিমাণ মজুদ রয়েছে বা সাগরের পানিতে কী মাত্রায় রয়েছে, তা নিয়ে কোনো গবেষণা হয়নি।

বিশ্বে ভিন্ন মাত্রার ইউরেনিয়াম ভিন্ন ভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। প্রকৃতিতে পাওয়া ইউরেনিয়াম পারমাণবিক চুল্লিতে সমৃদ্ধ করে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করা হয়। প্রকৃতিতে পাওয়া ইউরেনিয়ামকে ০.৭ শতাংশ থেকে ৩ দশমিক ৭ পর্যন্ত এবং ৩ দশমিক ৭ থেকে ৫ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ করা হয়। তবে ২০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে বলা হয় উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (এইচআরইউ)। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রচুর পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দরকার। আর সেই ইউরেনিয়ামের জোগান দেশ থেকে আসতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

গবেষক ড. সিদ্দিকীর মতে, কক্সবাজারে প্রাথমিক অনুসন্ধানে যা পাওয়া গেছে তা খুবই উৎসাহব্যঞ্জক। গত বছর চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় চালানো জরিপেও মাটিতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি তেজস্ক্রিয় পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যার মধ্যে ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম ও রেডিয়াম রয়েছে। এসব জরিপ চট্টগ্রাম উপকূলের মাটিতেও ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম থাকার জোরালো ইঙ্গিত দিচ্ছে। দেশের অন্যান্য সমুদ্র উপকূলীয় এলাকাতেও এই খনিজ পাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।

এই গবেষণায় দেশ-বিদেশের আরো যুক্ত ছিলেন নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক প্রসূন ভট্টাচার্য্য ও এস বিপুলেন্দু বসাক,  জিওলজিক্যাল সার্ভে অব জাপানের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড ইন্ডাস্ট্রিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির শিক্ষক ইয়োশিআকি কোন, জাপানের ওসাকা সিটি ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব সায়েন্সের শিক্ষক হারু মাসুদা ও কেজি শিনোদা, দশিশা ইউনিভার্সিটির ফ্যাকাল্টি অব সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষক ইউরিকো ইউকো, তুকোশিমা ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব টেকনোলজির শিক্ষক রিও আনমা এবং সুইডেনের কেটিএস-ইন্টারন্যাশনাল গ্রাউন্ড ওয়াটার আর্সেনিক রিচার্স গ্রুপের ডিপার্টমেন্ট অব সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের গবেষকরা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা