kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

সর্বনাশা মাদক

শাহ আলী যেন এক মাদকপল্লী

সক্রিয় চিহ্নিত কারবারিরাও
রাজনীতিক ও পুলিশের মেলবন্ধন

এস এম আজাদ   

২৫ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শাহ আলী যেন এক মাদকপল্লী

রাজধানীর মিরপুরের কমার্স কলেজের পাশেই ছোট বস্তি। স্থানীয়ভাবে ঝিলপাড় ও হাজির বস্তি—দুই নামেই পরিচিত। দুপুরে বস্তির শতাধিক ঘরের সামনের সড়কটি ব্যস্ত। পাশে রিকশার গ্যারেজ। ফুটপাত ধরে হাঁটছে পথচারীরা। পাশে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশের একটি টহল গাড়ি। একটু দূরে কয়েকজন তরুণকে দেখা গেল জটলারত অবস্থায়। রাস্তার উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে কানাঘুষা করছে আরো কয়েকজন। রাজধানীর যেকোনো ব্যস্ত এলাকার রাস্তাঘাটের পাশের পরিবেশের চেয়ে একটু যেন অন্য রকম আবহ এখানে। জানতে চাইলে পাশের এক চায়ের দোকানদার বললেন, ‘ভাই, বোঝেন না! কারবার চলতাছে। পুলিশের থেকে দূরে সইরা। তবে পুলিশও দেখছে। দেখেন পাশেই মাল খায়!’ দোকানদারের ইশারায় অনুসরণ করে দেখা গেল বস্তির উল্টো দিকে ফুটপাতে মুখোমুখি বসে আছে দুই ব্যক্তি। একজন চাদর মোড়া দিয়ে। কাছে যেতেই দেখা গেল দুজন সিগারেটের প্যাকেটে পাউডারজাতীয় কিছু নিয়ে আগুন জ্বলিয়ে সেবনের চেষ্টা করছে। কথা বলে জানা গেল একজনের নাম সালাম, অন্যজন বাবুল। মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের কাছে কাঁচাবাজারের কর্মী পরিচয় দিয়ে সালাম বলেন, ‘হিরু (হেরোইন) ১২০ ট্যাকা পোঁটলা কিনছি বস্তি থেইকা। যার কাছ থেইকা কিনছি তাঁর নাম জানি না।’ বাবুল এসেছেন দারুসসালাম থেকে। তাঁরা একে অন্যকে চেনেন না। শুধু মাদক সেবনের জন্য এখানে এসে সন্ধি গড়েছেন।

গত মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে পুলিশের সামনে এভাবেই মাদক বাণিজ্য চলতে দেখা গেল ঝিলপাড় (হাজির) বস্তিতে। স্থানীয়রা বলছে, এটি রোজকার চিত্র। এ স্পটের নিয়ন্ত্রক দুলাল গাঢাকা দিলেও তাঁর সহযোগীরা এখনো পুলিশকে ম্যানেজ করে প্রকাশ্যে কারবার চালাচ্ছে। সরেজমিন জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৮ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের আংশিক এলাকার শাহ আলী থানায় মাদকের আখড়াগুলো এখন জমজমাট। রাজনৈতিক দলের নেতা ও পুলিশের কতিপয় কর্মকর্তা কারবারিদের মদদ জোগাচ্ছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং এলাকার পরিবেশ নিয়ে উৎকণ্ঠিত এলাকাবাসী। তারা আসন্ন সিটি নির্বাচনের প্রার্থীদের কাছেও মাদক কারবার বন্ধের অনুরোধ জানিয়েছে। তবে জনগণের এসব অনুরোধে জনপ্রতিনিধি হতে ব্যাকুল নেতাদের কেউ কোনো নড়াচড়া করছেন না।

হাজীর বস্তির পাশের বাসিন্দারা জানায়, শীর্ষ কারবারি দুলাল নারায়ণঞ্জের সোনারগাঁ বসবাস করছেন। সেখানে বসেই এখানকার দৈনিক বেচাবিক্রি তদারকি করছেন। তাঁর ছোট ভাই আউয়ারের স্ত্রী সুফি, তাঁদের মেয়ে ও মেয়ের জামাই এ কারবার নিয়ন্ত্রণ করেন। সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, রাইনখোলার নিউ সি-ব্লকের ১৭ নম্বর সড়কে সরু গলির মধ্যে বাড়ি থেকেই মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করছেন কুখ্যাত মাদকসম্রাজ্ঞী ফাতেমা ওরফে ফতে। তাঁর ছেলে জয় এলাকায় ছাত্রলীগ নেতা পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। এলাকাটি শাহ আলী থানা থেকে মাত্র ২০০ গজ দূরে। স্থানীয়রা বলছে, মাদকবিরোধী অভিযানেও বহাল তবিয়তে ছিলেন ফতে, পুলিশকে নিয়মিত মাসোয়ারা দিয়ে আড়ালেই থেকেছেন তিনি। নিউ সি-ব্লকের ১৭ নম্বর সড়কে চারটি বাড়ি আছে ফতের। দুটি বাড়িতে গোপনে ঢোকা ও বের হওয়ার রাস্তাও করেছেন।

কাজীফুরী বাজারে শাহ আলী থানা যুব মহিলা লীগের সভাপতি সামসুন্নাহার বুজির অফিস ও বাসাকে কেন্দ্র করে ইয়াবার কারবার চলে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। তবে বুজি বলেন, ‘এগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমার প্রতিপক্ষ এ গুজব ছড়াচ্ছে।’ এ থানার সর্বত্রই মাদকের ছড়াছড়ি। মাদকসেবী ও কারবারিদের অনেকেই শাহ আলী থানা এলাকাকে এক নিরাপদ মাদকপল্লী হিসেবে মনে করে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের ৮ নম্বর ওয়ার্ড সাধারণ সম্পাদক বাবুল তালুকদারের মদদে এলাকায় মাদক কারবার চলে। কারবারিদের সঙ্গে তাঁর সখ্য দেখা যায় প্রকাশ্যে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাবুল তালুকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ অভিযোগ সঠিক নয়। আমি মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করার কারণে মাদক কারবারিরাই ষড়যন্ত্র করে আমার নাম বলে।’ মাদক কারবারিদের আপনার সঙ্গে দেখা যায়—এমন তথ্যের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটাও ঠিক না।’

জানা গেছে, শাহ আলী মাজারকে কেন্দ্র করে মাদক কারবার করছে একটি চক্র। প্রতি রাতে সেখানে ভাসমান মাদক বিক্রেতারা জড়ো হয়। মধ্যবয়সী নারীদের দিয়ে এ কারবার করেন হোসেন, তাঁর স্ত্রী ইতি, সজীব, রাসেল ও আসমা। ৮ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর প্রার্থী আবুল কাশেম মোল্লা বলেন, ‘আমি সব সময় মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করি। এখন অনেকটাই কমে গেছে। প্রশাসনকে নিয়ে সামনের দিকেও কাজ করব।’ কাশেমের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী তাইজুল ইসলাম চৌধুরীর মঙ্গে যোগাযোগের জন্য দুই দিন চেষ্টা করলে তিনি একবার ফোন ধরেন। এলাকার মাদক সমস্যা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি ‘আমি নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত আছি’ বলে ফোন কেটে দেন। পরে ফোনে মেসেজ পাঠালেও কোনো জবাব দেননি তাইজুল।

শাহ আলী থানার ওসি সালাউদ্দিন মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন এখানে মাদক আখড়া নেই। গোপনে কেউ কেউ করে। প্রায়ই অভিযান, ব্লক রেইড হচ্ছে।’ ঝিলপাড় বস্তিতে কারবার চলার ব্যাপারে জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘ওই বস্তিতে ছোট কারবারিরা কারবার করছে বলে শুনি। সেখানকার দুলাল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থাকে। তাঁকে ধরার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর ভাই আলালকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’ নিউ সি-ক্লকের কারবারি ফতে ও কাউন্টার রাসেলের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে ওসি বলেন, ‘ফতেকে আমরা ধরতে পারছি না। তবে রাসেলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এঁদের সহযোগীরা হয়তো করে।’ নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রসঙ্গে ওসি বলেন, ‘কারো কাছে (মাদক) না পাওয়া গেলে বা আলামতসহ ধরা না গেলে মামলা করা যায় না।’ তিনি জানান, প্রতি মাসে গড়ে ১৫-২০টি মাদক মামলা হচ্ছে শাহ আলী থানায়। গত এক বছরে ২৫৯টি মামলায় ৩১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা