kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

রাস্তা ও গাছের মালিকানা

দুই মন্ত্রণালয়ের বিবাদ চরমে

জটিলতা নিরসনে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে

আরিফুর রহমান   

১৯ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দুই মন্ত্রণালয়ের বিবাদ চরমে

জেলা পরিষদের মালিকানাধীন রাস্তা, রাস্তার পাশের জমি এবং রাস্তার পাশের গাছপালার মালিকানা নিয়ে দুই মন্ত্রণালয়ের দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছেছে। এই বিবাদ মেটাতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ উদ্যোগী হলেও সমাধান মেলেনি। পরিকল্পনা কমিশন দুই বছর আগে জেলা পরিষদের রাস্তা ও গাছের মালিকানা সওজকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছিল। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ স্থানীয় সরকার বিভাগ। এমন বাস্তবতায় জেলা পরিষদের মালিকানাধীন রাস্তা ও গাছের মালিকানা কার কাছে থাকবে, সেই সিদ্ধান্ত নিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দ্বারস্থ হতে যাচ্ছে পরিকল্পনা কমিশন।

সওজ ও স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলা পরিষদের মালিকানাধীন রাস্তা, রাস্তার পাশের জমি, গাছপালা, রাস্তার পাশের দোকানপাট, স্থাপনার মালিকানা নিয়ে দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য ২০১৮ সালে পরিকল্পনা কমিশনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। দেশে বিদ্যমান বিভিন্ন আইন পর্যালোচনা করে ওই বছর পরিকল্পনা কমিশন সওজের পক্ষে জমি ও গাছের মালিকানা দেওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছিল।

পরিকল্পনা কমিশনের ওই সিদ্ধান্তের আলোকে সওজ মাঠপর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গেলে জেলা পরিষদের বাধার মুখে পড়তে শুরু করে। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানরা পরিকল্পনা কমিশনের ওই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে স্থানীয় সরকার বিভাগের কাছে চিঠি পাঠাতে শুরু করেন। স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে গত সপ্তাহে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো চিঠিতে ওই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, জমি ও গাছের মালিকানা কার কাছে থাকবে এ সিদ্ধান্ত এখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কিংবা সংসদ দিতে পারে, পরিকল্পনা কমিশন নয়। তাই তাঁরা দুই পক্ষের মতামত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেবেন।

সওজের কর্মকর্তারা বলছেন, জেলা শহরগুলোতে দিন দিন যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। বিদ্যমান রাস্তাগুলো যানবাহনের চাপ সামলাতে পারছে না। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা বাড়ছে। ফলে চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাস্তা

চওড়া করার প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে। রাস্তা চওড়া করতে গিয়ে জেলা পরিষদের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁদের।

সওজের একাধিক নীতিনির্ধারক বলেছেন, কোথাও কোথাও গাছ কাটতে গেলে জেলা পরিষদ থেকে বাধা দেওয়া হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও গাছ কাটতে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। এতে করে নির্ধারিত সময়ে রাস্তা নির্মাণের কাজ শুরু করা যায় না। সে কারণে নির্ধারিত সময়ে রাস্তার কাজ শেষ করাও যায় না। এতে করে স্থানীয় মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। ফলে তাদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হচ্ছে।

জেলা পরিষদের রাস্তা ও গাছের মালিকানা যদি সওজের অধীনে থাকে, তাহলে রাস্তা প্রশস্ত করার কাজ সহজ হবে বলে জানান সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

সওজের প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাস্তা চওড়া করতে মানুষের চাহিদার কথা বিবেচনা করে আমাদের প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে রাস্তা চওড়া করতে গিয়ে আমাদের সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। জেলা পরিষদ জমি ও গাছের মালিকানা দাবি করছে। মালিকানা আমাদের কাছে থাকলে আমরা দ্রুততার সঙ্গে গাছ কেটে রাস্তা চওড়া করতে পারি।’

অন্যদিকে স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী জমির মালিকানা নির্ধারিত হয় রেকর্ড অব রাইটসের (আরওআর) মাধ্যমে। জেলায় জমি ও গাছের মালিকানা হলো জেলা পরিষদের। এ জন্য প্রতিবছর খাজনাও দিতে হয় জেলা পরিষদকে। ১৯২৫ সালের মহাসড়ক আইনে জমি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়নি। তা ছাড়া রাস্তা ও গাছের মালিকানা সওজকে দেওয়ার কোনো আইন বাংলাদেশে নেই। সিএস, এসএ ও আরএস রেকর্ড অনুযায়ী জমির মালিকানা হচ্ছে জেলা পরিষদের। বিদ্যমান আইন অনুসরণ করলে জমি ও গাছ কিছুতেই সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরকে দেওয়ার সুযোগ নেই। যদি জমি ও গাছ সওজকে দিতেই হয়, তবে সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে সংসদ।

স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, রাস্তা ও গাছের মালিকানা জেলা পরিষদের—এটা আইনে স্পষ্ট বলা আছে। এটা প্রতিষ্ঠিত। এটার মালিকানা সওজকে দেওয়া যাবে না। দিলে তা হবে ২০০০ সালে জেলা পরিষদ আইনের পরিপন্থী।

জেলা পরিষদের তিনজন চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে উদ্যোগী হয়ে জেলা পরিষদ গঠন করেন। জেলা পরিষদের রাস্তার পাশে দোকানপাট, মার্কেট ভাড়া, গাছপালা বিক্রি করে, রাস্তার পাশের জায়গা বাণিজ্যিকভিত্তিতে বন্দোবস্ত দিয়ে যে রাজস্ব আদায় হয় তা দিয়ে জেলা পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া হয়। পরিষদের সদস্যদের সম্মানী দেওয়া হয়। মসজিদ-মন্দিরে সহায়তা দেওয়া হয়। গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়া হয়। অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের এককালীন আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। ক্রীড়া, শিক্ষা, সংস্কৃতি উন্নয়নে জেলা পরিষদের ভূমিকা অনেক। এখন যদি রাস্তা, রাস্তার পাশের জমি ও গাছপালার মালিকানা সওজের অধীনে চলে যায়, তাহলে জেলা পরিষদ পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে যাবে।

বাগেরহাট জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ কামরুজ্জামান টুকু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাস্তার খাজনা দেব আমি, আর গাছ কেটে নিয়ে যাবে সওজ—এটা অযৌক্তিক। তাহলে সরকার আমার খাজনা বাতিল করুক।’ তিনি বলেন, ‘খতিয়ানে জমির মালিক জেলা পরিষদ। সেই জমি পরিকল্পনা কমিশন কিভাবে সওজকে দিয়ে দেয়। এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে সংসদকে।’

সওজের প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলমের বক্তব্য হলো, ‘গাছ তো বছরজুড়েই রিটার্ন দেয় না। এটা জেলা পরিষদের একমাত্র আয়ের উৎস হতে পারে না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা