kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ জানুয়ারি ২০২০। ৭ মাঘ ১৪২৬। ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

শিক্ষার্থীর ‘ভালোবাসা’ প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস বাস্তব রূপ পাচ্ছে

পায়রাকুঞ্জ সেতু একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায়

আরিফুর রহমান   

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শিক্ষার্থীর ‘ভালোবাসা’ প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস বাস্তব রূপ পাচ্ছে

ফাইল ছবি

খরস্রোতা পায়রা নদীতে ট্রলার ডুবে মা-বাবাকে হারানোর আশঙ্কায় নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ করে দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিঠি দিয়ে দেশজুড়ে আলোচনায় এসেছিল পটুয়াখালী সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী শীর্ষেন্দু বিশ্বাস (বর্তমানে সপ্তম শ্রেণির ফাইনাল পরীক্ষা দিচ্ছে)। ‘বাবা-মাকে হারাতে চাই না; তাদেরকে প্রচণ্ড ভালোবাসি’—তিন বছর আগে প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে এমন আকুতি জানায় শীর্ষেন্দু। দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে সেতু নির্মাণের ওই অনুরোধের চিঠি মুগ্ধ করে প্রধানমন্ত্রীকে। পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলায় পায়রা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে শীর্ষেন্দুকে চিঠি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। নদীর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, নকশা তৈরিসহ আনুষঙ্গিক কাজ শেষ করে তিন বছর পর শীর্ষেন্দুর ভালোবাসা ও প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস বাস্তব রূপ পেতে যাচ্ছে। পটুয়াখালী-মির্জাগঞ্জ সড়কে পায়রাকুঞ্জে এক হাজার ৬৯০ মিটারের সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করতে যাচ্ছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। সেতুটি নির্মাণে খরচ হবে এক হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। পুরো টাকাই রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে জোগান দেওয়া হবে।

গত ৯ ডিসেম্বর পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত এক আন্ত মন্ত্রণালয় সভায় জানানো হয়, সেতুটি নির্মাণে অর্থায়ন করতে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোকে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হলেও গত তিন বছরে তেমন সাড়া মেলেনি। তাই রাষ্ট্রীয় কোষাগারের টাকা দিয়েই সেতুটি নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটি এখন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের অপেক্ষায়। সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হলে মির্জাগঞ্জ থেকে পটুয়াখালী সদরে যাতায়াত সহজ হবে। ঢাকার সঙ্গে পটুয়াখালী জেলায় সরাসরি নিরবচ্ছিন্ন ও ব্যয় সাশ্রয়ী যোগাযোগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রকল্পটি অনুমোদন পাওয়ার পর ২০২৫ সালের মধ্যে সেতু নির্মাণের কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছেন সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা।

একটি চিঠির ওপর ভিত্তি করে পায়রা নদীর ওপর সেতু হচ্ছে—অনুভূতি জানতে গতকাল বৃহস্পতিবার আমাদের পটুয়াখালী প্রতিনিধি যোগাযোগ করেন শিক্ষার্থী শীর্ষেন্দুর সঙ্গে। মোবাইল ফোনে সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হতে যাচ্ছে—এমন তথ্য দেওয়ার পর আবেগে আপ্লুত হয়ে শীর্ষেন্দু বলে, ‘আমি অভিভূত। আমি অত্যন্ত আনন্দিত, খুশি। আমার মতো একজন শিক্ষার্থীর চিঠি আমলে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী পায়রা নদীতে সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই সেতুটি নির্মাণ করা হলে এলাকার সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব হবে।’ শীর্ষেন্দু এখন একই স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ফাইনাল পরীক্ষা দিচ্ছে।

সেতু বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, এই প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করতে যাওয়া সেতুটির দৈর্ঘ্য হবে এক হাজার ৬৯০ মিটার। সেতুটি হবে দুই লেনের। প্রকল্পের আওতায় ৬০০ মিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হবে। এক হাজার মিটার গাইড বাঁধ নির্মাণ করা হবে। থাকবে টোল বুথ ও টোল মনিটরিং ভবন। টোল আদায় ও ওজন নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য এসএআরএম অ্যাসোসিয়েটসের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়। সেই সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে পায়রা নদীর ওপর সেতুটি নির্মাণ করা হবে।

জানতে চাইলে সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পায়রা নদীতে সেতু নির্মাণ সংক্রান্ত প্রকল্পটি এখন পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। আমরা আশা করছি, আসছে জানুয়ারিতে প্রকল্পটি একনেক সভায় পাস হবে। প্রকল্পটি অনুমোদনের সঙ্গে সঙ্গে আমরা আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করব।’ তিনি বলেন, সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হলে মির্জাগঞ্জ উপজেলার সঙ্গে পটুয়াখালী সদর ও ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হবে। ভবিষ্যতে বিষখালী নদীর ওপর আরেকটি সেতু নির্মাণ করা হলে পায়রা বন্দরের সঙ্গে মোংলা বন্দরের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপিত হবে। তবে এই প্রকল্পের আওতায় পরামর্শক খাতের ৪০ কোটি টাকা প্রস্তাবিত খরচ নিয়ে প্রশ্ন তোলে পরিকল্পনা কমিশন। একই সঙ্গে জমি অধিগ্রহণ বাবদ প্রস্তাবিত ৩৬ কোটি টাকা নিয়েও প্রশ্ন তোলে কমিশন। অবশ্য এসব বিষয় সংশোধন করা হবে বলে জানিয়েছেন সেতু বিভাগের সচিব বেলায়েত হোসেন। 

পটুয়াখালী সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র শীর্ষেন্দুর মা শীলা রানী সন্নামত পটুয়াখালী সমবায় অধিদপ্তরের কার্যালয়ে কর্মরত। বাবা বিশ্বজিৎ বিশ্বাস একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। শীর্ষেন্দুদের বাড়ি ঝালকাঠি জেলার কাঁঠালিয়া উপজেলার আওরাবুনিয়া ইউনিয়নের ছয়আনি গ্রামে। ২০১৬ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে স্কুলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর চিঠি লেখে শীর্ষেন্দু। সেই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শীর্ষেন্দুকে চিঠি লেখেন ৮ সেপ্টেম্বর। চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ‘তোমার চিঠি পেয়ে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। তুমি শুধু এ দেশের একজন সাধারণ নাগরিক নও, বরং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেওয়ার সৈনিক।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা