kalerkantho

রবিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০২০। ৫ মাঘ ১৪২৬। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি

অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগানোই আসল কাজ

নিজস্ব প্রতিবেদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি   

১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগানোই আসল কাজ

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে স্বর্ণপদকপ্রাপ্তদের পদক প্রদান করেন। ছবি : পিআইডি

রাষ্ট্রপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য আবদুল হামিদ বলেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুধু জ্ঞান দান করা নয় বরং অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগানোই হচ্ছে আসল কাজ। গবেষণা হচ্ছে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক কাজ। পদোন্নতির জন্য গবেষণা, না মৌলিক গবেষণা তাও বিবেচনায় নিতে হবে। অনেক বিভাগেই এখন অন্যান্য পদের শিক্ষকের চেয়ে অধ্যাপকের সংখ্যা বেশি। অনেক শিক্ষকই প্রশাসনিক পদ-পদবি পেয়ে নিজে যে একজন শিক্ষক, সে পরিচয় ভুলে যান।’

গতকাল সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫২তম সমাবর্তনে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত সমাবর্তনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান এবং উপ-উপাচার্য মুহাম্মদ সামাদও বক্তব্য দেন। সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয় এবং অধিভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ২০ হাজার ৭১৭ জনকে ডিগ্রি দেওয়া হয়। কৃতিদের মধ্যে ৯৮ জনকে স্বর্ণ পদক দেওয়া হয়।

এবার সমাবর্তন বক্তা ছিলেন জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটির স্পেশাল প্রফেসর ২০১৫ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেলজয়ী তাকাকি কাজিতা। সমাবর্তনে প্রফেসর কাজিতাকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব সায়েন্স’ ডিগ্রি দেওয়া হয়।

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, ‘বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইভিনিং কোর্স, ডিপ্লোমা কোর্স ও ইনস্টিটিউটের ছড়াছড়ি। নিয়মিত কোর্স ছাড়াও এসব বাণিজ্যিক কোর্সের মাধ্যমে প্রতিবছর হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে। এসব ডিগ্রি অর্জন করে শিক্ষার্থীরা কতটুকু লাভবান হচ্ছে এ ব্যাপারে প্রশ্ন থাকলেও এক শ্রেণির শিক্ষক কিন্তু ঠিকই লাভবান হচ্ছেন। তারা নিয়মিত নগদ সুবিধা পাচ্ছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করছেন। অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এখন দিনে সরকারি আর রাতে বেসরকারি চরিত্র ধারণ করে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সন্ধ্যায় মেলায় পরিণত হয়। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আবার কিছু শিক্ষক আছেন, যাঁরা নিয়মিত কোর্সের ব্যাপারে অনেকটা উদাসীন। কিন্তু ইভিনিং কোর্স, ডিপ্লোমা কোর্স ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়ার ব্যাপারে তাঁরা খুবই সিরিয়াস। কারণ এগুলোতে নগদ প্রাপ্তি থাকে।’

শিক্ষকদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে আচার্য বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় চলে জনগণের টাকায়। সুতরাং এর জবাবদিহিও জনগণের কাছে দিতে হবে। জনগণের এই অর্থে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের যেমন ভাগ আছে, তেমনি ভাগ আছে কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটা পয়সা সততার সঙ্গে সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্ব উপাচার্য ও শিক্ষকদের। উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান অভিভাবক ও একাডেমিক লিডার। কিন্তু কোনো কোনো উপাচার্য ও শিক্ষকের কর্মকাণ্ড দেখলে মনে হয় তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল কাজ কী, তা ভুলে গেছেন।’

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘তথ্য-প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার, বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কার বিশ্বকে বদলে দিচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যে জাতি যত বেশি খাপ খাইয়ে নিতে পারছে, সে জাতি তত বেশি উন্নতি করছে। আর এই পরিবর্তনে মুখ্য ভূমিকা রাখে যুবসমাজ। তারা হচ্ছে জাতির চেঞ্জমেকার।’

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘অনেক পরিবার আছে, যারা সর্বস্ব দিয়ে তাদের ছেলে-মেয়েদের মানুষ করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠায়। তোমাদের মূল দায়িত্ব হলো লেখাপড়া করা এবং দেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলা।’

গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুরোধ জানান। ডিসেম্বরের মধ্যে সব পরীক্ষা শেষ করে ১ থেকে ১৫ জানুয়ারির মধ্যে ভর্তির ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘তাহলে শিক্ষার্থীরা তাদের চান্স পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পছন্দমতো ভর্তি হবে। অনর্থক অর্থদণ্ড থেকে মুক্তি পাবে। হয়রানি থেকে রক্ষা পাবে।’

ডাকসু নেতাদের ব্যাপারে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘তাদের ব্যাপারে এমন সব কথা শুনি, যেগুলো আমার ভালো লাগে না। এর বেশি কিছু বলে আমি কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করতে চাই না। ছাত্রদের কল্যাণকে তাদের টপ প্রায়োরিটি দেওয়া উচিত।’

ভেজাল ওষুধের ব্যাপারে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আজকে এমবিবিএস আর ফার্মেসির সার্টিফিকেটও দিচ্ছি। ডাক্তার সাহেবরা সমানে প্রেসক্রিপশন দেন। মফস্বলে যে মেডিসিন দেন তা মেয়াদ উত্তীর্ণ থাকে। আমি অনুরোধ করব, ডাক্তার-ফার্মাসিস্ট এ বিষয়টি দেখবেন। নিজে ওষুধগুলো পরীক্ষা করে দেখবেন। মেয়াদ পার হয়ে গেলে কিন্তু বিষ হয়ে যায়।’

ছাত্রদের প্রতি আহ্বান রেখে আচার্য বলেন, ‘ওষুধ নাকি দুই-তিন রকমের হয়, বেস্ট কোয়ালিটি বিদেশে যায়। এক প্রকার ঢাকায় আর মফস্বলে খারাপ কোয়ালিটিরটা যায়। ছাত্রসমাজকে এ বিষয়টি রুখে দিতে হবে। এ নিয়ে সজাগ থাকা দরকার। ভেজাল ওষুধ নিয়ে সতর্ক থাকা দরকার। নয়তো জাতি হিসেবে পঙ্গু হয়ে যাব।’

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আচার্য আরো বলেন, ‘সম্প্রতি দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া অমানবিক ও অনভিপ্রেত ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ও শিক্ষার্থীদের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীরা লেখাপড়া করে জ্ঞান অর্জনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, লাশ হয়ে বা বহিষ্কৃত হয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য নয়। কর্তৃপক্ষ সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিলে এসব অপ্রত্যাশিত ঘটনা অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব হতো। তাই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এর দায় একেবারে এড়াতে পারে না। আমি আশা করব, ভবিষ্যতে কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নেবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা