kalerkantho

বুধবার । ২২ জানুয়ারি ২০২০। ৮ মাঘ ১৪২৬। ২৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

সুপারিশেই দায়িত্ব শেষ

কমিশনের ক্ষমতা বাড়াতে আইন সংশোধনের প্রস্তাব বিশেষজ্ঞদের

এম বদি-উজ-জামান   

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সুপারিশেই দায়িত্ব শেষ

ভারতের নয়াদিল্লিতে ২০১২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি এক বালিকাকে উত্ত্যক্ত করায় পুলিশের এক সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হলে তাঁকে গ্রেপ্তার এবং সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল। ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ওই আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই থেমে থাকেনি। তারা ওই পুলিশ কনস্টেবলকে পাঁচ লাখ রুপি জরিমানা করেছিল। মামলা চলা অবস্থায়ই জরিমানা আদায় করে তা দেওয়া হয়েছিল ওই বালিকাকে। ভারতে প্রতিবছরই ওই রকম অসংখ্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দোষীদের জরিমানা করছে দেশটির জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ভারতে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ছয় হাজার ৬২১টি মামলায় ১৭৫ কোটি ৪২ লাখ ৬৮ হাজার ৬৬৮ রুপি জরিমানা করে ওই কমিশন। প্রচলিত আইনে দোষীদের বিরুদ্ধে মামলা চলার পাশাপাশি মানবাধিকার কমিশন জরিমানা আদায় করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তাঁর নিকটাত্মীয়দের দিচ্ছে।

এর ঠিক বিপরীত চিত্র বাংলাদেশে। বাড্ডায় একটি বাসায় ১১ বছরের এক গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছিল ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে। ওই ঘটনায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অনুসন্ধান শুরু করলেও পরে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ায় অনুসন্ধান বন্ধ করে দেয় কমিশন। ২০১৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের নানিয়ারচর বাজার থেকে রোমেল চাকমাকে তুলে নিয়ে নির্যাতনের পর হত্যার অভিযোগ কমিশন তদন্ত করে সরকারের কাছে কিছু সুপারিশ পাঠিয়ে কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এ রকম অসংখ্য ঘটনায়ই কমিশন শুধুই সুপারিশ করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে থানা বা আদালতে মামলা হওয়ার পর তদন্ত কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়িয়েছে কমিশন।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনে জরিমানা আদায় করার কোনো বিধানও নেই। শুধু সুপারিশ করার এখতিয়ার আছে। ভারত ও নেপালে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান করা হয় তাদের আইন অনুযায়ী। এ দেশেও অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে কমিশনের চেয়ারম্যান করার জন্য আইন সংশোধন করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভারত ও নেপালের মতো আমাদের দেশেও অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে কমিশনের চেয়ারম্যান করা হলে কমিশনের কাজে আরো গতি আসবে।’

অবসরপ্রাপ্ত কোনো প্রধান বিচারপতি বা আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কোনো বিচারপতিকে কমিশনের চেয়ারম্যান করার বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, এ বিষয়ে আইন সংশোধনের প্রয়োজন নেই। যেভাবে আছে সেভাবেই চলবে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদ্যোবিদায়ি চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, কমিশনকে আরো কার্যকর করতে হলে কমিশনের হাতে কিছু ক্ষমতা দিয়ে আইন সংশোধন করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘কোনো মামলায় পুলিশ তার মতো করে তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দেবে। আর কমিশনও নিজের মতো তদন্ত করে সরাসরি আদালতে প্রতিবেদন দেবে। কমিশনকে এই ক্ষমতা দেওয়া দরকার। এটা হলে আদালতে বিচারের ক্ষেত্রে সুবিধা হবে বলে মনে করি।’ তিনি বলেন, পুলিশের কার্যক্রমকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হলে এই পদ্ধতি ফলপ্রসূ হবে। তখন পুলিশ তার মনের মতো করে প্রতিবেদন দিতে পারবে না। একটা ভারসাম্য আসবে। তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশে মামলা চলার পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ আদায়ের যে ব্যবস্থা রয়েছে, আমাদেরও সেই ব্যবস্থা দরকার। এটার জন্য আইন সংশোধন করতে হবে। এটা চালু করা গেলে মানবাধিকার পরিস্থিতর আরো উন্নতি হবে বলে আশা করি।’

মানবাধিকার আন্দোলনের সংগঠক অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কমিশন আইনে বলে দেওয়া আছে কিভাবে কমিশন গঠিত হবে। কিন্তু সেটা কি হচ্ছে? আমার মতে তা ঠিকমতো হচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘কমিশনকে আরো গতিশীল করতে হলে ভারত ও নেপালের মতো অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে কমিশন গঠনের জন্য আমাদের কমিশন আইন সংশোধন করতে হবে।’

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, কমিশনকে ঠুঁঠো জগন্নাথ করে রাখলে হবে না। কিছু ক্ষমতা দিতে হবে। এ জন্য কমিশন আইন সংশোধন করা দরকার।

চিলড্রেন চ্যারিটি বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট ব্যারিস্টার মো. আব্দুল হালিম কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকারের কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে আইন অনুযায়ী কমিশন হাইকোর্টে রিট আবেদন করতে পারত; কিন্তু তা করেনি। কমিশনকে সরাসরি ক্ষমতা দেওয়া দরকার।   

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন করা হয় ২০০৯ সালে। আইনের ১৭ ও ১৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় কোনো বাহিনীর সদস্যের বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের অনুসন্ধান করতে হলে আগেই সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয় কমিশনকে। সরকারের পক্ষ থেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব না দিলে কিংবা সরকার অনুমতি দিলেই শুধু কোনো অভিযোগের অনুসন্ধান বা তদন্ত এবং সুপারিশ করতে পারে কমিশন। এ ছাড়া ১৯(১)(ক) ধারায়ও এই সুপারিশ করার কথা বলা হয়েছে। আর দোষী ব্যক্তির কাছ থেকে সরাসরি ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয়ে কিছু আইনে না থাকলেও আইনের ১৯(২)(১) ধারায় বলা হয়েছে, কমিশন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারের কাছে সুপারিশ করতে পারবে। আইনে শুধু সুপারিশ করার ব্যবস্থা থাকায় কমিশন কারো কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারে না।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা