kalerkantho

সোমবার । ২০ জানুয়ারি ২০২০। ৬ মাঘ ১৪২৬। ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

রাজশাহীতে বঙ্গবন্ধু চত্বর নির্মাণ

পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিতে দরপত্রে ইচ্ছামতো শর্ত!

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিতে দরপত্রে ইচ্ছামতো শর্ত!

রাজশাহী নগরীর তালাইমারী মোড় এলাকায় নির্মিত হচ্ছে ‘বঙ্গবন্ধু চত্বর’। এর জন্য এরই মধ্যে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এখন নির্মাণ করা হবে মূল ভবনসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো। এর জন্য টেন্ডারপ্রক্রিয়া হাতে নিয়েছে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ)। এরই মধ্যে টেন্ডার আহ্বান করাও হয়েছে। তবে প্রায় ৩০ কোটি টাকার কাজটি পছন্দের ঠিকাদারকে দিতে দরপত্রে ইচ্ছামতো শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন রাজশাহীর ঠিকাদাররা। এ নিয়ে তাঁদের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে।

ঠিকাদাররা বলছেন, পছন্দের ঠিকাদারকে উচ্চ দরে কাজটি দিতে পারলে সব মিলিয়ে ছয় কোটি টাকা লুটেপুটে খেতে পারবেন আরডিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ কারণেই টেন্ডারে বাড়তি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা এবং পিপিআরের শর্ত অমান্য করে, যাতে অন্য ঠিকাদাররা অংশ নিতে না পারেন।

সূত্র মতে, গত ২০ নভেম্বর আরডিএ ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চত্বর’ নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করে। ইজিপিতে দেওয়া এই টেন্ডারে বাড়তি অন্তত সাতটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, এই টেন্ডারে অংশ নেওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের ধরন অনুযায়ী সাতজন প্রকৌশলী থাকতে হবে, কংক্রিট ব্যাচিং প্লান্ট মেশিন থাকতে হবে। এ ছাড়া আরো চাওয়া হয়েছে ২০ কোটি টাকার কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতাসহ বিভিন্ন শর্ত। ৫০০ মিলিমিটার ডায়াসহ শোর প্রটেকশন পাইল, ব্যাচিং স্টিল ট্রাস পদ্ধতি, সার্ভিস পাইল, আরসিসি ঢালাই কাজ, ফেয়ার ফেস কংক্রিটের কাজ, ১০ এমএম গ্লাস, গ্রানাইট এবং মার্বেল পাথরের টাইলসের কাজের অভিজ্ঞতাসহ অযাচিত নানা শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

রাজশাহীর জামাল কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘যেই ঠিকাদারদের ২০ কোটি টাকার ভবন নির্মাণ কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে অবশ্যই দুজন প্রকৌশলী আছে। কিন্তু দেশের বেশির ভাগ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে শুধু একটি কাজের জন্য সাতজন প্রকৌশলী পাওয়া মুশকিল। একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য সাতজন প্রকৌশলী নিয়োগও অনেকটা ব্যয়বহুল।’ তিনি আরো বলেন, ‘যেখানে রাজশাহীতে রেডিমিক্সের মাধ্যমে অত্যাধুনিক ভবন নির্মাণ মেশিনে কাজ হচ্ছে, সেখানে নতুন করে ব্যাচিং প্লান্ট মেশিন চাওয়া অযৌক্তিক। এই মেশিন দেশে মাত্র দু-একজন ঠিকাদারের রয়েছে। আবার যিনি ২০ কোটি টাকার ভবন নির্মাণ কাজ করেছেন, তিনি অবশ্যই ৫০০ মিলিমিটার ডায়া পাইলিংয়ের কাজ করতে পারবেন। কিন্তু এখানেও শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যেন অন্য ঠিকাদাররা কাজ না পান।’

শহিদুল ইসলাম নামের আরেক ঠিকাদার বলেন, ‘যেই ঠিকাদারের ২০ কোটি টাকার ভবনের টাইলসের কাজের অভিজ্ঞতা আছে, তিনি গ্রানাইট এবং মার্বেল পাথরের টাইলসের কাজও করতে পারবেন। কিন্তু আরডিএর টেন্ডারে নতুন করে এই দুটি শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এভাবে শর্ত জুড়ে দেওয়া মানে পছন্দের ঠিকাদারই যেন ওই টেন্ডারে অংশ নিতে পারেন। পাশাপাশি ওই ঠিকাদার একাই অংশ নিলে তাঁকে উচ্চদরে কাজ দেওয়াও সুবিধা হবে। এ কারণেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা উপেক্ষা করে শহজ শর্তের বাইরে গিয়ে জটিল করে তোলা হয়েছে এই টেন্ডারকে। তার একটিই কারণ হলো যেন আরডিএর কর্মকর্তাদের পছন্দের ঠিকাদারই যেন শুধু টেন্ডারে অংশ নিতে পারেন এবং তিনিই কাজটি পান।’

আরেক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘একটি টেন্ডারে যদি একাধিক ঠিকাদার অংশ নিতে পারেন, তাহলে ওই কাজের মোট মূল্যের অন্তত ১০ শতাংশ কম দরে কাজ দেওয়ার সুযোগ থাকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু শুধু একজন ঠিকাদারই যদি টেন্ডারের শর্ত পূরণের সুযোগ পান, তাহলে তিনি কখনোই কম মূল্যে টেন্ডারে অংশ নেবেন না। প্রয়োজনে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ মূল্যে তিনি ওই কাজে অংশ নেবেন। আর এটি হয়ে থাকলে এই টেন্ডারের জন্য সরকারকে অন্তত তিন কোটি টাকা অতিরিক্ত গুনতে হবে। আর একাধিক ঠিকাদার যদি শর্ত পূরণ করে কাজে অংশ নেন, তাহলে ওই কাজের বিপরীতে মোট মূল্যের অন্তত তিন কোটি টাকা কম দরে কাজটি দেওয়ার বা পাওয়ার সুযোগ থাকে। সে ক্ষেত্রে এই টেন্ডারের এমন শর্ত বহাল থাকলে সরকারের তিন কোটি টাকা সাশ্রয় তো দূরের কথা, অতিরিক্ত তিন কোটি টাকা আরো বেশি গুনতে হবে। সেই হিসাবে ছয় কোটি টাকা গচ্চা যাবে সরকারের।’

আরেকজন ঠিকাদার বলেন, ‘আনুমানিক ৩০ কোটি টাকার এই কাজের বিপরীতে অন্তত ছয় কোটি টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিতেই আরডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী তাঁর ইচ্ছামতো টেন্ডারে শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। অতিরিক্ত ১০ শতাংশ মূল্যে কাজটি তাঁর পছন্দের ঠিকাদারকে দিতে পারলেই সেই টাকা লুটেপুটে খাওয়া যাবে—এ কারণে তিনি টেন্ডারে ইচ্ছামতো শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। এই ধরনের শর্ত পিপিআরে নেই।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল তারিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এসব নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারব না। সংবাদ করতে হলে চেয়ারম্যান স্যারের সঙ্গে কথা বলেন।’

আরডিএর চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে তাঁকে বারবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। মেসেজ দেওয়া হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা