kalerkantho

বুধবার । ৬ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১

সর্বনাশা মাদক

চলন্তিকা থেকে আখড়া সরে দোয়ারীপাড়ায়

অন্ধকার গলি আর নির্মাণাধীন বাড়িতে চলে কেনাবেচা চলন্তিকা বস্তির কারবারিরাও সক্রিয়

এস এম আজাদ   

১৯ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চলন্তিকা থেকে আখড়া সরে দোয়ারীপাড়ায়

‘স্যার আগে সহজে মাল (ইয়াবা) পাইতাম। এহন একটু ঘুরতে হয়। যেসব বাড়িত কাম হয় সেগুলা, আর বস্তির পাশে গেলে মাল দেয়। এসব এলাকায় জুয়াও চলে। আইজ অনেক কষ্টে তালগাছতলা থেইকা ৪০০ টাকায় পাইলাম।’

দোয়ারীপাড়া বাজার এলাকায় গত বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে মামুন নামে এক মাদকসেবী ইয়াবা কিনে ফেরার পথে এভাবে বলছিলেন। গোপন সূত্রের মাধ্যমে এক ঘণ্টা আগে থেকে প্রাইভেট কারচালক মামুনকে অনুসরণ করা হয়। দূরে অবস্থান নিয়ে এক তরুণের কাছ থেকে তাঁকে ইয়াবা কিনতে দেখা যায়। পরে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে চ্যালেঞ্জ করলে তিনি এই প্রতিবেদকের কাছে ইয়াবা কেনার কথা স্বীকার করে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন।

বিক্রেতার নাম জানেন না বলে দাবি করে মামুন জানান, একজনের মাধ্যমে মোবাইল ফোন নম্বর পেয়ে এসেছেন। থাকেন সনি সিনেমা হলের কাছে একটি মেস বাসায়। তবে মামুন জানান, দোয়ারীপাড়ায় কয়েকটি এলাকায় ইয়াবা পাওয়া যায়। নির্মাণাধীন ভবন ও বস্তির পাশে অন্ধকার ঘরে ইয়াবা ও গাঁজা সেবন চলে। কয়েকটি এলাকায় মাদক ও জুয়ার আসর চলে বলেও জানান তিনি।

গত এক সপ্তাহ সরেজমিনে অনুসন্ধানকালে মামুনের মতোই তথ্য দিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ও মাদকসেবী। রাজধানীর রূপনগর থানা এলাকায় এক সময় বিষফোড়া ছিল মাদকস্পট চলন্তিকা বস্তির ঝিলপাড়। বিশেষ উচ্ছেদ অভিযান এবং নিয়ন্ত্রক নজরুল ইসলাম সরদার ওরফে নজু গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলে আখড়াটা বন্ধ হয়ে যায়। নজুর ‘গডফাদার’ হিসেবে অভিযুক্ত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর রজ্জব হোসেন এবার দলের মনোনয়ন পাননি। তবে চলন্তিকার মাদক কারবারিরা ওই এলাকায় এবং দোয়ারীপাড়ায় আবারও গোপনে মাদক কারবার শুরু করেছেন। দোয়ারীপাড়ায় স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় মাদক বিক্রির স্পট তৈরি হয়েছে। পার্শ্ববর্তী শিয়ালবাড়ীতেও চলছে ভাসমান মাদক বিক্রি। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে সেখানে মাদক বিক্রি করছে কিছু নতুন ও পুরনো কারবারি। রূপনগর থানার এসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের আওতায়। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, রাজনৈতিক দলের অনেক নেতাকর্মীর আশপাশে ঘুরছে মাদক কারবারিরা। তাই সিটি নির্বাচনে মাদক ইস্যু বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।

দোয়ারীপাড়া ঘুরে জানা গেছে, বালুর মাঠের পেছনে হোসেন মোল্লা গার্মেন্টের কাছে সাজু মোল্লা, সামিউল ও শিপু মোল্লার নিয়ন্ত্রণে চলে মাদক বেচাকেনা। সাজুর ছোট ভাই শ্যামল এখন গ্রেপ্তার হয়ে জেলে আছেন। দোয়ারীপাড়া বাজার থেকে তালগাছতলা ও ভোলা বস্তির ঢাল পর্যন্ত কারবার নিয়ন্ত্রণ করছেন রিপন মোল্লা ও তাঁর সহযোগী জসিমউদ্দিনসহ কয়েকজন।

আণবিক শক্তি এলাকা ও পেছনের টঙ বস্তিতে লতিফ মোল্লার ছেলে রানা, জিহাদ, মাহবুব মোল্লা, মইন মাদক কারবার করছেন বলে জানায় সূত্র। ৩০ নম্বর রোডের মাথায় দাঁড়িয়ে ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রি করেন পাঙ্গাশ আলম নামে এক ব্যক্তির সহযোগীরা। ওই এলাকার কয়েকটি নির্মাণাধীন বাড়ি তাঁদের মাদকসেবনের স্পট। দোয়ারীপাড়ার ৮ নম্বর সেকশনের ১০ নম্বর সড়কে বড় মাদকের ডিলার সালেহা বেগম বর্তমানে গাঢাকা দিয়ে আছেন।

চলন্তিকা ক্লাব এলাকায় তপন, গিয়াসউদ্দিন, শিয়ালবাড়ীতে পারভেজ, পারভিন, হারুন, নানা ভাই, রাজু ও তাঁর মা নাজমা ওরফে নাজু, আবু সাঈদ, সুমন সহযোগীদের দিয়ে ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রি করেন।

চলন্তিকার ঝিলপাড় বস্তিতে নাজুর দোতলা টিনশেড ঘরে ইয়াবার আখড়া চলছিল সিসি ক্যামেরা বসিয়ে। এই ক্যামেরায় প্রশাসনের লোকজনদের অভিযানে আসার দৃশ্য দেখে সে খবর দ্রুত পৌঁছে দেওয়া হতো রজ্জব হোসেনের অফিসে। এ কারণে রজ্জব ও তাঁর সহযোগীদের নাজুর নিয়ন্ত্রক হিসেবে দাবি করেছেন এলাকাবাসী। ওই স্পটের বিক্রেতাদের মধ্যে রয়েছেন সোহেল, নাজুর চাচাতো ভাই নাজিমুদ্দীন, ভাণ্ডারী, ফরিদ, আলম, নাজুর ভাগ্নে রনি, ফারুক সর্দার, শাহাদাত্, রাসেল, সাজু, সুমন, জসিম, নাছির, রেজা, সোহাগ, মুসলীম, রিপন, জাকির ও সুমন।

সোহেল, জসিম, সুমনসহ কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেও বাকিরা গাঢাকা দিয়ে আশপাশের এলাকায় কারবার করছেন। ঝিলপাড়ের বেশ কিছু বস্তিঘর উচ্ছেদের ফলে অনেকে এলাকাছাড়া। তবে কাউন্সিলর রজ্জবের হয়ে নাজুর আখড়া টিকিয়ে রাখা ব্যক্তি এবং নাজুর ঘনিষ্ঠ কেউ ধরা পড়েননি।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, যাঁদের বিরুদ্ধে চলন্তিকা ও দোয়ারীপাড়ার মাদক কারবারিদের মদদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁদের অনেকে এবারের কান্সিলর প্রার্থীদের আশপাশে ঘোরাঘুরি করছেন। মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর রজ্জব হোসেনকে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন রবিনকে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এলাকার পরিবেশ এখন অনেক ভালো। নির্বাচিত হলে এই এলাকাকে মাদকমুক্ত করতে আমি কাজ করব।’

এই ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী বলেন, ‘আমি সব সময় মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করছি। এখান থেকে মাদকের স্পট ভেঙে দেওয়া হয়েছে। মাদক ও সন্ত্রাসের কোনো স্থান এখানে হবে না।’

৭ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন দেলু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লোকজন আমাদের মাদকের সমস্যার কথা বলে। এলাকায় মাদক চলে প্রশাসনের সহায়তায়। আমি নির্বাচিত হলে মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূলে কাজ করব।’

৭ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী তফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘মাদকের সঙ্গে যেই জড়িত থাকুক, তার রেহাই নেই। সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে। জনগণও সচেতন হয়ে উঠেছে।’

রূপনগর থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘এখন আর মাদক বিক্রির তেমন স্পট নেই। তবে মোবাইল ফোন ও অনলাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন মোড়ে, চায়ের দোকানে বিক্রি হচ্ছে। আমরা নজরদারি করছি। খবর পেলেই অভিযান চালানো হয়। প্রায়ই মামলা হচ্ছে।’            

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মিরপুর সার্কেলের পরিদর্শক খন্দকার ইকবাল হোসেন বলেন, ‘রূপনগর এলাকায় আমাদের নজরদারি আছে। চিহ্নিত কারবারিদের গ্রেপ্তার এবং মামলা হয়েছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা