kalerkantho

বুধবার । ২২ জানুয়ারি ২০২০। ৮ মাঘ ১৪২৬। ২৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

তদন্তেই থেমে আছে বিশেষ অভিযান

এস এম আজাদ   

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



তদন্তেই থেমে আছে বিশেষ অভিযান

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান দিয়ে শুরু হওয়া দুর্নীতিবিরোধী বিশেষ অভিযান দৃশ্যমানভাবে থেমে আছে। মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনো বারে র‌্যাবের অভিযানের পর ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ নানা অপকর্মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান জানান দেয় সরকার। আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতাসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার, ব্যাংক হিসাব তলব, ব্যাংক হিসাব স্থগিত, মানি লন্ডারিং মামলা, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলাসহ অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন পর্যন্ত অন্তত ছয়বার অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।

তবে আড়াই মাস পর খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রথম দেড় মাসই তল্লাশি অভিযান চালিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত এক মাসে হয়নি নতুন কোনো গ্রেপ্তার, মামলা। কিছু নাম আলোচনায় এলেও সেসব ব্যক্তি আইনের আওতায় আসেনি। গ্রেপ্তারকৃত সাবেক যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটসহ প্রভাবশালীদের সহযোগীরা ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকার অন্তত ১৫ জন বিতর্কিত কাউন্সিলর গাঢাকা দিয়ে থাকলেও সিটি নির্বাচন সামনে রেখে তাঁরাও এলাকায় ফিরেছেন।

তবে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, হঠাৎ করে অভিযান শুরুর পর এখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। এরই মধ্যে অস্ত্র আইনের তিনটি এবং মাদকের দুটি মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), র‌্যাব ও থানা-পুলিশ বাকি মামলাগুলোর তদন্ত করছে। সহস্রাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের তদন্ত চালাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও র‌্যাবের গোয়েন্দারা।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে প্রথম ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, যাঁকে এরই মধ্যে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ৩১ অক্টোবর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জুকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এরপর আর কোনো অভিযানের খবর পাওয়া যায়নি।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে পাওয়া তথ্য ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শুরুর পর অভিযানের পরিমাণ বাড়েনি, বরং সময়ের সঙ্গে কমেছে। গত আড়াই মাসে ৫০টি ক্যাসিনো ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি করেছে র‌্যাব। এসব অভিযানের পর করা ৩২টি মামলার মধ্যে র‌্যাব ১২টির তদন্ত করছে। ২০টি অভিযান চালায় পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থা। ৫০টি অভিযানে মোট গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২৭৫ জনকে। এর মধ্যে ২২৩ জন ঢাকায়। আর বাকি ৫৩ জন ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আওয়ামী লীগের দুজন, যুবলীগের ছয়জন, কৃষক লীগের একজন নেতা। এ ছাড়া ঢাকার তিন কাউন্সিলর রয়েছেন এ তালিকায়।

১৮ সেপ্টেম্বর থেকে প্রথম ১১ দিনের হিসাবে দেখা গেছে, ৩৫টি অভিযান হয় তখন। এর মধ্যে র‌্যাব চালায় ১৮টি এবং পুলিশ ১৭টি। ওই সময়ই ঢাকার ২১৩ জন এবং ঢাকার বাইরে ৫৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

প্রশাসনের তথ্য মতে, ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে এখন পর্যন্ত আট কোটি ৪৭ লাখ টাকা, ১৬৬ কোটি টাকার এফডিআরের কাগজপত্র, ১৩৩টি বিভিন্ন ব্যাংকের চেক, আট কেজি সোনা, ২৭টি অস্ত্র ও সাড়ে চার হাজার বোতল মদ উদ্ধার করা হয়। অভিযান শুরুর পর দুদক ২৩ প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাঁদের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬০০ ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়েছে। এ ছাড়া আরো ৫০০ ব্যক্তির বিষয়ে তদন্ত করছে দুদকসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যান্য সংস্থা।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস-অর্গানাইজড ক্রাইম) মোস্তফা কামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে সিআইডি মানি লন্ডারিং আইনে আটটি মামলা করেছে। অর্গানাইজড ক্রাইমের ইকোনমিক ক্রাইম স্কোয়াড এসব মামলার তদন্ত করছে। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ, নথিপত্র তলব ও যাচাই চলছে। একটি মামলায় খালিদ মাহমুদকে দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে আনার আবেদন করা হয়েছে। গত সপ্তাহে জি কে শামীমকে দ্বিতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। মতিঝিল থানার মানি লন্ডারিং আইনের মামলায় মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়া পাঁচ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে মোস্তফা কামাল বলেন, ‘অভিযান, তদন্ত বা কোনো অভিযোগ প্রতিবেদন ছাড়া মানি লন্ডারিং মামলা হয় না। তাই নতুন করে মামলা হওয়ার আর সুযোগ নেই। এগুলোই আমরা তদন্ত করছি। নতুন কারো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের এসব মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’

সূত্রগুলো জানায়, খালেদ ও জি কে শামীম গ্রেপ্তারের পর ৬ অক্টোবর সহযোগী এমরানুল হক আরমানসহ সম্রাটকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণের সভাপতি (বর্তমানে বহিষ্কৃত) সম্রাটের সূত্র ধরে অনেক প্রভাবশালী নেতার চাঁদাবাজির তথ্য পায় প্রশাসন। ওয়ান্ডারার্স ক্লাবটি পরিচালনা করতেন ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল হক সাঈদ। তিনি সিঙ্গাপুর আছেন বলে জানা গেছে। আলোচনায় আসে সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী ওরফে শাওন, যুবলীগের সাবেক সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওসারসহ কয়েকজন প্রভাবশালীর নাম। যুবলীগের সাবেক নেতা কাজী আনিসুর রহমান, গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের নেতা দুই ভাই এনামুল হক এনু ও রুপন ভূঁইয়াসহ অনেকেই পালিয়ে আছেন। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অন্তত ১৮ কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযোগ আছে বিভিন্ন সংস্থার কাছে। তাঁদের মধ্যে উত্তরের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারেকুজ্জমান রাজিব, ৩২ নম্বরের হাবিবুর রহমান মিজান এবং দক্ষিণের ৩৯ নম্বরের কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জু গ্রেপ্তার হওয়ার পর বাকিরা গাঢাকা দিয়ে চলছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি তাঁদের প্রায় সবাই এলাকায় ফিরেছেন। তাঁরা ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আসন্ন নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে ছবিসহ পোস্টারিং করছেন। এমনকি ক্যাসিনোকাণ্ডের গডফাদার সম্রাট ও খালেদের নাম ব্যবহার করে এখনো তাঁদের অনুসারীরা মতিঝিল, আরামবাগ, খিলগাঁও, গোড়ানসহ কিছু এলাকায় চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযানের বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক সারোয়ার বিন কাশেম বলেন, ‘গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে আমরা ক্লাবে অবৈধ ক্যাসিনো খেলা বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছি। আমরা নিশ্চিত হয়েছি, আর কোথাও এখন ক্যাসিনো নেই। অভিযানের সূত্রে এখন তদন্ত চলছে। এতে আরো কারো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। আর অভিযান চলবে কি না, সেটা তদন্ত ও তথ্যের ওপর নির্ভর করে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা