kalerkantho

রবিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০২০। ৫ মাঘ ১৪২৬। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

তীব্র বিরোধিতার মুখে লোকসভায় উঠল নাগরিকত্ব বিল

বিলের কপি ছিঁড়ে ফেললেন আসাদুদ্দিন ওয়াইসি

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তীব্র বিরোধিতার মুখে লোকসভায় উঠল নাগরিকত্ব বিল

ভারতীয় পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় গতকাল সোমবার নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল উত্থাপন করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। প্রথম দিনেই কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলোর তীব্র প্রতিরোধের মধ্যে পড়ে বিলটি। এ সময় পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে অমিত শাহ অভিযোগ করেন, ‘ধর্মের ভিত্তিতেই দেশভাগ করেছিল কংগ্রেস। নয়তো আজ এ বিলের প্রয়োজনই পড়ত না।’

মূলত বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে শরণার্থী হিসেবে যাওয়া ছয়টি ধর্মের মানুষকে নাগরিকত্ব দেওয়ার লক্ষ্যেই এই আইন পাস করতে চায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার। এই তালিকা থেকে মুসলমানদের বাদ দেওয়া হয়েছে। ছয়টি ধর্ম হচ্ছে—হিন্দু, খ্রিস্টান, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ ও পার্সি। ১৯৫৫ সালে পাস হওয়া যে নাগরিকত্ব আইন রয়েছে তাতে ভারতের নাগরিকত্বের আবেদন করার আগে ১১ বছর দেশটিতে থাকার শর্ত উল্লেখ করা হয়েছিল এবং যেকোনো ধর্মের অনুসারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল। নতুন প্রস্তাবে সময় কমিয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছে এবং মুসলিমদের বাদ দেওয়া হয়েছে। সে হিসেবে প্রতিবেশী দেশ থেকে ২০১৪ সালের আগে যাওয়া শুধু ছয়টি ধর্মের লোকজনকে নাগরিকত্ব দিতে চায় ভারত। লোকসভায় কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে বিরোধীদের অবস্থান সত্ত্বেও সম্ভবত পার পেয়ে যাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার। তবে পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় বিলটি আটকে যাবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। প্রসঙ্গত গত সপ্তাহে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় পাস হয়।

লোকসভায় গতকাল নাগরিকত্ব বিল উত্থাপন করা হলে তার তীব্র বিরোধিতা শুরু করেন বিরোধীরা। এই বিলকে অসাংবিধানিক আখ্যা দেন তাঁরা। তার জবাব দিতে উঠে অমিত শাহ বলেন, ‘আজ এই বিলের প্রয়োজন পড়ল কেন? স্বাধীনতার পর কংগ্রেস ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ না করলে আজ এই বিলের প্রয়োজনই ছিল না। আমরা নই, ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করেছিল কংগ্রেসই।’ এ প্রসঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কথাও টেনে আনেন অমিত। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে বাংলাদেশের শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। তখন তিনি পাকিস্তানি শরণার্থীদের আশ্রয় দেননি কেন? তাহলে কি ইন্দিরা গান্ধীও অসাংবিধানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন?’

লোকসভায় কংগ্রেসের দলনেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী দাবি করেন, ‘দেশের সংখ্যালঘুদের নিশানা করতেই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল আনা হয়েছে।’ এই বিলের মাধ্যমে সংবিধানে উল্লিখিত সমানাধিকার সংক্রান্ত ১৪ ধারার লঙ্ঘন করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তৃণমূলের সৌগত রায়। কংগ্রেস সদস্য শশী থারুর এর আগে বলেছিলেন, ‘যারা মনে করে ধর্ম রাষ্ট্রকে নির্ধারণ করতে পারে তাদের বলছি, এটা পাকিস্তানের আইডিয়া।’ তিনি আরো জানান, মাত্র ছয়টি ধর্মীয় গোষ্ঠীর নাগরিকত্বের কথা বলে অন্যান্য ধর্মের মানুষদের বাদ দেওয়ার অর্থ ধর্মীয় বিভাজন করা।

নতুন প্রস্তাবে বাইরে থেকে আসা মুসলিমদের কথা বলা হয়নি। এতেই আপত্তি তোলেন বিরোধীরা। কেন্দ্রীয় সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে বেছে বেছে অমুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের নাগরিকত্ব দিচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁদের।

বিলের বিরোধিতা করে অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন দলের নেতা ও হায়দরাবাদের সাংসদ আসাদুদ্দিন ওয়াইসি বলেন, ‘এটি দেশকে ভাগ করার প্রচেষ্টা। প্রস্তাবিত আইনটি আমাদের দেশের সংবিধানের বিরোধী।’ আসাদুদ্দিন ওয়াইসি বরাবরই বলে এসেছেন প্রস্তাবিত বিল দেশকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করবে। তিনি দাবি করেন, এই নাগরিকত্ব বিল আরো এক দেশভাগের কথা বলছে। এটি করা হচ্ছে মুসলিমদের ‘রাষ্ট্রহীন’ করে দেওয়ার জন্য। তিনি বলেন, গান্ধী ‘মহাত্মা’ হয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব কার্ডের বিরোধিতা করার পর। তিনি প্রশ্ন তোলেন, তিনি কেন তাহলে নাগরিকত্ব (সংশোধনী) বিলের বিরোধিতা করবেন না। এর পরই তিনি বিলের কপিটি ছিঁড়ে ফেলেন। আসাদুদ্দিন ওয়াইসি বিজেপি সরকারকে অভিযুক্ত করে বলেন, এভাবে মুসলিমদের রাষ্ট্রহীন করতে চেয়ে দেশের স্বাধীনতাসংগ্রামীদের অপমান করছে সরকার। তাঁর বিলের কপি ছেঁড়ার কাজকে সংসদের ‘অপমান’ বলে দাবি করেন শাসকদলের সাংসদরা।

বিরোধীদের অভিযোগ উড়িয়ে দেন অমিত শাহ। তিনি বলেন, ‘দেশের .০০১ শতাংশ সংখ্যালঘুকে কোণঠাসা করা নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের উদ্দেশ্য নয়। আগেই এর ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। সমানাধিকার নিয়ে আলোচনা চাইলে গোটা বিশ্বের উদাহরণ তুলে ধরতে পারি। কিন্তু সমানাধিকারের কথা যখন উঠছেই, তখন একটা কথা বলতেই হয়, সংখ্যালঘুরা যখন শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংরক্ষণ পায়, তখন সমানাধিকারের যুক্তি কোথায় যায়? তাতে সংবিধানের ১৪ ধারার লঙ্ঘন হয় না?’

অমিত শাহর যুক্তি, ‘পড়শি দেশ থেকে কোনো মুসলিম নাগরিকত্বের আবেদন জানালে তা খতিয়ে দেখা হবে। শুধু সংশোধনী বিলের আওতায় কোনো সুবিধা পাবে না তারা। কারণ পাকিস্তান, বাংলাদেশের মতো মুসলিম অধ্যুষিত দেশে তাদের ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হতে হয় না।’

বিরোধীদের দাবি ছিল, এই বিল সংবিধানে বর্ণিত সাম্য ও ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে অসংগত। তখনই কংগ্রেসকে কটাক্ষ করে এই কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সূত্র : এনডিটিভি, আনন্দবাজার।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা