kalerkantho

শনিবার । ১০ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৮ জমাদিউস সানি ১৪৪১

৪০ দেশে যেতে শত কোটি টাকা চাইল ইসি সচিবালয়

আরিফুর রহমান   

২২ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



৪০ দেশে যেতে শত কোটি টাকা চাইল ইসি সচিবালয়

প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন করতে ৪০টি দেশে যেতে চান নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তারা। ওই সব দেশে যাতায়াতের জন্য খরচ ধরা হয়েছে ১০০ কোটি টাকা। সে হিসাবে প্রতিটি দেশে যাতায়াতের জন্য খরচ ধরা হয়েছে আড়াই কোটি টাকা করে। প্রবাসী ভোটার নিবন্ধনের জন্যই শুধু বিদেশ নয়, শিক্ষা সফরে ইউরোপ ও আমেরিকায় যেতে চান নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তারা। ৫৫ জন কর্মকর্তার এমন সফরের জন্য আলাদা করে পাঁচ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ ব্যয়ে খরচ চাওয়া হয়েছে আরো দুই কোটি টাকা। একটি প্রকল্পের আওতায় বিদেশ ভ্রমণের জন্য এমন টাকা চেয়েছেন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তারা। ‘ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও জাতীয় পরিচিতি সেবা’ নামের ওই প্রকল্পের জন্য মোট দুই হাজার ৫৫ কোটি টাকা চেয়ে তা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া একই প্রকল্পের আওতায় গাড়ি কেনার জন্য চাওয়া হয়েছে আরো ৩০ কোটি টাকা। স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানে ২০টি অডিও ও ভিডিও নির্মাণের জন্য চাওয়া হয়েছে চার কোটি টাকা।

প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন করতে বিদেশ যাওয়ার জন্য যে খরচ দেখানো হয়েছে, তা পর্যালোচনা করেছে পরিকল্পনা কমিশন। প্রবাসী ভোটার নিবন্ধনের জন্য সরকারি টাকা খরচ করে কেন এতটি দেশে যেতে হবে; তার কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পায়নি কমিশন। তা ছাড়া প্রতিটি দেশে যাতায়াতের জন্য কেন সমান আড়াই কোটি টাকা করে বরাদ্দ রাখা হলো সে প্রশ্নের উত্তরও মেলেনি। কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশে যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ায় যে টাকা খরচ হবে, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ায় সমপরিমাণ টাকা খরচ হওয়ার কথা নয়।

পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক বিভাগের সদস্য (সচিব) আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রবাসী ভোটার নিবন্ধনের জন্য ৪০ দেশে যাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাইনি। এমন অনেক দেশ আছে, যেসব দেশে এক থেকে দুই হাজার কোথাও সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার বাংলাদেশি পাওয়া যাবে। ওই সব দেশে কেন যেতে হবে।’ আবুল কালাম আজাদ বলেন, যেসব দেশে প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা এক থেকে পাঁচ হাজারের মধ্যে, সেসব প্রবাসীকে ভোটার নিবন্ধন করতে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে করা যেতে পারে। আবুল কালাম আজাদ আরো বলেন, এই প্রকল্পের আওতায় যানবাহন কেনার অস্বাভাবিক প্রস্তাব করা হয়েছে। আমরা বলেছি, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় এর আগে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নাগরিকদের স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার জন্য নেওয়া একটি প্রকল্পের আওতায় অনেক যানবাহন কিনেছে। নতুন করে আরো ৩২টি যানবাহন কেনার প্রয়োজন দেখি না।

সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা গেছে, প্রবাসে এখন এক কোটি বাংলাদেশি আছে। এই এক কোটি জনগোষ্ঠীর ৯৫ শতাংশ বাংলাদেশিই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিশ্বের ১১টি দেশে অবস্থান করছে। বাকি ৫ শতাংশ বাংলাদেশির অবস্থান অন্যান্য দেশে। সবচেয়ে বেশি ৩৬ লাখ বা ৩০ শতাংশের বসবাস সৌদি আরবে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবাসী বাংলাদেশি ২০ শতাংশের অবস্থান সংযুক্ত আরব আমিরাতে। তৃতীয় সর্বোচ্চ ওমানে বসবাস ১২ শতাংশ। এরপর রয়েছে যথাক্রমে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, লেবানন, জর্দান ও লিবিয়া। এ ছাড়া অন্যান্য দেশে বাংলাদেশির সংখ্যা খুবই নগণ্য।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয় সূত্র বলছে, জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইন ২০১০-এর আলোকে নিবন্ধিত ভোটারের বাইরে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক। সে আলোকে প্রস্তাবিত ‘ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও জাতীয় পরিচিতি সেবা’ প্রকল্পের আওতায় ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী চার কোটি নাগরিকের জন্য অস্থায়ী জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়া হবে। এর আগে বহুজাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহেন্সিং এক্সেস টু সার্ভিস’ (আইডিইএ) শিরোনামের একটি প্রকল্পের আওতায় প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার প্রকল্প অনুমোদন হয়েছিল। যে প্রকল্পটি চলতি বছর শেষ হয়ে যাওয়ার কথা।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আইডিইএ প্রকল্পটির আওতায় ৯ কোটি নিবন্ধিত ভোটারের জন্য স্মার্ট কার্ড দেওয়ার কথা। প্রকল্পটি এখন চলমান। নতুন করে ‘ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও জাতীয় পরিচিতি সেবা’ প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে মূলত দুটি কারণে। একটি হলো ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের অস্থায়ী স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়া; দ্বিতীয়ত, প্রবাসী ভোটারদের নিবন্ধিত করা। পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খরচ দেখানো হয়েছে দুই হাজার ৫৫ কোটি টাকা। যার পুরোটাই রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে পাওয়ার আশা করছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়। বর্তমানে জাতীয় তথ্যভাণ্ডারে ১০ কোটি ৪৩ লাখ নাগরিকের তথ্য রয়েছে। বাকিদের তথ্য সংগ্রহের জন্য নতুন করে প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে।

প্রকল্পটি ঘেঁটে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নেওয়া প্রকল্পটির আওতায় বয়স্ক নাগরিকদের দেওয়া স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে নতুন করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের কার্ডপ্রতি খরচের বেশ পার্থক্য রয়েছে। আগেরবার প্রতি কার্ডে খরচ হয়েছিল ১৫৮ টাকা। প্রস্তাবিত প্রকল্পে কার্ডপ্রতি খরচ দেখানো হয়েছে ১৬৫ টাকা। পাঁচ কোটি স্মার্ট কার্ড দেওয়া হবে এই প্রকল্পের আওতায়। মুদ্রণ ও বাঁধাই খাতে খরচ দেখানো হয়েছে ৫০ কোটি টাকা। স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরিতে মুদ্রণ ও বাঁধাই খাতে কেন এত টাকা ধরা হলো তা জানতে চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন খাতে যে হারে খরচ দেখানো হয়েছে, তাতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলমান আইডিইএ প্রকল্পে এক হাজার ৯০০ কোটি টাকা দিয়ে তাহলে কি কেনা হলো তা-ও জানতে চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। কিভাবে ৯ কোটি ভোটারের নিবন্ধন করা হলো তাও জানতে বলা হয়েছে। নতুন করে কেন এত ল্যাপটপ, ডিএসএলআর ক্যামেরা, ফিঙ্গার প্রিন্ট, স্ক্যানার, আইরিশ স্ক্যানার, বারকোর্ড স্ক্যানারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল তা নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কাছে জানতে চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা