kalerkantho

বুধবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ১ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

ঢাবিতে চার শিক্ষার্থীকে ছাত্রলীগের নির্যাতন

► শিবিরকর্মী অভিযোগের প্রমাণ পায়নি পুলিশ
► ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ প্রতিবাদ মিছিল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি   

২৩ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ঢাবিতে চার শিক্ষার্থীকে ছাত্রলীগের নির্যাতন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হলের ৪ শিক্ষার্থীর ওপর নির্যাতন করার প্রতিবাদে গতকাল ক্যাম্পাস এলাকায় বিক্ষোভ করে সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্র ঐক্য। ছবি : কালের কণ্ঠ

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনার পর এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) হলে একই ধরনের অভিযোগে একই কায়দায় চার শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। ঢাবির শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে শিবিরকর্মী সন্দেহে চার শিক্ষার্থীকে বেদম মারধর করে পুলিশে দিয়েছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তবে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় গতকাল বুধবার মুচলেকা নিয়ে তাঁদের ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনার প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ মিছিল হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মুকিম

আহমেদ চৌধুরীকে ফোন করে গেস্টরুমে ডেকে আনেন হল ছাত্রলীগের সহসভাপতি আনোয়ার হোসেন। সেখান থেকে তাঁকে হল সংসদের কক্ষে নিয়ে কিছু স্ক্রিনশট দেখিয়ে শিবির করেন কি না জানতে চাওয়া হয়। মুকিম ওই সব স্ক্রিনশট তাঁর নয় বলে দাবি করতেই তাঁকে পেটাতে শুরু করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। হল সংসদের ভিপি সাইফুল্লাহ আব্বাছী অনন্ত, হল ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহিন আলম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমির হামজা, সহসভাপতি কামাল উদ্দিন রানাসহ দশ-পনেরোজন নেতাকর্মী লাঠি, হাতুড়ি, ক্রিকেট স্টাম্প ও রড দিয়ে মুকিমকে বেধড়ক মারধর করেন।

মুকিমকে পিটিয়ে মেঝেতে ফেলে রেখে পরে তাঁর মোবাইল ফোনে ‘যোগাযোগ তালিকায়’ নাম থাকা আরো তিনজনকে সেখানে ডেকে আনা হয়। তাঁরা হলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সানওয়ার হোসেন, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মিনহাজ উদ্দীন ও একই বর্ষের আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী আফসার উদ্দীন। তাঁদেরও শিবিরকর্মী আখ্যায়িত করে শুরু হয় মারধর। চেষ্টা চালানো হয় শিবিরকর্মী হিসেবে স্বীকারোক্তি আদায়ের।

ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের উপর্যুপরি নির্যাতনের শিকার হয়ে ওই চার শিক্ষার্থী মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। পরবর্তী সময়ে হলের আবাসিক শিক্ষক মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন এসে মুকিমের কক্ষ থেকে দুটি বই উদ্ধার করেন। তবে কী বই পাওয়া গেছে সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছুই জানানো হয়নি। আহত চার শিক্ষার্থীকে পরে রাত ২টার দিকে শাহবাগ থানা পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পুলিশ তাঁদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসা শেষে তাঁদের শাহবাগ থানায় আনা হয়। পরবর্তী সময়ে জিজ্ঞাসাবাদে শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় বিকেল ৩টার দিকে আহত শিক্ষার্থীদের ছেড়ে দেয় পুলিশ।

শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না পাওয়ায় ওই চার শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

মারধরের শিকার মুকিম চৌধুরী বলেন, “প্রতিদিনের মতো কালকেও হলে ছিলাম। রাত ১১টার দিকে আমাকে ফোন করে হলের গেস্টরুমে যেতে বলা হয়। আমি গেস্টরুমে যাই। পরে আমাকে নিয়ে হলের ভাইয়েরা ‘হল সংসদের’ কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে নিয়ে গিয়ে আমার নাম দিয়ে বানানো কিছু স্ক্রিনশট দেখিয়ে শিবির করি কি না জানতে চান তাঁরা। আমি সেগুলো দেখে তো অবাক। কারণ সেগুলো আমার চ্যাট লিস্টেই নেই। কিন্তু তাঁরা আমাকে হাতুড়ি, রড, স্টাম্প দিয়ে বেদম মারধর করেন। শিবিরের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’

আবাসিক শিক্ষক মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন মারধরের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘ওরা হলের মধ্যে থেকে আইনবিরোধী কাজ করেছে। একজন আরেকজনকে নিষিদ্ধ ধর্মভিত্তিক কাজে সম্পৃক্ত করছে। এ কারণে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় দেওয়া হয়েছে।’

হল শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমির হামজা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিবির সম্পৃক্ততার কারণে চারজনকে পুলিশে দেওয়া হয়েছে। একজনের কাছে জিহাদি বইও পাওয়া গেছে।’ মারধরের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘আমরা কোনো মারধর করিনি। তবে পুলিশ মেরে হাসপাতালে পাঠিয়েছে কি না জানি না। আর সেই দায়ভার তো আমাদের দিলে হবে না।’

প্রক্টর এ কে এম গোলাম রব্বানী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হল কর্তৃপক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে ওই শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় দেওয়া হয়েছিল। তবে বড় ধরনের কোনো সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’ মারধরের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি।’

এদিকে শিক্ষার্থী নির্যাতনের প্রতিবাদে গতকাল বিকেলে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে ‘সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্র ঐক্য’। প্রতিবাদ মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, হল ও প্রশাসনিক ভবন এলাকা প্রদক্ষিণ করে।

সমাবেশে ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, ‘আমি ডাকসুর ভিপি হয়েও ডাকসু ভবনে ছাত্রলীগের হাতে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছি। তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা কোথায়? ওরা চার শিক্ষার্থীকে আবরারের মতো পিটিয়েছে। হাতুড়ি দিয়ে, স্টাম্প দিয়ে পেটানো হয়েছে। এই চারজনের মধ্যে কেউ একজনের আবরারের মতো পরিণতিও হতে পারত।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা