kalerkantho

শনিবার । ২৫ জানুয়ারি ২০২০। ১১ মাঘ ১৪২৬। ২৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

সোর্স লাগিয়ে ছিনতাইয়ে ভুয়া ডিবির দল

চাকরিচ্যুত পুলিশসহ এক ডজন ‘অফিসার’ সক্রিয় ► লুট হলেও প্রতিকার পায় না ভুক্তভোগী

এস এম আজাদ   

৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সোর্স লাগিয়ে ছিনতাইয়ে ভুয়া ডিবির দল

পুলিশ ও গোয়েন্দাদের মতোই সোর্স বা তথ্যদাতা ব্যবহার করে ছিনতাইয়ে নেমেছে ভুয়া ডিবির দল। আসল ডিবি অর্থাৎ পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) তদন্তে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ব্যাংকসহ আর্থিক লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠান, নগদ টাকা লেনদেনকারী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও জুয়েলারি দোকানের ওপর নজর রাখে ছিনতাইকারীদের এসব সোর্স। কেউ বেশি টাকা নিয়ে রাস্তায় নামলেই মোটরসাইকেলে তাদের গাড়ি অনুসরণ করে চিনিয়ে দেয় তারা। এরপর ডিবি লেখা জ্যাকেট পরে ওয়াকিটকি হাতে একজন সেই গাড়ির সামনে দাঁড়ায়। সেই দলের প্রধান ‘অফিসার’। বাকিরা তাকে ‘স্যার, স্যার’ বলে ওই গাড়ির লোকজনকে তল্লাশির নামে নিজেদের গাড়িতে তুলে চোখ বেঁধে ফেলে, ছিনিয়ে নেয় টাকার ব্যাগ।

ডিবির তদন্তে জানা গেছে, ঢাকায় এমন এক ডজন ভুয়া অফিসারের নেতৃত্বে শতাধিক ভুয়া ডিবি সদস্য সক্রিয় রয়েছে। শাহিন (পুলিশের চাকরিচ্যুত), জাকির হোসেন, বারেক, কবির, শহীদ মাঝি, সাগর, মোজাম্মেল ও ইয়াছিন তাদের মধ্যে অন্যতম।

তদন্তকারী ও ভুক্তভোগীরা বলছেন, বিভিন্ন সময় ভুয়া ডিবির সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হলেও তাদের তথ্যদাতা সম্পর্কে জানা যায় না। উদ্ধার হয় না লুটের টাকা। ছিনতাইকারীচক্রগুলো তাদের সহযোগিতা করার জন্য দৈনিক চুক্তিতে লোকও ভাড়া করে। মাইক্রোবাস ভাড়া নিয়ে জ্যাকেট, ওয়াকিটকি ও সিগন্যাল লাইট নিয়ে তারা শহরে ঘুরে বেড়ায়। সাধারণত একটি দলে সাত-আটজন থাকে। তবে সোর্সসহ একটি দলে ১৭ জন পর্যন্ত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

১০ অক্টোবর সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে গুলিস্তানের বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আওয়ামী লীগ অফিসের কাছে তাঁতীবাজারের দিক থেকে আসা একটি গাড়ি থামিয়ে ‘প্যানারোমা এপারেলস অ্যান্ড হোমটেক্স’ ও ‘প্যানারোমা আইল্যান্ড লিমিটেড’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের ৯৫ লাখ টাকা লুট করে জাকিরের নেতৃত্বাধীন চক্রটি। ঘটনাস্থল থেকে সোহাগ মাঝি নামে একজনকে ২৫ লাখ ৮৯ হাজার টাকাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় পল্টন থানায় ডাকাতির মামলা করেন ব্যবসায়ী আব্দুল হান্নান।

এরপর গত ১৩ অক্টোবর উত্তরা থেকে সোহাগ বিশ্বাস নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ, যে ছিল লুটে ব্যবহৃত গাড়ির চালক। ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার সোহাগ মাঝি ১৫ অক্টোবর ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। গত ১৬ অক্টোবর বরিশাল থেকে গ্রেপ্তার করা হয় জুয়েল মৃধাকে। পরদিন সে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। এরপর গত ২৫ অক্টোবর জাকির ও খলিলকে পটুয়াখালী থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় তিন লাখ ৪০ হাজার টাকা। আদালতের নির্দেশে তাদের তিন দিন করে রিমান্ডে নেওয়া হলেও তারা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়নি।

মামলার বাদী ব্যবসায়ী আব্দুল হান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার এতগুলো টাকার মধ্যে মাত্র তিন লাখ ৪০ হাজার টাকা ডিবি বের করতে পেরেছে।’

জানতে চাইলে এ ছিনতাই ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক কামরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এর আগেও বেশ কিছু ভুয়া ডিবির দল গ্রেপ্তার করি। তবে টাকাসহ ধরা না পড়ায় এর পেছনে তথ্যদাতাসহ সব সদস্যদের ব্যাপারে জানা যায়নি। এবার অনেকের তথ্য মিলেছে। কিছু আসামি গ্রেপ্তার হলেও তাদের টাকার হদিস মিলছে না। তদন্ত চলছে।’

দল চালায় ‘অফিসাররা’ : ডিবির তদন্তে জানা গেছে, পটুয়াখালীর জাকিরই টাকা ছিনিয়ে নেওয়া দলের প্রধান। অফিসার সেজে সে হাতে ওয়াকিটকি রাখে। জাকিরের বিরুদ্ধে আগেও অন্তত চারটি মামলা হয়েছে। সে আগে গ্রেপ্তারও হয়েছে। লুট করা টাকা সে ও খলিল দুই ভাগে ভাগ করে নিয়ে যায়। গ্রেপ্তারের পর জাকিরের কাছ থেকে এক লাখ এবং খলিলের কাছ থেকে দুই লাখ ৪০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত হিসেবে স্বপন শিকদার, মোল্লা কাউসার, মোশারফ, নয়ন, ভাগ্নে ফারুক, খোকন, শাহিন, মতিসহ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। পলাতক এসব আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

জাকিরের সহযোগীরা দাবি করেছে, গুলিস্তানে ৯৫ লাখ টাকা লুটের ঘটনায় ‘শাহিন পুলিশ’ও জড়িত। তবে ডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রুপটির সম্পৃক্ততা এখনো মেলেনি।

সূত্র মতে, পুলিশে চাকরি করায় শাহিনকে তার সহযোগীরা ‘শাহিন পুলিশ’ ডাকে। সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) পদে কর্মরত অবস্থায় অভিযোগের কারণে চাকরিচ্যুত হয় শাহিন। এরপর সে ভুয়া ডিবির দল গঠন করে ছিনতাইসহ নানা অপরাধ করছে। পুলিশে থাকার কারণে সে ডিবির অভিযান বিষয়ে অনেক তথ্যই জানে। এসব কাজে লাগিয়ে অপকর্ম করছে সে। গ্রেপ্তার হলেও জামিনে ছাড়া পেয়ে ফের অপকর্ম করছে এই ছিনতাইকারী।

ভুয়া ডিবির ওপর আসল ডিবির নজরদারি আছে জানিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছরের রমজানের সময় ধানমণ্ডি থেকে দলসহ ‘বারেক অফিসারকে’ গ্রেপ্তার করা হয়। পটুয়াখালীর দশমিনার কবীর একটি দলের প্রধান। একাধিকবার গ্রেপ্তার হলেও জামিনে ছাড়া পেয়ে একই কাজ করছে। সে এখন গা ঢাকা দিয়ে আছে। বরিশালের শহীদ মাঝি আরেকটি দলের প্রধান, যে দুইবার গ্রেপ্তার হয়েছে। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার সাগর একই এলাকার কয়েকজনকে নিয়ে আলাদা দল করেছে। সে বর্তমানে কারাগারে। গাজীপুরের হাজি মোজাম্মেল ও ঢাকার ইয়াছিন গ্রেপ্তারের পর জামিনে আছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা