kalerkantho

বুধবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ১ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

মিলার সিন্ডিকেটের কারসাজি

চড়েছে চালের দাম

অজুহাত দেখানো হচ্ছে ধানের বাড়তি দাম ও সরবরাহ সংকটকে
বস্তাপ্রতি বেড়েছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা

রফিকুল ইসলাম   

২৩ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



চড়েছে চালের দাম

বাজারে ধানের বাড়তি দাম, চাহিদার তুলনায় জোগানও কম—এমন ‘খোঁড়া অজুহাত’ দাঁড় করিয়ে বাড়ানো হচ্ছে চালের দাম। মোকামে বাড়তি দামের কারণে ভোক্তা পর্যায়েও প্রতি কেজি চাল বিক্রি হচ্ছে তিন থেকে পাঁচ টাকা বেশিতে। মোটা চালের দাম প্রতি কেজিতে দুই-এক টাকা বাড়লেও মিনিকেট চালে বেড়েছে পাঁচ টাকা। রাজধানীর বাজারেও চালের দাম বেড়েছে তিন থেকে সাত টাকা কেজিতে।

চালের বড় মোকাম কুষ্টিয়া ও নওগাঁয় কয়েক দিন ধরে চালের দাম বাড়তি। কুষ্টিয়ার খাজানগর মোকামে সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে। আমন ধানের মৌসুম চলাকালে দুই দফা চালের দাম বাড়ালেন মিল মালিকরা। নওগাঁ মোকামেও চালের দাম বাড়তি। মূলত ধানের সংকটকে দায়ী করে বস্তাপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা করে বাড়িয়েছেন মিল মালিকরা।

টিসিবির তথ্যানুযায়ী, মাস ব্যবধানে রাজধানীর বাজারে সরু ও মিনিকেট চালের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। এক মাস আগে সরু চালের দাম ছিল প্রতি কেজি ৪৫ থেকে ৬০ টাকা, যা গতকাল পর্যন্ত ৪.৭৬ শতাংশ বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। সাধারণ মানের মিনিকেট চালের দাম ছিল ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, যা প্রায় ৭.৩৭ শতাংশ বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫২ টাকায়।

পাইকারি বাজারে চালের দাম বাড়ার খবরে খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। কোথাও কোথাও মিনিকেট চালের দাম প্রতি কেজিতে বাড়ানো হয়েছে পাঁচ থেকে সাত টাকা। রাজধানীর গুদারাঘাট, ভাটারা ও জোয়ারসাহারা বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতি বস্তা চালের দাম ১৫০ থেকে ২০০ টাকা করে বাড়তি। যে চালের ৫০ কেজির বস্তার দাম ছিল দুই হাজার ৩০০ টাকা, সেটার দাম এখন পড়ছে ২৪০০ থেকে ২৫০০ টাকা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিনিকেট চালের দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। গত সপ্তাহে মিনিকেট চালের দাম স্থানভেদে ছিল ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। সেই চাল গতকাল বিক্রি হয়েছে ৫৫ টাকা কেজি। নাজিরশাইল, লতা, স্বর্ণা ও ইরি চালের দাম কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে। পাইকারিতে মিনিকেট চালের দাম প্রতি কেজি ৪৭ টাকা, জিরাশাইল ৪০ টাকা আর মোটা চাল ২৭ থেকে ২৮ টাকা। খুচরা বাজারে এই চালের দাম বেড়ে বিক্রি হচ্ছে মিনিকেট ৫৩ থেকে ৫৫ টাকা ও মোটা চাল ৩০ থেকে ৩৫ টাকায়।

রাজধানীর বাড্ডার পাইকারি চালের ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতি বস্তায় সব ধরনের চালে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেড়েছে। বাবুবাজার ও বাদামতলী চালের পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিলগেটে চালের দাম বেশি। সেখানে চালে বাড়তি দাম পড়ায় বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। চাল উৎপাদক মিলাররা বলছেন, ধানের সরবরাহ কম। এতে ধানের দাম বেড়ে যাওয়ায় চালের দামও বেড়েছে।

পাইকারি বিক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ধানের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ কম—এমনটি বলা হলেও কার্যত চিত্র ভিন্ন। চালের মিলাররা এখন ধান কেনেন না। মূলত ভরা মৌসুমে ধানের বিশাল মজুদ গড়েছেন তাঁরা। এখন ধানের দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। এই বাড়তি দামের সঙ্গে কম দামে কেনা ধানের সমন্বয় করতে কৌশলে দাম বাড়িয়েছেন তাঁরা। মূলত মিল মালিকদের সিন্ডিকেটই চালের দাম বাড়িয়েছে।

টিসিবির হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের চেয়ে এ বছর রাজধানীর বাজারে চালের দাম এখনো কম। ২০১৯ সালের ২২ জানুয়ারি মোটা চালের দাম ছিল ৩৮ থেকে ৪২ টাকা, যা বর্তমানে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। বছর ব্যবধানে এই চালের দাম কমেছে ১৮.৭৫ শতাংশ। মিনিকেট, নাজিরশাইল, মাঝারি মানের চালের দাম গত বছরের তুলনায় ৭ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। তবে এক মাসের হিসাবে সরু, সাধারণ মানের মিনিকেট ও মাঝারি চালের দাম ২ শতাংশ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাব সভাপতি গোলাম রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কৃষক ধানের যৌক্তিক মূল্য পাচ্ছেন না আর মিলালরা চালের দাম বাড়াচ্ছেন। কৃষক ও ভোক্তাদের দেখার কেউ নেই। চালের দাম বৃদ্ধি ভোক্তার নাভিশ্বাস বাড়াচ্ছে। দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে বাজার পরিস্থিতির দিকে সরকারের নজর রাখা উচিত। সরকার যদি বড় ব্যবসায়ী কিংবা মিলারদের স্বার্থ দেখে তাহলে ভোক্তা ও সাধারণ মানুষের জীবনে দুরবস্থা নেমে আসে।’

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, সরকার চলতি আমন মৌসুমে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গত ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত এক লাখ ১৫ হাজার ৯৭১ মেট্রিক টন সিদ্ধ আমন চাল, চার হাজার ১৭৬ মেট্রিক টন আমন আতপ চাল ও এক লাখ ৭৬ হাজার ৮৫৪ মেট্রিক টন আমন ধান সংগ্রহ করেছে। একই সময় পর্যন্ত দুই লাখ ৩৭ হাজার ৬৮১ মেট্রিক টন আমন চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। সংগ্রহ কার্যক্রম চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বোরো মৌসুমে ১৪ লাখ ৯ হাজার ৮৮৪ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহ করেছিল সরকার।

রাজধানীর বাদামতলীর জান্নাতুল রাইস এজেন্সির চান মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মিল মালিকরা চালের দাম বাড়ানোয় আমাদেরও বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। সিন্ডিকেট করে মিলাররা চালের দাম বস্তাপ্রতি ২০০ টাকা বাড়িয়েছেন। ধানের সংকট দেখিয়ে তাঁরা দাম বাড়িয়েছেন।’

বাংলাদেশ রাইস মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি কাওসার আলম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সব ধরনের চালের দাম বাড়তি। চালে গড়ে বস্তাপ্রতি ২০০ টাকা করে বেড়েছে। এখন আমন ধান কোথাও উঠেছে, আবার কোথাও ওঠেনি। এ জন্য ধানের ক্ষেত্রে একটা সংকট তৈরি হয়েছে। ধানের উৎপাদনও এবার কমেছে।’

আমাদের নওগাঁ প্রতিনিধি ফরিদুল করিম জানান, বছরজুড়ে চালের দাম সহনীয় থাকলেও হঠাৎ তিন থেকে পাঁচ টাকা করে কেজিতে দাম বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে মিনিকেট চালের দাম। স্বর্ণা-৫ চালের দাম ছিল ২৮ টাকা, এখন ৩০ টাকা। জিরাশাইল চাল ছিল ৩৮ টাকা, এখন বিক্রি হচ্ছে ৪০-৪১ টাকা, মিনিকেট ছিল ৪০ টাকা, বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকা। সম্পা কাটারি চালের দাম ছিল ৪৮ টাকা, এখন ৫১- ৫২ টাকা। চিনি আতপ ছিল ৯০ টাকা, এখন ৯৮ থেকে ১০০ টাকা।

আমাদের কুষ্টিয়ার নিজস্ব প্রতিবেদক তরিকুল ইসলাম তারিক জানান, ধানের দাম বাড়ার কারণে দ্বিতীয়বারের মতো চালের দাম বাড়ানো হয়েছে। মিনিকেট চাল কেজিতে এক টাকা এবং মোটা সব ধরনের চালের দাম কেজিতে দুই টাকা পর্যন্ত মিলগেটে বেড়েছে। ধানের দাম বাড়ায় চালের বাজার সমন্বয় করতে এ দাম বাড়িয়েছেন তাঁরা—এমন দাবি মিল মালিকদের।

বুধবার খাজানগর মোকামে মিনিকেট চাল ৪৫ টাকা করে বিক্রি হয়েছে। এই চালের দাম ছিল ৪৩ থেকে ৪৩.৫ টাকা। কাজললতা ৩৪ থেকে ৩৬ টাকা, আটাশ ৩৫ থেকে ৩৭ টাকা এবং স্বর্ণা ২৪ থেকে বেড়ে বর্তমানে ২৭ টাকার কাছাকাছি বিক্রি হচ্ছে।

লিয়াকত রাইস মিলের মালিক হাজি লিয়াকত হোসেন বলেন, ‘ধানের দাম প্রতি মণে ৫০ টাকা বেড়েছে। সেই কারণে চালের দাম মিলগেটে বেড়েছে। সরু জাতের মিনিকেট চাল ২৫ কেজির বস্তা বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ১২০ টাকা থেকে এক হাজার ১৩০ টাকা। সেই হিসাবে ৫০ কেজির বস্তার দাম হচ্ছে দুই হাজার ২৬০ টাকা। প্রতি কেজি চালের দাম পড়ছে ৪৫ টাকা ২০ পয়সা, যা খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৪৭ থেকে ৪৮ টাকা। কোথাও আরো বেশি।’

চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন বলেন, বাসমতি, মিনিকেট, কাজললতা ও স্বর্ণা ধানের দাম প্রতি মণে গড়ে ৭০ থেকে ৮০ টাকা বেড়েছে। সেই কারণে চালের বাজার সমন্বয় করা হয়েছে।

কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরিচালক মো. নুরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ধানের ঘাটতির কোনো প্রশ্নই ওঠে না। যদি কেউ ধান সংকটের কথা বলে থাকেন, তা মোটেও ঠিক নয়। টার্গেট ছিল এক কোটি ৪০ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের। ইতিমধ্যে লক্ষ্যমাত্রা প্রায় পূরণ হয়েছে। এখনো দক্ষিণাঞ্চলে ধান কাটা বাকি রয়েছে। আমাদের পর্যবেক্ষণ অনুসারে এবার আরো প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদন বেশি হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা