kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

আমন ধান-চাল সংগ্রহ

খুলনায় এক আনা ধানও সংগৃহীত হয়নি

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

১৯ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



খুলনায় এক আনা ধানও সংগৃহীত হয়নি

খুলনায় সরকার নির্ধারিত মূল্যে আমন ধান ও চাল সংগ্রহে গতি নেই। প্রায় দুই মাসে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র সাড়ে ৪ শতাংশ ধান সংগৃহীত হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার এক আনার চেয়েও কম। আর চাল সংগ্রহে লক্ষ্যমাত্রার চার আনাও অর্জন করা সম্ভব হয়নি। মাত্র ২২ শতাংশ চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, অনিয়মের কারণে অনেকেই ধান-চাল সংগ্রহের লটারিতে অংশ নিতে পারছেন না; আবার লটারিতে বিজয়ী অনেকেই ধান চাষি না হওয়ায় সংগ্রহ অভিযান কোনো কাজে আসছে না। আবার অনেক কৃষক সার ডিলারদের কবলে পড়ে প্রতারিত হচ্ছেন।

জানা গেছে, জেলায় মোট তিন লাখ ১৭ হাজার ২৭৪ জন পরিচয়পত্রধারী কৃষক আছেন। তাঁরা সবাই ধান, শাকসবজি ও রবি শস্য চাষি। অনেকেই বসতবাড়ির অঙিনায় ক্ষুদ্র পরিসরে সবজি ও ফল আবাদ করেন। পরিচয়পত্রধারী সবারই নাম ছিল সরকার নির্ধারিত দামে আমন ধান কেনার জন্য চাষি নির্বাচন সংক্রান্ত লটারিতে। প্রায় এক লাখ কৃষক ধান সরবরাহের জন্য জয়ী হয়েছেন।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ধান চাষি ও অন্য ফসল চাষিদের আলাদা পরিসংখ্যান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। যদিও গত ডিসেম্বর থেকে এ তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এ কারণে ধান চাষ করেন না, এমন অনেক কৃষক লটারিতে জয়ী হয়েছেন।

গত ২০ নভেম্বর থেকে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়। চলবে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। ৯টি উপজেলায় ৯ হাজার ১২০ টন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে গত ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ৪২৫ মেট্রিক টন ধান সংগৃহীত হয়েছে। শতকরা হারে এর পরিমাণ ৪.৬৬ শতাংশ। অন্যদিকে ছয় হাজার ৫৯২ টন সিদ্ধ ও এক হাজার ১১৩ মেট্রিক টন আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে। ১৪১ জন রাইসমিল মালিক ৩৬ টাকা কেজি দরে সিদ্ধ এবং ৫৫ জন রাইসমিল মালিক ৩৫ টাকা কেজি দরে আতপ চাল সরবরাহ করছেন। এরই মধ্যে সিদ্ধ-আতপ মিলিয়ে এক হাজার ৭০৯ টন চাল সংগৃহীত হয়েছে। শতকরা হিসাবে এ হার ২২.১৮ শতাংশ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রূপসা উপজেলার দুর্জ্জনীমহল গ্রামের আমন চাষি ইকরাম ঢালীর নাম  লটারিতে ওঠার পরও তিনি সরকার নির্ধারিত দামে ধান বিক্রি করতে পারেননি। তিনি বলেন, ওই এলাকার এক সারের ডিলার তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর স্ত্রীর কাছ থেকে কৃষি কার্ডটি নিয়ে যান। এরপর তাঁকে বলেন, তুমি ধান দিলে হবে না। তাঁকে উপজেলা খাদ্যগুদাম এলাকায় নিয়ে তিনটি কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে তিনি নিজের ধান বিক্রি করেন। বিনিময়ে তাঁকে ৫০০ টাকা ধরিয়ে দেন। ওই ডিলার আরো অনেকের কাছ থেকে কৌশলে কৃষি কার্ড হাতিয়ে নিয়ে নিজে ধান বিক্রি করে লাভবান হয়েছেন আর যাঁদের কাছ থেকে কার্ড নিয়েছেন তাঁদের নগদ ৫০০-৭০০ টাকা ধরিয়ে দিয়েছেন। 

এই ডিলার এলাকার প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে সখ্য থাকার সুবাদে সহজ-সরল কৃষকদের ঠকিয়ে চলেছেন বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করে। আইচগাতী ইউনিয়নের আব্দুলের মোড় এলাকার সার-বীজ-কীটনাশকের ডিলার শেখ মো. আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ রয়েছে। তাঁর কাছে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করেন। তবে তিনি বলেন, লটারিতে নাম উঠেছে অথচ ধান চাষি নন, তাঁদের হয়ে তিনি ধান বিক্রি করেছেন। কারো কাছ থেকে তিনি কৃষি কার্ডের ফটোকপি গ্রহণ কিংবা ফরমে স্বাক্ষর সংগ্রহ করেননি।

উপজেলা ধান-চাল সংগ্রহ মনিটরিং কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাসরিন আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। লটারির মাধ্যমে ত্রুটিমুক্তভাবে কৃষক নির্বাচন করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

খুলনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মুহাম্মদ তানভীর রহমান বলেন, এখনো শতভাগ জমির ধান কাটা শেষ না হওয়া, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত জমির ধানে চিটা বেশি হওয়া, ধানে আদ্রতা বেশি এবং বৃষ্টি ও কুয়াশাচ্ছন্ন পরিস্থিতির কারণে ধান সংগ্রহ অভিযানে ধীরগতি ছিল। তবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়ার ব্যাপারে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

প্রসঙ্গত, খুলনায় ৯১ হাজার ৮৮০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। গড়ে স্থানীয় জাতের ধানে হেক্টরপ্রতি ১ দশমিক ৯৫ টন ও উচ্চ ফলনশীল জাতে প্রতি হেক্টরে ৩ দশমিক ০৬৯ টন ফলন হয়েছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৯৯ শতাংশ জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা