kalerkantho

বুধবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ১ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে চুরি

ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা কর্তৃপক্ষের

অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি বলছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু খোয়া যায়নি
ভেতরের লোক জড়িত থাকার ধারণা তদন্তসংশ্লিষ্টদের

রেজোয়ান বিশ্বাস   

২৩ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



 ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা কর্তৃপক্ষের

রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে দুঃসাহসিক চুরির ঘটনার সাত দিন পরও তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো ক্লু বের করতে পারেননি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, কোনো দলিল, ভলিউম এমনকি গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র খোয়া যায়নি। এ অবস্থায় অভিযোগ উঠেছে, ভেতরের লোকজন জড়িত থাকায় ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার সাবেকুন নাহার গত সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শুরুতে আমাদের ধারণা ছিল যে অনেক দলিল, ভলিউম, বালাম বইসহ আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র চুরি হয়েছে। ঘটনার পরপরই মামলা দায়ের করার পাশাপাশি অফিসের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করি। তাঁরা কার্যালয়ের সব নথিপত্র ঘেঁটে আজ (সোমবার) বিকেলে একটি প্রতিবেদন দিয়েছেন। তাতে দলিল, ভলিউম ও অর্থসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র চুরির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। শুধু ডিভিআর কম্পিউটার হার্ডডিস্ক, সিপিইউ, ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরাসহ কিছু ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম চুরি হয়েছে।’

এর আগে রবিবার রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে গেলে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার সাবেকুন নাহার বলেছিলেন, ‘খুব চিন্তায় আছি। অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেছে। ঘটনায় জড়িতরা কেউ ধরা পড়েনি। তবে ভেতরের লোকজন জড়িত না থাকলে এমন ঘটনা সম্ভব নয়।’

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ঘটনার শুরু থেকেই বিপুল অঙ্কের টাকা, দলিল, কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক, ডিভিআর, রাউডার, ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম চুরি হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। বিপুল অঙ্কের নগদ টাকা চুরি হওয়ার আলোচনা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে পুলিশকে খোলাসা করে কিছু জানায়নি। এমনকি প্রকৃতপক্ষে সেখান থেকে কী কী চুরি হয়েছে তা-ও এখন আড়াল করার চেষ্টা চলছে। এ কারণে আলোচিত এ ঘটনা নিয়ে ব্যাপক রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনায় কমপ্লেক্সের লোকজনের সংশ্লিষ্টতা থাকাটা বিচিত্র নয়। তবে গুরুত্ব দিয়ে ঘটনা তদন্ত করে রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার এসআই বাবলুর রহমান বলেন, ‘রহস্য উদ্ঘাটনে নেমে প্রকৃতপক্ষে আমরা এখনো অন্ধকারে আছি। এটুকু বুঝতে পারছি, ঘটনা নিয়ে অনেক রহস্য রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করলেও রেজিস্ট্রেশন কার্যালয় থেকে প্রকৃতপক্ষে কী চুরি হয়েছে তা জানা যায়নি। রেজিস্ট্রেশন কার্যালয়ের কেউ এতে জড়িত আছে কি না তাও এখন পর্যন্ত অজানা। তিনি বলেন, ঘটনার পরপরই রেজিস্ট্রেশন কার্যালয়ের নিরাপত্তা বিভাগের তিনজনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে। তবে তাঁরা এখন পর্যন্ত ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেননি। জড়িত অন্য কাউকেও গ্রেপ্তার করা যায়নি।’

রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে গত সোমবার ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার বলেন, ‘আমরা চাই পুরো বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হোক। সে ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কেউ জড়িত থাকলে তাকেও ধরা হোক।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে সাবেকুন নাহার বলেন, গুরুত্বপূর্ণ অফিস হওয়া সত্ত্বেও এখানে জোরদার নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। দুই শিফটে চারজন নিরাপত্তারক্ষী দায়িত্ব পালন করেন। এটা ঠিক করার চেষ্টা চলছিল। এর মধ্যেই চুরির ঘটনা ঘটল। এখন নিরাপত্তাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা চলছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। তাঁরাও সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।

গত বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার ভোরের মধ্যে কোনো এক সময় চুরির ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার বাড্ডা রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার মনিরুল ইসলাম তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় একটি মামলা করেন। মামলার তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই চুরির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট অফিসকর্মীদের হাত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের এক কর্মকর্তাও বলেন, অফিসের লোকজনের সহযোগিতা ছাড়া এ ধরনের চুরি সম্ভব নয়।

জানা গেছে, দুর্বৃত্তরা কমপ্লেক্স ভবনের দোতলায় বাড্ডা ও তৃতীয় তলায় উত্তরা থানার সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের তালা ভেঙে কক্ষ দুটির স্টিলের আলমারি ও ড্রয়ার ভেঙে দলিলসহ গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র চুরি করে। পরে চারতলায় ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার সাবেকুন নাহারের অফিস কক্ষে ঢুকে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সেখান থেকে সিসি ক্যামেরা ও ডিবিআর নিয়ে যায়। এ কারণে সেখানকার সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ পাওয়া যায়নি। তবে কমপ্লেক্সের বাইরের একটি সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজে দুজনকে দেখা গেছে। পুলিশ ওই দুজনকে সন্দেহে রেখে রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছে।

ঘটনার পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ঘটনাস্থল থেকে হাত ও পায়ের ছাপের আলামত সংগ্রহ করেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও র‌্যাব ছায়া তদন্ত করছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা