kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ জানুয়ারি ২০২০। ১০ মাঘ ১৪২৬। ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

পর্যটন মহাপরিকল্পনা

পরামর্শক নিয়োগেই ৫ বছর!

► অবশেষে ‘আইপিই গ্লোবালের’ সঙ্গে চুক্তি
► কাজ শেষ করতে লাগবে আরো দেড় বছর
► ব্যয় হবে প্রায় ৩০ কোটি টাকা

মাসুদ রুমী   

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পরামর্শক নিয়োগেই ৫ বছর!

দিন দিন কংক্রিটের জঞ্জালে পরিণত হচ্ছে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। আবার পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে হুমকিতে পড়েছে সেন্ট মার্টিনস। দেশের একমাত্র এই প্রবাল দ্বীপে সব ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ, মাটির পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলেও মানা হচ্ছে না কোনোটিই। অনিয়ন্ত্রিত অবকাঠামো ও পর্যটক উপযোগী পরিবেশ না থাকায় আকর্ষণ হারাচ্ছে সুন্দরবন, কুয়াকাটার মতো দেশের প্রধান পর্যটন গন্তব্যগুলো। পর্যটনের পরিকল্পিত উন্নয়ন ও প্রসারে কোনো মহাপরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান) না থাকায় খাতটির এই দুর্গতি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য পরামর্শক (কনসাল্টিং ফার্ম) নিয়োগেই পাঁচ বছর পার করেছে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড (বিটিবি)। এখন এটি প্রণয়নে আরো দেড় বছর লাগবে। তারপর একে আইনে পরিণত করে তবেই বাস্তবায়ন শুরু হবে।

সূত্র জানায়, ২০১৫ সালে জাতীয় পর্যটন পরিষদের সিদ্ধান্তের আলোকে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ শুরু করে বিটিবি। এরপর দরপত্রপ্রক্রিয়া শেষ করে গত বৃহস্পতিবার ‘আইপিই গ্লোবাল লিমিটেড’কে পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ২৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রতিষ্ঠানটি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা করে দেবে। এরপর জাতীয় পর্যটন পরিষদ ও মন্ত্রিসভায় তা অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।

সূত্র জানায়, ‘আইপিই গ্লোবালের সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চার আছে ফ্রান্সের হোরাথ এইচটিএল, দেশীয় প্রতিষ্ঠান বেস্ট কনসাল্টিং সার্ভিসেস এবং অ্যাট আর্থ বাংলাদেশ লিমিটেড। আগামী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে মহাপরিকল্পনা প্রণয়নকাজ শুরু হবে, যা শেষ হতে আরো দেড় বছর লাগবে। ২০২১ সালের ৩০ জুন কাজ শেষ হওয়ার কথা।

আরো ১০ বছর আগে ট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যান হওয়া উচিত ছিল বলে মনে করেন বেসরকারি পর্যটন প্রতিষ্ঠান জার্নি প্লাসের নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তৌফিক রহমান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাস্টারপ্ল্যানকে বলা হয় ট্যুরিজমের বাইবেল। পৃথিবীর কোনো দেশে মাস্টারপ্ল্যানের বাইরে কেউ পর্যটনের কোনো স্থাপনা করতে পারে না। কিন্তু আমাদের তা নেই বলে সেন্ট মার্টিন, কক্সবাজারের এই দুরবস্থা। এতে লাগাম টেনে ধরার জন্য মহাপরিকল্পনা দরকার। সবার সঙ্গে আলোচনা করে এটি প্রণয়ন করা উচিত।’ তিনি বলেন, ‘আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আমাদের সব কিছু বুঝতে সময় লেগে যায়।’

বিটিবির গভর্নিং বডির সদস্য জামিউল আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের পর্যটন চলছে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই। এতে না আছে ব্যবস্থাপনা না আছে কোনো শৃঙ্খলা। মহাপরিকল্পনার আশায় থেকে স্বল্প মেয়াদের পরিকল্পনাও থাকবে না—তাও আবার পর্যটনের মতো এমন এক শিল্পের ক্ষেত্রে, যা অবিশ্বাস্য অথচ এটাই সত্য।’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সিইও ড. ভুবন চন্দ্র বিশ্বাস শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা কনসাল্টিং ফার্ম নিয়োগ করেছি। পদ্ধতিগত ত্রুটি ছিল হয়তো। তা ছাড়া আমরা ধারাবাহিকভাবে কেউ বিটিবিতে ছিলাম না। এখন আমরা দেড় বছরের মধ্যে মাস্টারপ্ল্যান করে ফেলতে চাই।’

পর্যটন শিল্পের শীর্ষ সংগঠন ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পর্যটনের মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করতে আমাদের দেরি হয়েছে, এটা আরো ত্বরিত গতিতে করা উচিত ছিল। এর অভাবে পর্যটন খাতে আমরা কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ পাচ্ছি না। তবে আমরা আশাবাদী—এটা হলে দেশের পর্যটন খাত সুশৃঙ্খলভাবে বিকশিত হবে।’  

এই প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট বিটিবির পরিচালক (বিপণন, পরিকল্পনা ও জনসংযোগ) আবু তাহের মোহাম্মদ জাবের বলেন, ‘১৮ মাসে তিনটি ধাপে পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করবে আইপিই গ্লোবাল। এতে তারা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ প্রণয়ন করবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন পর্যটন গন্তব্যের স্থাপত্য পরিকল্পনাও দেবে। একে পরবর্তী সময়ে আইনে পরিণত করে পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়ন ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করা হবে।’

বিটিবি সূত্র জানায়, প্রথম ছয় মাসে দেশের পর্যটনের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করা হবে। বিশ্লেষণ করা হবে এর শক্তি ও দুর্বলতা, সম্ভাবনা ও সংকট। এই পর্যায়ে জেলাভিত্তিক প্রাকৃতিক, সাংস্কৃতিক এবং মানব সৃষ্ট সব পর্যটন আকর্ষণের তালিকা, পর্যটকদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা, পর্যটক আগমনের প্রবাহ, অবকাঠামোগত সুবিধা ইত্যাদি চিহ্নিত করা হবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে নির্ধারণ করা হবে বাংলাদেশের পর্যটনের ভিশন, মিশন, স্ট্র্যাটেজিক অবজেক্টিভস, প্রায়োরিটিস এবং লিংকেজ। এ পর্যায়ে বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়ন, প্রমোশন এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৩, ৫ এবং ১৫ বছর মেয়াদি স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান তৈরি করা হবে। এ ছাড়া তৃতীয় পর্যায়ে অঞ্চলভিত্তিক স্ট্রাকচারাল প্ল্যান পরিকল্পনা তৈরি করা হবে। অর্থায়ন ও বিনিয়োগের কৌশল অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ ছাড়া বিপণন ও প্রমোশনাল কৌশল নির্ধারণ করা হবে।

মাস্টারপ্ল্যান করতে দেরি হওয়ায় দেশের পর্যটন শিল্প ব্যবসায়িকভাবে পিছিয়ে গেছে উল্লেখ করে ট্যুরিজম ডেভেলপার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টিডাব) চেয়ারম্যান সৈয়দ হাবিব আলী বলেন, ‘আমাদের স্থাপনাগুলো অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। এখন মাস্টারপ্ল্যান হলেও আগে যা হয়ে গেছে তা উন্নয়ন করা ছাড়া উপায় নেই। তবে নতুন এলাকাগুলোকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা যাবে।’

প্রসঙ্গত, গত ২০ নভেম্বর ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয় এবং ২৮ নভেম্বর তা অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর পরই ১০ ডিসেম্বর পরামর্শক নিয়োগে চুক্তি করে বিটিবি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা