kalerkantho

শনিবার । ১০ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৮ জমাদিউস সানি ১৪৪১

বগুড়ায় ২৪৩ বছর ধরে পাশাপাশি মসজিদ-মন্দির

লিমন বাসার, বগুড়া   

১৮ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বগুড়ায় ২৪৩ বছর ধরে পাশাপাশি মসজিদ-মন্দির

বগুড়া শহরের ফতেহ আলী বাজারে মসজিদ ও মাজারের পাশেই কালীমন্দির। ছবি : কালের কণ্ঠ

সেই ১৭৭৭ সালের কথা। এরপর থেকে ২৪৩ বছর ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের এক উদাহরণ হয়ে আছে বগুড়া জেলা শহরের ফতেহ আলী বাজার। এখানে মাত্র ১০ ফুটের ব্যবধানে দেখা যাবে মুসলমানদের মসজিদসহ এক মাজার ও হিন্দুদের মন্দির। মসজিদে আজান ও নামাজ যেমন স্বাভাবিকভাবে হয়, পাশাপাশি হিন্দুদের মন্দিরে ঘণ্টার ধ্বনিও বাজে কোনো রকম বাধা ছাড়াই। স্থানীয়রা জানান, পাশাপাশি মসজিদ ও মন্দিরকে কেন্দ্র করে গত প্রায় আড়াই শ বছরে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব-সংঘাত হয়নি। দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক এই সম্প্রীতিকে বগুড়াবাসী গর্ব মনে করে।

জেলা শহরের করতোয়া নদীর পাশে ফতেহ আলী বাজার। বাজারে ঢোকার মুখে পূর্ব প্রান্তে ১০ গজের মধ্যে ‘শাহ সুফি ফতেহ আলী (র.) অস্কালীর’ মাজার ও মসজিদ এবং পশ্চিম পাশেই আনন্দময়ী কালী মন্দির। প্রতিদিন সেখানে শত শত ভক্ত মাজার জিয়ারত ও মন্দিরে পূজা করতে ভিড় জমান।

‘বগুড়ার ইতিহাস’ শীর্ষক গ্রন্থে জানা যায়, হযরত শাহ সুফি ফতেহ আলীর (র.) জীবনের শেষ ঠিকানা হয় মহাস্থানগড়ের আট মাইল দক্ষিণে করতোয়া নদীর পারে, যেখানে তাঁর মাজার অবস্থিত। তখন তা ছিল বিরাট আমবাগানের ছায়াঘেরা একটি স্থান। কথিত আছে, ফতেহ আলী (র.) কাশফ শক্তিতে জানতে পারেন, এই জায়গাটিই হবে তাঁর জিন্দেগির শেষ মঞ্জিল। সে কারণে সেখানেই তিনি খানকা তৈরি করেন। এই মহান সাধক পুরুষ এই স্থানে আগমন করেন ১৭৫৯ সালে। এরপর ১৮ বছর অবস্থানের পর তাঁর মৃত্যু হয় ১৭৭৭ সালে। সেই সময় থেকেই মুসলিম সমাজ তো বটেই, হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকে ভক্তি, শ্রদ্ধা ও সম্মানের সঙ্গে তাঁর নাম স্মরণ করে থাকেন।

৫৬ বছর ধরে ফতেহ আলীর (র.) মাজারের খাদেমের দায়িত্ব পালন করে আসা খতিব হায়দার আলী বলেন, ‘আমার বাপ-দাদারা বংশানুক্রমে এই মাজারের খাদেম ছিলেন। এখন আমি এই দায়িত্ব পালন করছি। পাশাপাশি দুই বিশ্বাসের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে ধর্ম অনুশীলন করে আসছে। সন্ধ্যায় মন্দিরের ঘণ্টার ধ্বনিতে মসজিদ কিংবা মাজারের কার্যক্রমে কোনো সমস্যা হয় না। হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক লোকজনও কালী মন্দিরে পূজা দিয়ে মাজারে সালাম করে যান। কোনো দিন মন্দিরের পুরোহিত বা পূজারিদের সঙ্গে মাজারের লোকজনের বাগিবতণ্ডা হয়নি।’

ফতেহ আলী বাজার এলাকাটির নাম আগে ছিল কুণ্ডুপাড়া। সেখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষই বেশি বাস করতেন। সেখানে আনন্দময়ী কালী মন্দিরে বাপ-দাদার আমল থেকে বংশানুক্রমে পৌরহিত্য করছে শ্রী জয়রাম পাণ্ডের পরিবার।

জয়রাম বলেন, ‘পূর্বপুরুষদের কাছ থেকেও শুনেছি উপাসনা নিয়ে কখনো মাজারের ভক্তদের কিংবা তাঁদের লোকজনদের সঙ্গে কোনো বিতণ্ডা হয়নি। একদম পাশাপাশি দুই ধর্মের দুইটি পুণ্যস্থান। তবু কখনো মাজারের জিকির আজকারে পূজারিরা বিব্রতবোধ করেননি।’

মন্দির ও মাজার এলাকাটি শাহ সুফি ফতেহ আলীর নামেই ফতেহ আলী বাজার নামকরণ হয়। শহরের সবচেয়ে বড় বাজার এটি। এই বাজারের প্রবীণ ব্যবসায়ী আলিমুদ্দিন খান জানান, মন্দিরে যেমন কালী পূজা হয়, তেমনি হযরত শাহ সুফি ফতেহ আলী অস্কালীর (র.) মৃত্যু দিবস ২২শে বৈশাখে সেখানে হাজারো ভক্ত জিকির করেন। তখন খাবার বিতরণও করা হয় সবার মধ্যে। মাজারের খাদেম হায়দার আলী বলেন, ওই অনুষ্ঠানে হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক ভক্তও আসেন।

লেখক আব্দুর রহিম বগরা বলেন, অতীতে বগুড়া সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক দৃষ্টান্ত ছিল বলে মনে করা হয়। দেশ ভাগের পর বগুড়া জেলা মুসলিম লীগের সহসভাপতি ছিলেন বাচ্চু মারোয়ারী। জেলা কমিটির আরেক নেতা ছিলেন ফটিক কুণ্ডু। তাঁরা দুজনই হিন্দু ছিলেন।

বগুড়া জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নিরঞ্জন কুমার সিংহ বলেন, এই জেলায় অতীতে হিন্দুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটলেও ফতেহ আলীর মাজারের সঙ্গে লাগানো মন্দিরে কোনো হামলা হয়নি।

এই মন্দিরে কুষ্টি গণনা করাতে শহরের চেলোপাড়া থেকে আসা খঞ্জন সেন ও ধর্মীয় বিষয় জানতে আসা সবিতা রানী পাল বলেন, পাশে মাজার থাকলেও মন্দিরে কোনো সমস্যা হয় না।

মাজার জিয়ারত করে বেরিয়ে আসা আবু সাইয়িদ নামের একজন বলেন, অনেকবার মাজারে এসেছি। কিন্তু কখনো মাজার ও মন্দিরের ভক্তদের মাঝে কোনো খারাপ সম্পর্ক দেখিনি।

মাজার জিয়ারত করে কেউবা পূজারিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন, আবার পূজা শেষে বের হয়ে কেউবা মাজারের ভক্তদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন, এমন দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা