kalerkantho

শনিবার । ১০ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৮ জমাদিউস সানি ১৪৪১

আ. লীগে বিভক্তি ঘরবন্দি বিএনপি

আলমগীর চৌধূরী, জয়পুরহাট   

১৮ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আ. লীগে বিভক্তি ঘরবন্দি বিএনপি

দীর্ঘ সময় ধরে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিতি ছিল জয়পুরহাট জেলার। আশির দশক থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত জেলার দুটি সংসদীয় আসনই থেকেছে বিএনপির দখলে। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে জেলার রাজনীতির কর্তৃত্ব আওয়ামী লীগের হাতে। একই সঙ্গে কর্তৃত্ব আর আধিপত্য বিস্তার নিয়ে জেলায় ক্ষমতাসীন দলটিতে তৈরি হয়েছে বিভক্তি, কোন্দল। অন্যদিকে দশম সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই হামলা-মামলা, পুলিশি হয়রানি আর জেলা কমিটির নেতৃত্ব নিয়ে নানা মেরুকরণে অনেকটা গৃহবন্দি বিএনপি।

আওয়ামী লীগ : জেলার দুটি সংসদীয় আসনই এখন ক্ষমতাসীন দলটির দখলে। জয়পুরহাট-১ আসনের সংসদ সদস্য জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সামছুল আলম দুদু এবং জয়পুরহাট-২ (কালাই-ক্ষেতলাল-আক্কেলপুর) আসনের সংসদ সদস্য কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন। এ ছাড়া স্থানীয় সরকারের সব পর্যায়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। বিরোধী দলের উপস্থিতিহীন ফাঁকা মাঠে দলীয়-উপদলীয় কোন্দলে বিব্রত দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতারা।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সামছুল আলম দুদু এমপি ও সাধারণ সম্পাদক এস এম সোলায়মান আলী একত্রে দল পরিচালনা করলেও জেলা কমিটির সহসভাপতি মোল্লা সামছুল আলম, গোলাম হক্কানী, মোমিন আহম্মেদ চৌধুরী, নৃপেন্দ্রনাথ মণ্ডল, যুগ্ম সম্পাদক জাকির হোসেন ও পৌর মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাকসহ দলের বড় অংশ তাঁদের বিপক্ষে। এই অংশটি আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন এমপির অনুসারী হিসেবে পরিচিত। গত তিন বছর ধরেই তাঁরা জেলা কমিটিকে বয়কট করে উপজেলা অথবা সহযোগী সংগঠনের ব্যানারে পৃথকভাবে দলীয় কর্মসূচি পালন করছেন। দ্বন্দ্বের কারণে গত ১৫ ডিসেম্বর জেলা সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করা হলেও সভাপতি ও সম্পাদকের বিরোধিতার কারণে তা স্থগিত হয়ে যায়।

জয়পুরহাট-২ আসনভুক্ত কালাই, ক্ষেতলাল ও আক্কেলপুর উপজেলায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দলীয় কোন্দল চরমে। এই তিন উপজেলায় একচ্ছত্র আধিপত্য হুইপ স্বপনের। জেলা সভাপতি-সম্পাদকের অনুসারীরা এখানে কোণঠাসা। স্বপনের অনুসারী আওয়ামী লীগ নেতা মিলন ও লজিকের কোন্দলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে কালাইয়ে তিন কর্মীর মৃত্যুর ঘটনা অন্তর্বিরোধকে আরো চাঙ্গা করেছে। বিগত উপজেলা নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়েই মূলত কোন্দলের সূত্রপাত। এ নিয়ে চাপা ক্ষোভ রয়েছে দলটির তৃণমূলেও। 

জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি গোলাম হক্কানী বলেন, ‘সভাপতি ও সম্পাদকের কর্মকাণ্ডে আস্থা হারিয়ে জেলা কমিটির ৭১ সদস্যের ৪৮ জনই তাঁদের বয়কট করেছেন। বিষয়টি কেন্দ্রে জানানোর পরও কোনো সুরাহা হয়নি।

অপরদিকে সামছুল আলম দুদু এমপি বলেন, ‘জেলা কমিটির সভাপতি ও সম্পাদকের নেতৃত্বে দলের সব কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। কাজেই আমাদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। কেন্দ্রীয় নেতা হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন এমপি জেলা কমিটির সভায় আসেন না। তাঁর অনুসারীদেরও আসতে দেন না। কেউ সভায় না এলে আমাদের কী করার আছে। এ নিয়ে কেন্দ্রে বৈঠক করেও কোনো লাভ হয়নি।’

বিএনপি : ২০১৪ সালের টানা তিন মাসের সরকারবিরোধী আন্দোলনে জয়পুরহাটে বিএনপি মাঠে সক্রিয় থাকলেও ২০১৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারির পর তারা মাঠ ছেড়েছে। ওই দিন বিকেলে জয়পুরহাট শহরের কেন্দ্রীয় মসজিদ চত্বরে আয়োজিত শান্তি সমাবেশে ককটেল হামলার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় মামলা হওয়ার পর গ্রেপ্তার আতঙ্কে মাঠ ছাড়েন বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা। সেই থেকে জেলায় স্থবির হয়ে আছে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম। অভিযোগ ওঠে, মামলা আর পুলিশি হয়রানির ভয়ে বিএনপির সক্রিয় অনেক নেতাকর্মী ওই সময় আওয়ামী লীগে যোগ দেন।

২০১৬ সালে কেন্দ্র থেকে সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত মোজাহার আলী প্রধানকে সভাপতি ও অ্যাডভোকেট নাফিজুর রহমান পলাশকে সম্পাদক ঘোষণা দিলে জেলা কমিটির নেতৃত্ব নিয়ে দলে চরম অসন্তোষ দেখা দেয়। ২০১৮ সালের ৫ জানুয়ারি মোজাহার আলী প্রধানের মৃত্যুর পর জেলা বিএনপির সভাপতি হন মমতাজ মণ্ডল। পরে পূর্ণাঙ্গ জেলা কমিটি ঘোষণা করা হলেও তাতে বিতর্কিত একাধিক ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় দলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ।

জেলা পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, দুর্দিনে পাশে পাইনি এমন বিতর্কিত নেতাদের জেলা কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে। দলের সাধারণ সম্পাদক জিয়া পরিবারের বিরোধিতার জন্য বহিষ্কৃত ছিলেন। পরে দলে ফিরলেও তিনি ছিলেন নিষ্ক্রিয়। সভাপতি একজন ব্যবসায়ী। অথচ তাঁদের হাতেই দায়িত্ব পড়েছে দল পরিচালনার।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নাফিজুর রহমান পলাশ বলেন, ‘যোগ্য নেতৃত্ব বাছাই করেই কমিটি গঠিত হয়েছে। কাজেই কমিটি নিয়ে দলে কোনো বিরোধ নেই। দলকে গতিশীল করার প্রক্রিয়া চলছে। আমাদের সামনে বড় বাধা পুলিশ। ঘরোয়া সভায়ও বাধা দেওয়া হচ্ছে।’

এ ছাড়া জেলায় জাতীয় পার্টি দীর্ঘদিন ধরেই নিষ্ক্রিয়। তবে এরশাদের মৃত্যুর পর জেলার রাজনীতিতে জাতীয় পার্টিকে সক্রিয় করতে মাঠ গোছানোর কাজ শুরু হয়েছে বলে দাবি করেন জেলা সাধারণ সম্পাদক আ স ম মোক্তাদির তিতাস। তিনি বলেন, এরই মধ্যে নেতাকর্মীদের নিয়ে কয়েক দফা সভা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতারাও জয়পুরহাট সফর করে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সেই মোতাবেক দলীয় কার্যক্রম চলমান।

অন্যান্য সংগঠনের মধ্যে বাম দলগুলো সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে সমাবেশ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিয়ে আসছে। আর জামায়াতের দৃশ্যমান কোনো কর্মসূচি না থাকলেও ভেতরে ভেতরে কর্মী সংযোগ অব্যাহত রয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা