kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ জানুয়ারি ২০২০। ৭ মাঘ ১৪২৬। ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

রাসায়নিক কারখানায় আগুনে ১ জনের মৃত্যু

দগ্ধ ৩৪ জনই আশঙ্কাজনক
এর আগেও আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছিল কেরানীগঞ্জের এই কারখানায়

নিজস্ব প্রতিবেদক ও কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি   

১২ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রাসায়নিক কারখানায় আগুনে ১ জনের মৃত্যু

ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি প্লাস্টিক কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একজন মারা গেছেন। দগ্ধ হয়েছেন আরো অন্তত ৩৪ জন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন দগ্ধ ৩৪ জনের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। গতকাল বুধবার বিকেলে ‘প্রাইম পেট অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ নামের এ কারখানায় আগুন লাগে। এর আগে গত ২৫ এপ্রিলও কারখানাটিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। আগুনের ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।

জানা গেছে, বিকেল সোয়া ৪টার দিকে হঠাৎ কারখানায় আগুন লাগে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তা পুরো কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে। পরে ফায়ার সার্ভিস গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়। দগ্ধদের স্থানীয় লোকজন, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও র‌্যাব উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যালে পাঠায়। হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি ৩৪ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বার্ন ইউনিটের জাতীয় সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন জানান, চিকিৎসাধীন সবারই শ্বাসনালী পুড়ে গেছে। তাঁদের দেহের সর্বনিম্ন ৩০ শতাংশ পুড়ে গেছে।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা নুরুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। ‘ইমার্জেন্সি এক্সিট’ দরজা থাকার কথা থাকলেও কিন্তু এ কারখানাটিতে একটি মাত্র দরোজা রয়েছে। এই দরোজা দিয়েই প্রবেশ ও বহির্গমন চলে। কারখানার শ্রমিকদের জন্য দিকনির্দেশনামূলক কোনো সাইনবোর্ডও ছিল না। কর্তৃপক্ষের এ ধরনের গাফিলতির কারণে ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই কারখানায় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের গ্লাস ও প্লেট তৈরি করা হয়। কারখানাটির উৎপাদন কার্যক্রমে দাহ্য রাসায়নিকের ব্যবহার হয়। আর ওই রাসায়নিকের কারণেই আগুনের ভয়াবহতা বেড়েছে। গ্যাস রুম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। আহতরা জানান, কারখানাটিতে প্রায় দুই শ শ্রমিক কাজ করেন। যে ইউনিটে আগুন লাগে সেটিতে ৫০-৬০ জন শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। বিকেল সোয়া ৪টার দিকে হঠাৎ আগুন দেখতে পাওয়া যায়। আগুন লাগার শুরুতেই কারখানার ম্যানেজার নজরুল ইসলাম আহত অবস্থায় বেরিয়ে আসেন। অন্যরা বেরিয়ে আসার সময় দগ্ধ হন। পরে ফায়ার সার্ভিস গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। দগ্ধদের স্থানীয় লোকজন, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।

হিজলতলার বাসিন্দা ইমতিয়াজ আলী হাবিব বলেন, ‘আমরা কয়েকজন ওই কারখানা থেকে ১০-১২ জনকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যালে পাঠিয়েছি।’

বার্ন ইউনিটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. পার্থ শঙ্কর পাল বলেন, দগ্ধদের চিকিৎসায় পুরো স্টাফ নিয়োগ করা হয়েছে। চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে। তবে রোগীদের অবস্থা সম্পর্কে জানাতে কিছুটা সময় লাগবে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক বাচ্চু মিয়া গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, আহতদের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আরো বেশ কজন আহত ঘটনাস্থলে রয়ে যাওয়ার খবরের ভিত্তিতে হাসপাতাল কম্পাউন্ডে থাকা বেসরকারি ১৫-২০টি অ্যাম্বুল্যান্স কেরানীগঞ্জের উদ্দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘আমরা সব স্টাফের ছুটি বাতিল করে রোগীদের চিকিৎসার্থে উপস্থিত থাকার জন্য বলেছি। সে অনুযায়ী পুরো টিম চিকিৎসা কার্যক্রমে তৎপর রয়েছে।’

র‌্যাব-১০-এর কর্মকর্তা মেজর শাহরিয়ার জানান, অগ্নিকবলিত ওই কারখানা থেকে তাঁরা একজনের মরদেহ উদ্ধার করেছেন। ফায়ার সার্ভিসের সদর দপ্তরে দায়িত্বরত কর্মকর্তা এরশাদও একজনের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি উল্লেখ করেন।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি শাহাজামান জানান, ফায়ার সার্ভিসের সদর দপ্তর, ঢাকার পোস্তগোলা ও কেরানীগঞ্জের ১০টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। পুলিশ এবং র‌্যাব সদস্যরাও উদ্ধারকাজে অংশ নেন।

বার্ন ইউনিটে বাঁচার আকুতি : ‘ভাই আমারে বাঁচান, পুইড়া শেষ হইয়া যাইতাছি।’ গতকাল সন্ধ্যায় বার্ন ইউনিটে শুয়ে এভাবেই আর্তনাদ করছিলেন দগ্ধ শ্রমিক লাল মিয়া। তাঁর মতোই দগ্ধ অন্যরাও নার্স, ওয়ার্ড বয় ও চিকিৎসকদের প্রতি বাঁচার আকুতি জানাতে থাকেন। দগ্ধদের আর্তনাদে বার্ন ইউনিটে অন্যরকম এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

এদিকে একসঙ্গে এত রোগী সামাল দিতে ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশে হাসপাতালের অন্য বিভাগ থেকেও চিকিৎসক ও নার্সরা বার্ন ইউনিটে চলে আসেন সেবা দিতে। খবর পেয়ে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিনও ছুটে আসেন বার্ন ইউনিটে। তাঁর নির্দেশে বার্ন ইউনিটসহ বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসক, নার্স ও ওয়ার্ড বয়রা একযোগে দগ্ধদের চিকিৎসা দিচ্ছেন।

সন্ধ্যার পর বার্ন ইউনিটে রোগীদের দেখতে আসেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ওই কারখানার কোনো অনুমোদন ছিল না। কারখানাটি কিভাবে সেখানে হলো সে ব্যাপারে তদন্ত করা হচ্ছে। এর আগে তিনি দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

সাহেরা নামের এক নারী জানান, তাঁদের গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রামে। তাঁর দশম শ্রেণিতে পড়া ছেলে ওই কারখানায় ১০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করে। চার বছর ধরে সে ওই কারখানায় কর্মরত। তাঁর ছেলেও দগ্ধ হয়েছে, বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন।

দগ্ধ যারা : গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ৩৪ জনকে বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। তাত্ক্ষণিকভাবে তাদের মধ্যে লাল মিয়া, মেহেদী, দুর্জয়, সুজন, ওমর ফারুক, এহসান, রিয়াজ, জাকির, সোহাগ, মফিজুল, মোস্তাকিম, সালাউদ্দিন, আলম, সজল, ফিরোজ, আসলাম, ইমরান, দিদারুল, জিসান, রাজ্জাক, সোহান, ফয়সাল, বাবুল, জাহাঙ্গীর, বশির, খালেদ, শাখাওয়াত ও আবু সাইদের নাম জানা গেছে। এদের বয়স ১৫ থেকে ৩৮ বছরের মধ্যে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা