kalerkantho

বুধবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ১ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

মহাসিং নদীতীরে ‘অক্ষত বাঁধ’

সমান বরাদ্দ এনে লুটের আয়োজন

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

২৩ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সমান বরাদ্দ এনে লুটের আয়োজন

দক্ষিণ সুনামগঞ্জের মহাসিং নদীতীরের তিনটি বাঁধ হাওরের ফসল রক্ষায় ভূমিকা রাখে। ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই এলাকার মন্ত্রী এম এ মান্নানের কঠোর নজরদারির কারণে হাওর রক্ষা বাঁধে ভালোই কাজ হয়েছিল। ফলে টেকসই বাঁধগুলো এবার অনেকটা অক্ষত রয়েছে। সেই অক্ষত বাঁধগুলোতে আংশিক বরাদ্দ দিয়ে এবার হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ করার সুযোগ থাকলেও পাউবো ও প্রশাসনের দুর্নীতিবাজ একটি চক্রের সবগুলো বাঁধেই সমান বরাদ্দ দিয়ে সরকারি টাকা লোপাটের আয়োজন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এদিকে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সম্প্রতি একটি সভায় হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ যথাযথভাবে শেষ করার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, দুর্নীতি হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। অন্যদিকে বাঁধ নির্মাণ ও তদারকিতে নিয়োজিত সংশ্লিষ্টরা সমান বরাদ্দ দেওয়ার কথা স্বীকার করে বলেছেন, ভবিষ্যতে যাতে এখানে বাঁধ নির্মাণ না করতে হয় সে জন্য এবার সব বাঁধে আরো টেকসইয়ের জন্য সমান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জয়কলস, পূর্ব পাগলা ও পশ্চিম পাগলা, দুর্গাপাশা, পূর্ব বীরগাঁও ও পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের দেখার হাওর, খাই হাওর ও জামখলা হাওরের ফসল রক্ষা করে মহাসিং নদীর বেড়িবাঁধ। ওই এলাকায় মহাসিং নদীর ২৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের তীর রয়েছে। এই তীরের মধ্যে অন্তত ২৫ কিলোমিটার হাওরের ফসল রক্ষার কাজ করা হয়। প্রতিবছরই ওই নির্ধারিত এলাকায় ফসল রক্ষায় বেড়িবাঁধ দেওয়া হয়। গত দুই বছর কঠোর নজরদারির কারণে কাজের মান ভালো হওয়ায় বেশির ভাগ বাঁধই অক্ষত রয়ে গেছে। তাই এ বছর ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধে যৎসামান্য বরাদ্দ দিলেই কাজ শেষ করা যেত বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। কিন্তু ‘হাওর চেনে না’ এমন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা প্রশাসন হাওর রক্ষা বাঁধের প্রাক্কলন করে এরই মধ্যে বরাদ্দ ছাড় করে নিয়েছে। সবগুলো বাঁধে সমান বরাদ্দ দেওয়ায় সরকারের বিপুল অঙ্কের টাকা অপচয় হবে বলে জানিয়েছেন কৃষক নেতারা।

পাউবো জানায়, খাই হাওরের ১২ দশমিক ১৮৩ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতে ১৪টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে দুই কোটি ৫৩ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। জামখলা হাওরের ৪ দশমিক ০০৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণে পাঁটি প্রকল্পে ৯৫ লাখ ৭৮ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দেখার হাওরের ৯ দশমিক ৪৬৬ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতে ১৪টি প্রকল্পে দুই কোটি ৭৩ লাখ ২৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

কৃষকরা জানিয়েছেন, পূর্ব পাগলা ও পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের ১৯, ২০, ১১, ১২, ১৩, ১৮ এবং পূর্ব বীরগাঁও ইউনিয়নের ৩১, ৩২ ও ৩৩ নম্বর প্রকল্পগুলো অনেকটা অক্ষত রয়ে গেছে। এগুলো সামান্য সংস্কার করলেই চলবে। কিন্তু এ প্রকল্পগুলোতেও সমান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

বেশি বরাদ্দের এসব প্রকল্পে লুকোচুরিরও আশ্রয় নিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ঘুরেফিরে গেলবারের পিআইসির লোকদেরই পাশের বাঁধের দায়িত্ব দিয়ে অদলবদল করেছেন। এবার ১১ নম্বর প্রকল্পের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে এ বছর ১২ নম্বর পিআইসিতে আনা হয়েছে। ১২ নম্বর পিআইসির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নেওয়া হয়েছে ১১ নম্বর পিআইসিতে। অন্য পিআইসিগুলোতেও এভাবে প্রয়োজনাতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়ে অদলবদল করা হয়েছে। এবার মহাসিং নদীতীরেই প্রায় ছয় কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেকই প্রয়োজনের অতিরক্ত বরাদ্দ বলে জানিয়েছেন হাওর আন্দোলনের নেতারা।

হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, সরকার কৃষকের ফসল রক্ষায় আন্তরিক। এ কারণে কয়েক বছর ধরে বরাদ্দ বাড়িয়ে যেকোনো মূল্যেই কৃষকের ফসল গোলায় তুলতে চায়। সরকারের বিপুল এই অর্থ হাতিয়ে নিতে নানা ফন্দিফিকিরও বের করেছে দুর্নীতিবাজরা। এবারও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধেও সমান বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। সব স্থানেই এসব হচ্ছে।

হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন, ‘আমাদের কর্মীরা বিভিন্ন হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ পরিদর্শন করে দেখেছেন, অক্ষত বাঁধেও ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের মতো সমান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের বিরাট অঙ্কের টাকা লোপাটের ক্ষেত্র তৈরি হয়। তা ছাড়া বিভিন্ন স্থানে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করেও সরকারি টাকা অপচয় করা হচ্ছে। আমরা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছি।’

দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও হাওরের ফসল রক্ষা কমিটির সভাপতি জেবুন্নাহার শাম্মী বলেন, প্রাক্কলনের ভিত্তিতেই প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগামী দিনে যাতে এসব বাঁধে কাজ করা না লাগে এ জন্য সমান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

গত শুক্রবার পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান জামালগঞ্জের একটি সভায় এ বিষয়ে বলেন, ‘এবার হাওরাঞ্চলে ফসল রক্ষায় সরকার ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। বরাদ্দ যাতে যথাযথভাবে ব্যয় হয় সে জন্য আমরা সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছি। বাঁধে অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং সরকারের অর্থ অপচয় হলে জড়িতদের ছাড় নেই।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা