kalerkantho

সোমবার । ১১ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৯ জমাদিউস সানি ১৪৪১

নামেই প্রথম শ্রেণি সেবা তৃতীয় শ্রেণির

লিমন বাসার, বগুড়া   

১৭ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নামেই প্রথম শ্রেণি সেবা তৃতীয় শ্রেণির

বগুড়া পৌরসভাটি প্রায় ১৫০ বছরের প্রাচীন। গুরুত্বের কারণে প্রথম শ্রেণির পৌরসভার সম্মান পেয়েছে ৪০ বছর আগে। পৌরবাসী পৌর ট্যাক্স থেকে শুরু করে সব ধরনের কর দিচ্ছে প্রথম শ্রেণির মতোই। কিন্তু জনগণকে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে বগুড়া পৌর এলাকায় সুবিধা তৃতীয় শ্রেণির মতোই। ৭০ বর্গকিলোমিটারের বিশাল এলাকার এই পৌরসভায় ২১টি ওয়ার্ডে সমস্যার শেষ নেই। কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে জনদুর্ভোগ শুধু বাড়ছেই। প্রয়োজনীয় ডাস্টবিন না থাকায় শহরের বিভিন্ন এলাকা পরিণত হয়েছে আবর্জনার ভাগাড়ে। শহরে বৈদ্যুতিক বাতির স্বল্পতা, পর্যাপ্ত ড্রেনেজ সুবিধা না থাকা, অবৈধ রিকশা ও টেম্পো চলাচলে নিয়মনীতি না থাকা এখন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে।

বগুড়া শহরে বের হলেই পাওয়া যাবে কারখানা ও গাড়ির বিকট শব্দ, গাড়ির কালো ধোঁয়া, বিভিন্ন মহল্লায় বস্তির ছেলে-মেয়েদের যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ, জলাবদ্ধতা, যত্রতত্র মাংসের দোকান, জবাই করা গরু-ছাগলের উচ্ছিষ্টাংশ রাস্তায় ফেলা, রাস্তায় বাস ও বেবিট্যাক্সিস্ট্যান্ড করে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়। শহরের অধিকাংশ এলাকায় ময়লা-আবর্জনা ফেলার জন্য কোনো ডাস্টবিন নেই। গৃহস্থালির বর্জ্য ফেলা হয় রাস্তার পাশে ড্রেন কিংবা সড়কের ওপরেই। আবাসিক এলাকায় গড়ে উঠেছে লাইসেন্সবিহীন অবৈধ ক্লিনিক। এগুলোর বর্জ্যও ফেলা হচ্ছে যেখানে-সেখানে। বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা আবর্জনা অনেক সময় দুই-তিন দিনেও পরিষ্কার করা হয় না। টাকার বিনিময়ে কিছু প্রতিষ্ঠান বাড়ি বাড়ি গিয়ে অবর্জনা সংগ্রহ করলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা একেবারেই নগণ্য।

শহরের সাতমাথা, জজকোর্ট, নিউ মার্কেট এলাকা, কাঁঠালতলা, রাজাবাজার মোড়, ফতেহআলী মোড়, শেরপুর ও গোহাইল রোডের সংযোগ মুখে দেখা যায় আবর্জনার স্তূপ। ময়লা-আবর্জনার গন্ধে শহরবাসীর পথচলা দায় হয়ে যায়। ড্রেন দীর্ঘদিনেও পরিষ্কার করা হয় না। শহরে দিনে-রাতে শোনা যায় মাইকের উচ্চ শব্দ। বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ ও রাজনৈতিক দলের হয়ে প্রচারণা চালানো হয় মাইকের উচ্চ শব্দে। কেন্দ্রস্থল সাতমাথার পাশের এলাকায় শত শত বেবিট্যাক্সি চলাচল করে উচ্চ শব্দে।

আগে বগুড়া পৌরসভার মোট আয়তন ছিল ১৪ দশমিক ৭৬ বর্গকিলোমিটার। এরপর অবকাঠামো ও জনবল সাপোর্ট ছাড়াই বিগত বিএনপি সরকারের সময়ে হঠাৎ করেই তিন গুণ সীমানা বাড়ানো হয়। ২০০৬ সালের নতুন সীমানা অনুসারে এখন পৌর এলাকা ৬৯ দশমিক ৫৬ বর্গকিলোমিটার। নতুন এই বর্ধিত এলাকা এখন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের চেয়েও বেশি। মূল শহরকে কেন্দ্রবিন্দু করে এর চারপাশে বর্ধিত করা হয়েছে। শহরের সিলিমপুর, মালগ্রাম, কৈগাড়ি, হরিগাড়ি, ইসলামপুর, ছোট বেলাইল, বড় বেলাইলসহ ৪৮টি মৌজা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বর্ধিত এলাকায়।

পৌরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আরিফ রহমান বলেন, ‘আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছি। মানুষকে বলেছি এলাকার উন্নয়ন করার কথা। কিন্তু এলাকার মানুষকে কোনো নাগরিক সুবিধা দিতে পারছি না। কিন্তু জমি রেজিস্ট্রি থেকে শুরু করে সব কিছুই পৌরসভার নির্ধারিত ফি দিয়ে করতে হচ্ছে। বিনিময়ে মানুষ পাচ্ছে শুধু হয়রানি ও কষ্ট।’

তিনি বলেন, ‘উন্নয়নমূলক যেকোনো কাজের বরাদ্দ এলে মেয়র একাই ৪০ ভাগ টাকা নিজের আওতায় নিয়ে নেন। আর বাকি ২৮ জন কাউন্সিলর পান ৬০ ভাগ টাকা। মেয়রের টাকায় বর্ধিত এলাকায় উন্নয়নকাজ করার কথা বলা হলেও আমরা কখনো সে কাজ হতে দেখেনি।’

সাবগ্রাম এলাকার বাসিন্দা মীর হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ‘আমাদের দুর্ভোগের খবর কেউ রাখে না। আমাদের এলাকায় পৌরসভার কোনো বৈদ্যুতিক বাতি নেই। সন্ধ্যা নামলেই ভূতুড়ে এলাকায় পরিণত হয় রাস্তাঘাট। পানির কোনো লাইন নেই। নেই ময়লা-আবর্জনা ফেলার ডাস্টবিন। শিশুদের বিনোদনের কোনো ব্যবস্থা নেই। অল্প বৃষ্টিতেই হাঁটুপানি দেখা দেয় রাস্তাঘাটে।

নিশিন্দারা মধ্যপাড়ার বাসিন্দা আকবর হোসেন বলেন, ‘বর্ধিত এলাকা হওয়ার কারণে যথারীতি পৌর কর দিতে হচ্ছে। জমি রেজিস্ট্রি করতেও ফি দিতে হচ্ছে চার গুণ বেশি। কিন্তু আমাদের লাভ কী? আমরা কেন সব সুযোগ-সুবিধা পাব না?’

গণ্ডগ্রাম এলাকার মোস্তাক আহম্মেদ বলেন, ‘গ্যাস পানি বিদ্যুৎ কিছুই নাই। হামাকেরে গেরামের মধ্যে অনেক আস্তাই এখনো মাটির। তার পরও হামরা বলে পৌরসভার নাগরিক। এই পৌরসভা হামাকেরে দরকার নাই। ইংকা সুযোগ লেওয়ারও দরকার নাই।’

বগুড়া পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী আবু জাফর মোহাম্মদ রেজা জানান, আবর্জনা ফেলার জন্য ছয়টি ট্রাকের মধ্যে অর্ধেকই অচল। এ কারণে ভাড়া করা ১০-১২টি ট্রাক দিয়ে কোনো রকমে কাজ চালানো হচ্ছে।

পৌরসভার যান্ত্রিক বিভাগের তথ্য মতে, এখন পাঁচটি হাইড্রোলিক ট্রাক ও একটি বিম লিস্ট ট্রাক রয়েছে। যেগুলো চালু রয়েছে তার মধ্যে একটি দিয়ে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি মেরামত করা হয়। এ কারণে অনেক এলাকায় সেবা দিতে না পারায় অন্ধকারে থাকে।

এ ব্যাপারে বগুড়ার পৌর মেয়র মাহবুবুর রহমান জানান, বর্ধিত এলাকার জন্য যে পরিমাণ সাপোর্ট দরকার সেটা আসলে পৌরসভার নেই। আর শহরে উন্নয়ন করতে হলে ট্যাক্স বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই উল্লেখ করে তিনি জানান, একটা নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে তিনি অগ্রসর হচ্ছেন। এর ফলে মানুষকে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। শহরে যানজট নিরসন ও ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার কেন হচ্ছে না? জবাবে পৌর মেয়র বলেন, বিশাল আকারের এই পৌরসভায় যত দিন লোকবল ও যানবাহন বাড়ানো না যাবে তত দিন এসব সমস্যার সমাধান হবে না। বরাদ্দের ৪০ শতাংশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছি। আমার প্রতিশ্রুত নিজস্ব কিছু প্রকল্পের কাজ থাকতেই পারে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা